পড়ার পর জ্যোতি শূন্য চোখে তাকিয়ে রইল দেয়ালের দিকে। তার মুখ দিয়ে বেরোন কথা বলে বলে যা সব লেখা হয়েছে নিশ্চয় সারথির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই তা পড়বে। একটা ব্যাপার সে পরিষ্কার জেনে গেল, এখন সে যতই প্রতিবাদ করুক তার বন্ধু বা হিতৈষী রূপে সারথির কাউকে সে আর পাশে পাবে না। সে একা হয়ে গেল। প্রত্যেকটি সহ খেলোয়াড় তার উপর চটবে, সাধন নাথ তো রীতিমত অপমানিত বোধ করবে আর অরবিন্দদা ভাববেন, বেইমান।
এত ক্ষতি মানুষের প্রতি কোন মানুষ যে অকারণে করতে পারে, জ্যোতি তা বুঝে উঠতে পারছে না।
আগাগোড়া বিকৃত এই রিপোর্ট অত্যন্ত চতুরভাবে সারথি থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করে দিল।
পাথরের মত বসে থাকা জ্যোতির চোখ বেয়ে টপটপ জল পড়ল লাল জয়পুরী বেডকভারে।
.
।।আট।।
নাণ্টুকে দিয়ে দাশুদা খবর পাঠিয়েছে, এখুনি দেখা কর।
জ্যোতি দেখা করতে গেল। দাশুদা ফ্ল্যাটে একাই ছিল।
”এই যে। রোভার্স থেকে ফিরে এসেই খবরের কাগজে স্টেটমেণ্ট ছেড়েছিস দেখলুম। এসব রোগ তো তোর আগে ছিল না!”
”আমি কোন স্টেটমেণ্ট দিইনি। রঞ্জন আগাগোড়া বানিয়ে লিখেছে। ও গল্প করার জন্য এসেছিল, আমিও সেই ভাবে কথা বলেছি। এইসব কথা যে লিখে দেবে, তাও হয়কে নয় করে তা তো জানতাম না! আর আমাকে ঘুণাক্ষরেও বলেনি যা বলেছি তা ছাপা হবে। তাহলে কনসাশ হয়ে কথা বলতাম। রিপোর্টাররা যে এত জঘন্য, নীচ, মিথ্যাবাদী হয় তা আমার ধারণায় ছিল না।”
”আগাগোড়াই মিথ্যে লিখে দিল? তুই কিছুই ওকে বলিসনি?”
দাশুদার বলার ভঙ্গিতে সন্দেহ এবং কৈফিয়ৎ চাওয়া দুটোই রয়েছে।
”ওর সঙ্গে আমার সামান্যমাত্র কথা হয়েছিল আর তাছাড়া এভাবে এসব কথা আমি বলিইনি। অথচ…”
”তুই কি প্রতিবাদ জানিয়ে চিঠি দিয়েছিস?”
”আজই পাঠিয়ে দিয়েছি একটা ছেলের হাত দিয়ে।”
”দ্যাখ ছাপে কি না আর ছাপলেও কেটেকুটে কতটা রাখে!”
”আমি আর কি করতে পারি বল?”
জ্যোতি অসহায় ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইল। দাশুদা নাণ্টুকে ইশারা করল বীয়ার দেবার জন্য।
”খুব ক্ষতি হলো তোর আর সারথিরও। এইসব খবরের কাগজের লোকগুলোকে আর ক্লাবে ঢুকতে দেওয়াই উচিত নয়। সন্তাোষদাকে বলব নোটিস দেবার জন্য, প্লেয়াররাও যেন ওদের কাছে মুখ না খোলে।”
”কোন কাজ হবে না তাতে। প্লেয়াররা নিজেরাই যেচে গিয়ে খবর দেয়, তাদেরও তো স্বার্থ আছে!”
