”উদ্দেশ্য আবার কি, তোকে পছন্দ করে না নানা কারণে তাই বলে। সাধন নাথ এলে তোর কি কোন অসুবিধে হবে?”
”অসুবিধে?” জ্যোতির উত্তেজনার প্রবাহের সামনে যেন পাথরের চাঙড় পড়ল। ধাক্কা খেয়ে ছিটকে উঠল তার কথার তোড়। ”মফৎলাল টিমটা অঙ্কের মত ফুটবল খেলল। প্রত্যেকটা প্লেয়ারকে কাজ দেওয়া আছে, প্রত্যেকে জানে কখন কোথায় তাকে থাকতে হবে। ছট কাটা খেলা। এভাবে আমি কখনো খেলিনি, আমার এই মেথডিক্যাল খেলা একদম পোষায় না। অরবিন্দদা এটা জানতেন, বুঝতেন, তাই আমাকে মাঠে ছেড়ে রেখে দিতেন। যদি আমাকে ছকের মধ্যে কেউ বাঁধতে চায় তাহলে আমার পক্ষে—”
”তাহলে তোর পক্ষে কি?—বনিবনা করে চলা সম্ভব হবে না?”
”তাই।” কথা খুঁজে না পেয়ে জ্যোতি সায় দিল।
”সাধন নাথ অনেক পাওয়ার নিয়ে আসছে। ওর কাজে বা সিদ্ধান্তে কাউকে নাক গলাতে দেবে না। যদি মনে করে কাউকে বসাবে বা তাড়াবে তাহলে কিন্তু তাই করবে।”
”তুমি বলতে চাও আমাকেও বসাবে বা তাড়াবে?—একবার চেষ্টা করে তাহলে দেখুক, কত ধানে কত চাল বোঝা যাবে।”
”কি করবি তাহলে?”
”কেন সারথি ছাড়া আর কি ক্লাব নেই?”
”তাহলে কি যাত্রীতে যাবি?”
জ্যোতি এবার বিরক্ত স্বরে বলল, ”কোথায় যাব সে পরে দেখা যাবে। এখন আমি একটু ঘুমোব।”
রঞ্জন উঠে দাঁড়াল। চোখে পড়ল একটা খাম মেঝেয় পড়ে রয়েছে। সেটা তুলে নাম ঠিকানা পড়ে বলল, ”মেয়ের হাতের লেখা। কার?”
”কার তা আমি কি করে জানব!”
জ্যোতি হাত বাড়িয়ে খামটা টেনে নিল। রঞ্জন অপেক্ষা করছে, খাম ছিঁড়ে চিঠি বার করার। জ্যোতি খামটা বালিশের নীচে রেখে দিল।
”খাওয়াবি কিছু?”
”এখন ঘুমোব, তুমি বরং মোড়ের মিষ্টির দোকান থেকে কিনে খেয়ে নাও।”
জ্যোতি দশ টাকার একটা নোট দিল রঞ্জনকে। সেটা পকেটে পুরেই সে বেরিয়ে গেল। জ্যোতি অস্ফুটে বলল, ”শালা।”
বালিশের তলা থেকে খামটা বার করে সে ছোট চিঠিটা পড়ল।
”জ্যোতি,
তোতনের অপারেশনের জন্য যে টাকার কথা বলেছিলাম, তার আর দরকার হবে না। টাকার যোগাড় হয়ে গেছে। ভাগ্যটা এখন ভাল যাচ্ছে মনে হয়। অনুপমা যাত্রা সমাজের সঙ্গে আমার কন্ট্র্যাক্ট হয়েছে; অ্যাডভান্স যা পেয়েছি তাতেই মনে হয় কুলিয়ে যাবে। তুমি আমার ছেলের চিকিৎসার জন্য টাকা দেবে বলেছিলে, তোমার এই উদারতা চিরকাল আমার মনে থাকবে। তোতনকে নিয়ে দোসরা রওনা হচ্ছি। আবার ধন্যবাদ জানাচ্ছি তোমাকে। ইতি,
গৌরী।
চিঠিটা দ্বিতীয়বার পড়ে সে দলা পাকিয়ে ঘরের কোণে ছুঁড়ে দিল। তার কাছ থেকে গৌরীর টাকার বা উপকার নেবার আর দরকার হল না। এটা মনে হতেই জ্যোতির মনে জ্বালাধরা একটা হতাশা কিছুক্ষণ জমে রইল।
দুদিন পর প্রভাত সংবাদের খেলার পাতায় বড় অক্ষরে হেডিংটা দেখে জ্যোতির হৃদপিণ্ডের দু’তিনটে স্পন্দন ফসকে গেল। হাতের কাগজ কেঁপে উঠল।
