”খবরদার জ্যোতি, এরকম অনেক চিঠি পাবি, অনেকে কাছে আসবেও, একদমই পাত্তা দিবি না, কোনও ভাবে ইনভলভড হবি না, তাহলে ফেঁসে যাবি। অনেক দেখেছি এরকম।” দাশুদা সাবধান করে দিয়েছিল। তারপরই গৌরীর সঙ্গে তার আলাপ করিয়ে দেয়।
সারথির সাফল্য কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চিঠিও কমে গেছে। তার নিজের খেলার টানে যে চিঠিগুলো আসত, তারও সংখ্যা কমতে কমতে সপ্তাহে একটি—দুটিতে ঠেকেছে।
এসব কিসের লক্ষণ? তার খেলা কি পড়ে আসছে? জ্যোতির বুক থেকে শীতল একটা ঝাপটা শিরা উপশিরা দিয়ে চুল এবং নখ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ল। জনপ্রিয়তা কমে আসছে? সারথি আর জিতছে না, আর সে জেতাতে পারছে না।
ফুটবল একার খেলা নয়, বাকি দশজনকে নিয়ে মালার মত যদি গাঁথা না হয় তাহলে দল কখনো গতি পায় না, ছন্দে ওঠানামা করে না। মালা গাঁথার কাজ ছিল অরবিন্দদার। সে কাজ তিনি আর করতেন না। জ্যোতিই খেলে জিতিয়ে দেবে। আর সবার মত শেষ দিকে তিনিও এই ধারণা পোষণ করতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু ফুটবল তো একার খেলা নয়।
ডানবাহু দিয়ে চোখ ঢেকে সে চিৎ হয়ে শুয়ে রইল। তার কিছুই আর এখন ভাল লাগছে না। আর খেলতে পারছে না, এমন ভয়ঙ্কর দিনের কথা আজ পর্যন্ত কখনো তার মনে উঁকি দেয়নি। সে জানে, সব ফুটবলারই জানে, একদিন মাঠ থেকে রিটায়ার করতেই হবে। কিন্তু এখনই কেন, মনের মধ্যে এসব অমঙ্গলে ভাবনা ঢুকছে! এখনো সে ইচ্ছে করলে ভারতের যে কোন ডিফেন্সকে তছনছ করে দিতে পারে।
সত্যি কি পারে? জ্যোতির চোখে ভীত চাহনি ফুটে উঠল। কই রোভার্সে তো পারল না। যুগের যাত্রী, ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগানের সঙ্গে লীগের খেলায়, আই এফ এ শীল্ডে এরিয়ানের সঙ্গে, বরদলুইয়ে, ডুরাণ্ডে কোথাও তো সে সারথিকে জেতাতে পারেনি! তছনছ করার ক্ষমতা একসময় ছিল…তাহলে কি অতীতের সাফল্যের মধ্যে সে বাস করছে? এটা তো পড়ে যাওয়ার লক্ষণ!
ঘরের খোলা দরজায় গলা খাঁকারি শুনে জ্যোতি তাকাল। ‘প্রভাত সংবাদে’র রঞ্জন অধিকারী দাঁড়িয়ে।
জ্যোতিরই সমবয়সী বা দু—তিন বছরের বড়। তাদের আলাপ বছর পাঁচেকের। বড় বড় ক্লাবের বা আই এফ এ—র ভিতরের খবর, সাধারণত ড্রেসিংরুমের ঝগড়াঝাটি কুৎসা ইত্যাদির দিকেই ওর ঝোঁক। খবর তৈরির জন্য তথ্যকে দুমড়ে দিতে বা পুরো মিথ্যা কথা লিখতে ওর কলম কাঁপে না। কারুর বিরুদ্ধে নোংরা কিছু রটনা করতে হলে ময়দানে প্রথমে রঞ্জনেরই খোঁজ পড়ে।
”কি রে জ্যোতি, বোম্বাই থেকে এসেই শুয়ে পড়েছিস?”
জ্যোতি উঠে বসল। ছোট টেবলটায় চায়ের কাপ পিরিচ ঢাকা দেওয়া। ঢাকা তুলে দেখল ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। সূর্য নিঃশব্দে কাজ করে।
”খাবি না তো, আমায় দে।”
বলার সঙ্গে সঙ্গেই কাপটা তুলে একচুমুকে রঞ্জন চা শেষ করল।
”কি মনে করে?”
”মনে আবার করে তোর কাছে আসি নাকি? রোভার্স খেলে এলি, ভাবলুম যাই দেখা করে আসি, কেমন দেখলি, বুঝলি, সেটাও জেনে নেব। সাধন নাথ তো তোদের কোচ হয়ে আসছে, কেমন বুঝছিস, পারবে?”
”কি পারবে?”