”তোর সঙ্গে সাধন নাথের একটা হিচ তৈরি করে দিল। এতে ক্লাবের ক্ষতিই হবে। যদি রেজাল্ট খারাপ হয় এবার, তাহলে কিন্তু মেম্বার—সাপোর্টাররা তোকেই দায়ী করবে। বলবে, জ্যোতি বিশ্বাস কো—অপারেট করেনি কোচের সঙ্গে। অরবিন্দ মজুমদারের লোক তো, তাই সাধন নাথকে কাজ করতে দিচ্ছে না। সাপোর্টাররা তোর পেছনেই তখন লাগবে।”
জ্যোতি বিব্রত বোধ করল। ব্যাপারটা যে এই রকম একটা চেহারা নিতে পারে, তার নিজেরও মনে হয়েছে। সাপোর্টাররা তাকে মাথায় তুলে যতই নাচানাচি করুক, মাথা থেকে মুহূর্তেই ফেলেও দিতে পারে। অরবিন্দদা আসার আগে তাঁবুতে ইঁট ছোড়া, কয়েকজন মেম্বারের গাড়ির কাচ ভাঙা, এমনকি দুজন প্লেয়ারের স্কুটারও জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল, প্রেসিডেণ্ট আর সেক্রেটারি দু সপ্তাহ ক্লাবের ছায়া মাড়ায়নি। ওদের বাড়িতেও পুলিশ পোস্ট করতে হয়েছিল।
”এবার কাকে কাকে আনবেন ঠিক করেছেন?”
”ওসব ব্যাপারে আমি নেই, থাকিও না। যা করার চঞ্চল, সন্তাোষদা আর লালচাঁদই করবে। সাধন নাথ আসছে, ওর সঙ্গেও কথা বলে ঠিক করা হবে, কাকে কাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। তবে শৈবালকে ফিরিয়ে আনা যে হবে এটা ধরে নিতে পারিস।”
”সাধন নাথ ওকে পছন্দ করে। ক্লাবেও অনেকে ওকে চাইছে। অমিত তো থাকবে না জানা কথাই, জবেদও বোধহয় ওর সঙ্গেই যাত্রীতে চলে যাবে। যাই হোক খুব একটা ক্ষতি আমাদের হবে না। কিন্তু তোর এই কাগজের স্টেটমেণ্টটা…”
”আমার স্টেটমেণ্ট নয় দাশুদা।”
”ওই হল।”
দুজনে বীয়ারের গ্লাস নাণ্টুর হাত থেকে নিল।
”তোর জন্য নেপাল থেকে ভেলভেট কর্ডের একটা প্যান্ট পীস এনেছি। জলিলকে মাপটা দিয়ে আসিস।”
এই ধরনের উপহার দাশুদার কাছ থেকে পাওয়াটা জ্যোতির কাছে খুবই সাধারণ ব্যাপার। সে উৎসাহ প্রকাশ করল না, শুধু বলল, ”আছে তো অনেক।”
”থাকুক আর একটা।”
”ব্যবসার কাজে গেছলে?”
”হ্যাঁ। তোকে তো ব্যবসায় আর নামাতে পারলুম না। টাকাগুলো কি করবি, বাড়ি?”
”হ্যাঁ। নিজের একটা বাড়ি আমার অনেক দিনের ইচ্ছে।”
”তারপর বিয়ে। ঠিক করেছিস?”
”না।”
”দেখব মেয়ে?”
”ওরে বাবা, না না, এসব ব্যাপারে তুমি মাথা দিও না।”
”কেন, আমি কি খুব খারাপ মেয়ে তোকে দিয়েছি?
জ্যোতি গ্লাসে চুমুক দিল অনেকটা সময় নিয়ে। না, দাশুদা ভাল মেয়েই দিয়েছিল। একটু বেশি ভাল।
”গৌরীর ছেলের হার্ট অপারেশন হবে, ভেলোরে। তুমি কি তা জান?”
”সে কি! কই আমায় তো বলেনি কিছু? ও কি কলকাতায় আছে?”
”ছেলেকে নিয়ে ভেলোরে গেছে। দোসরা রওনা হয়েছে।”
”তুই জানলি কি করে?”
চিঠি দিয়ে গেছে।
”অদ্ভুত এই মেয়ে জাতটা। তিন চারদিনের মধ্যে ওকে দরকার, আর কিনা না বলে চলে গেল!”
”ছেলের হার্ট অপারেশন।”
”তাতে কি হল। দুচারটে দিন দেরী হয়ে গেলে কি ছেলে মরে যেত? এতদিন তো বিনা অপারেশনেই বেঁচে রয়েছে।”
জ্যোতি অবাক বোধ করল দাশুদার হঠাৎ চেঁচিয়ে ওঠায়। তার মনে হল, এই সময় এইভাবে কথাগুলো বলা একমাত্র নিষ্ঠুরের পক্ষেই সম্ভব। মায়ের কাছে ছেলের জীবনের মূল্য এবং প্রয়োজন যে কতটা তা বোঝার মত বোধশক্তি এই লোকটির নেই। নিজের স্বার্থ ছাড়া আর কিছুই বোঝে না।