”সাধন নাথ কোচ হলে সারথিতে আমি থাকব না: জ্যোতি।”
একি লিখেছে রঞ্জন! জ্যোতির চিৎকার করে উঠতে ইচ্ছে করল, শুধুই একটা চিৎকার।
স্টাফ রিপোর্টার লিখেছে: না, সাধন নাথের মেথডিক্যাল ফুটবলের সঙ্গে বনিবনা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তার ছক কাটা আঁকা কষা ধরনের সঙ্গে আমার খেলার ধরনের একদমই মিল নেই। আমাকে ছকের বাঁধনে কেউ বাঁধতে চাইলে আমার পক্ষে তার সঙ্গে মানিয়ে চলা সম্ভব হবে না। সেক্ষেত্রে—’। ”সারথির সারথি,” ভারতীয় ফুটবলের উজ্জ্বল নক্ষত্র জ্যোতি বিশ্বাস কথাগুলো বললেন রোভার্স থেকে ফিরে। বলার সময় তার কণ্ঠে ছিল তীব্র ঝাঁঝ আর চোখে আগুন। সারথি সঙ্ঘের মেসে নিজের ঘরে, লাল জয়পুরী প্রিণ্টের বেডকভারে ঢাকা বিছানায় শুয়ে শুয়ে জ্যোতি বললেন, ‘সারথি এখন ভরে গেছে অযোগ্যদের ভীড়ে। বাংলার সম্মান এরা ধুলোয় লুটিয়ে দিয়ে এল বোম্বাইয়ে। কেউই কণ্ডিশনে ছিল না, ইনজুরি আছে অনেকের কিন্তু তারা সেকথা চেপে গেছল। আনফিট অবস্থায় খেলে তারা টিমকে ডুবিয়েছে। আমি নাকি সিন্সিয়ার ছিলাম না বলে কেউ একজন বা কয়েকজন অভিযোগ তুলেছে। কিন্তু বিশ্বাস করুন, সারথির জন্য আমি বুকের শেষ বিন্দু নিঃশ্বাস কুপারেজ মাঠে ঝরিয়ে দিয়ে আসতে পারি। যারা বলে আমি সিন্সিয়ার নই, তারা নিজেদের কি প্রমাণ করতে পারবে তারা খুব সিন্সিয়ার?’
রাগে ফুঁসছিলেন জ্যোতি। ‘বললেন, ম্যাচ হারলেই সব দোষ আমার ঘাড়ে চাপাবার একটা চক্রান্ত সারথিতে বিষাক্ত আবহাওয়া এখন তৈরি করেছে।’ এরপর তিনি প্রাক্তন কোচ এবং গণিকা গৃহে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া অরবিন্দ মজুমদার সম্পর্কে বলেন, ‘এই সব ব্যাপার অরবিন্দদার আমলেই তৈরি। তার গাছাড়া ভাবের জন্যই শেষদিকে প্লেয়াররা আস্কারা পেয়েছে।’ অবশ্য অরবিন্দ মজুমদারের অবদানের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেও তিনি ভোলেননি। বলেন, ‘সারথিকে তিনি যে পীকে তুলে দিয়ে গেছেন, সাধন নাথের পক্ষে তার রাশ ধরে থাকা শক্ত কাজ হবে না। তবে এতগুলো স্টার প্লেয়ার সামলানোর মত ব্যক্তিত্ব তার আছে বলে মনে হয় না।’
প্রশ্ন করি, সাধন নাথের সঙ্গে যদি মতের মিল না হয় তাহলে, আপনি কি অন্য দলে যাবেন? উত্তরে কলকাতার সবথেকে দামী এই ফুটবলারটি বিষাদভরা দৃষ্টি মেলে, সজল কণ্ঠে বললেন, ‘আমাকে যদি তিনি তাড়াতে চান তাহলে নিশ্চয় অন্য ক্লাবের কথা ভাবব। ফুটবলই তো আমার প্রাণ, আমার সাধনা। তবে মনে হয় না সাধন নাথ আমার খেলা নষ্ট করার মত কিছু করবেন।’ চলে আসার আগে জ্যোতি বিশ্বাস আমার দিকে কেউটের ছোবলের মত একটা কথা ছুঁড়ে দিলেন, ‘কারা যেন বলে বেড়াচ্ছে আমি নাকি যুগের যাত্রীতে চলে যাব? লিখে দিতে পারেন, সারথিতেই আমি জন্মেছি সারথিতেই আমি মরব।’