”সারথিকে টানতে! অরবিন্দ মজুমদার যেখানে পৌঁছে দিয়ে গেছে সেখান থেকে টানা ধরে চালিয়ে নিয়ে যাওয়া অবশ্য শক্ত কাজ হবে না।”
”অরবিন্দদা যে পীকে পৌঁছে দিয়েছিল সেটা দু বছর আগের কথা, তারপর থেকে সারথি নীচের দিকে গড়াচ্ছে। সাধন নাথকে এই গড়িয়ে যাওয়াটা থামাতে হবে।”
”গত দু বছর অরবিন্দ মজুমদার তাহলে কিছুই করেনি? এত যে সব স্টার রয়েছে তবু তিনি ফেইলিওর!”
”স্টার প্লেয়ার থাকলেই বুঝি টিম জেতে? একজন স্টারের কাঁধে চোট, একজন স্টারের দু মাস হাঁটু সারছে না, একজন স্টার স্টপার থেকে মিডফিল্ডার পজিসনে গিয়ে নাকি এবিলিটি লস করেছে, একজন স্টার ইনসাইড তার লিঙ্কম্যান আর আউটসাইডের সঙ্গে এখনো অ্যাডজাস্ট করে উঠতে পারছে না, একজন স্টারকে তার অরিজিন্যাল পজিশনে খেলান হচ্ছে না বলে সিটার মিস করছে—বুঝলে রঞ্জনদা এই হচ্ছে তারকাখচিত টিমের হাল!”
”এসব তো অরবিন্দ মজুমদারের আমলেরই তৈরি।”
রঞ্জন বালিশ নিয়ে বিছানায় গড়িয়ে পড়ল। জ্যোতি হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে বলল, ”নিশ্চয়। শেষদিকে অরবিন্দদার গাছাড়া ভাব ছিল তো বটেই। ক্লাব অফিসিয়ালরাও কি কম দায়ী? এই যে অসিত টাকা না পাওয়ার জন্য ট্রেনিংয়ে এল না, মেণ্টালি ডিস্টার্বড, আনহ্যাপি, তার কাছ থেকে কি খেলা আশা করব? তবু ও রোভার্সে অন্যদের থেকে ভাল খেলেছে, কিন্তু অন্যরা?”
”জবেদের আর অজিতের মাঝখানে স্পিডে মেরে দিয়ে অরুণাচলম বল নিয়ে ঢুকে গেল, গৌতমও গোল লাইনে দাঁড়িয়ে রইল, অরুণাচলম ডান থেকে বাঁ পায়ে বল নিয়ে তাইয়ে তাইয়ে শট নিয়ে উপরের জালে বল রাখল। তারপর জবেদ আর অজিত মাঠেই ঝগড়া শুরু করল, এসব ব্যাপার তো আগে ঘটত না!”
রঞ্জন চিবিয়ে চিবিয়ে কথাগুলো বলে মন্তব্যের জন্য জ্যোতির মুখের দিকে ত্যারছা চোখে তাকিয়ে থেকে শুধু আর একটা কথা জুড়ল, ”অনেকে বলছে জ্যোতি সিরিয়াসলি খেলেনি যেহেতু অরবিন্দ মজুমদার আর নেই।”
”কে বলেছে একথা?” জ্যোতি ছিলে ছেঁড়া ধনুকের মত সোজা হয়ে গেল। ”আমার নামে কে বলেছে?”
”শুনলাম কারুর কারুর কাছে, নাম বলব না।”
”রথীন? চঞ্চলদা? অজিত, বাচ্চচু, বিষ্ণু?”
”বললাম তো, নাম বলব না।”
”যতসব অযোগ্যদের ভীড় হয়েছে এখন সারথিতে। চিড়ে চ্যাপ্টা করে দিয়েছে মিডফিল্ড, কি গ্রাউণ্ডে কি এয়ারে বীট করে যাচ্ছে অ্যাট ইজ, কে যে কোথায় দাঁড়াবে, কাকে রাখবে তাই ঠিক করতে পারছে না। ডিফেন্স হাসফাঁস করছে দেখে বাধ্য হয়েই নেমে এসে খেলতে হয়েছে, আর রথীন বলল কেন নেমে খেলেছি। গোল নাকি সেজন্যই আমরা দিতে পারিনি। অদ্ভুত যুক্তি! আমি ছাড়া কি গোল দেবার আর লোক ছিল না? তারা কি করছিল? তিনটে ওপেন করেছি, তিনবারই বিষ্ণু সাত—আট গজ থেকে বাইরে মারল। মূর্তি একটা হেড করে বারের ওপর তুলে দিল গোলকীপার তখন মাটিতে পড়ে! আর অরবিন্দ মজুমদারের থাকা বা না থাকার সঙ্গে আমার খেলার সম্পর্ক কি? আমি আমার খেলা খেলব। এসব বাজে রটনার উদ্দেশ্য কি?”
