”অরবিন্দদাকে আগেই সরালেন না কেন? তা যদি করতেন তা হলে এই যে ঘটনা ওকে নিয়ে ঘটল, তার ফলে সারথির গায়ে কালি লাগত না।”
”কে বলেছে লেগেছে! এত বড় ক্লাবের গায়ে কালি কি অত সহজে লাগে? খোঁজ নিয়ে দ্যাখ লোকে সব ভুলে গেছে। এইটেই তো বড় ভরসা, সাপোর্টারদের স্মৃতি। সারথিতে সরোজদার কম অবদান! কিন্তু দ্যাখ, একজনও আর ওকে মনে রাখেনি। দু হপ্তা, তিন হপ্তা, বড়জোর এক মাস…ব্যাস। তারপর একটা ট্রফি জিতলেই সব স্মৃতি ধুয়ে মুছে সাফ।”
”আমাকে তো সবাই ‘অরবিন্দর ছেলে’ বলে জানে।” জ্যোতি মুচকি হেসে বলল, ”অরবিন্দদা না থাকলে আমার তো কোন প্রোটেকশন ক্লাবে থাকবে না।”
”তোর প্রোটেকশন!” চঞ্চল মৈত্র এমন ভয়ঙ্কর রকমের অবাক কথা যেন এই প্রথম শুনল। ”বলিস কি? ক্লাব তো তোরই প্রোটেকশনে রয়েছে!”
”কোন ট্রফি এ বছর জেতা হয়নি, লিগে ফোর্থ। সাপোর্টারদের বিখ্যাত বা কুখ্যাত স্মৃতি থেকে ধুয়ে মুছে যাবার সময় তো ঘনিয়ে এল।”
”ঠাট্টা করছিস। আমি যতদিন ক্লাবে আছি তোকে কোন চিন্তা করতে হবে না। ক’বছর আর খেললি যে এইসব চিন্তা শুরু করেছিস? দ্যাখ পি কে, চুনী, অরুণ কত বছর ফর্ম নিয়ে খেলে গেছে, হাবিব, শ্যাম এখনো খেলে যাচ্ছে আর তোর তো দশটা বছরও এখনো হল না। এখনো তুই সারথির সারথি!”
”কিন্তু একটা কথার উত্তর পেলাম না, অরবিন্দদাকে আগেই কেন ছাঁটাই করা হয়নি?” জ্যোতি স্বরটাকে তীক্ষ্ন, কঠিন করায় চঞ্চলের খোসমেজাজী খোলসটা খসে পড়ল।
”অসুবিধে ছিল। তা হলে কাকে কোচ করা যেত? কেউ নেই। কলকাতার কাউকে রাখা হবে না সেটা ঠিক করাই হয়েছিল। তা ছাড়া অরবিন্দকে সরাবার মত কোন কারণ বা যুক্তিও তেমন জোরাল ছিল না। মেম্বারদের ফেস করতে হবে, কি বলা যেত?”
”যদি অরবিন্দদার এই ব্যাপারটা না ঘটতো তা হলে কি করতেন?”
”কি আর করা যেত, কিছুই না। ওকে ক্লাব ছাড়ার জন্য তো বলা হয়েছিল।”
”সে কি! কই আমি তো শুনিনি এটা?” জ্যোতি সন্ত্রস্ত হয়ে উঠল।
”দাশুই ওকে বলেছিল। খুব ধুমধাম করে সংবর্ধনা দিয়ে ফেয়ারওয়েল আর চাঁদা তুলে হাজার তিরিশ—চল্লিশ টাকার একটা চেক দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। এসব কথা দাশু বা অরবিন্দ কেউই কি তোকে বলেনি?”
”না।”
চঞ্চলকে অপ্রতিভ দেখাল। কথাগুলো বলে ফেলাটা ঠিক হল কিনা বুঝতে পারছে না। তবে নতুন কোচ যখন এসে যাচ্ছেই তখন এসব কথা প্রকাশ হলে কিই বা আসে যায়।
”অরবিন্দদা কি বলেছিল?”
”তা তো আমি জানি না। তোর তো দাশুর সঙ্গে খুব ভাব, ওকেই জিজ্ঞেস করে নিস।”
জ্যোতির ক্ষোভ যতটা হচ্ছে ততটাই অভিমান। এই দু’জন লোকের এত কাছের মানুষ যে অথচ কেউই তাকে কিছু বলেনি। গুম হয়ে সে উঠে গিয়ে নিজের জায়গায় বসল। ট্রেন খড়্গপুর স্টেশনে তখন ঢুকছে।
.
।।সাত।।
মেসে নিজের ঘরে বিছানায় গা এলিয়ে দেবার সঙ্গে সঙ্গেই একটা খাম নিয়ে এল সূর্য। ডাকে এসেছে।
”আর আসেনি?”
”না, একটাই। চা দেব?”
”না।”
মাত্র একটা চিঠি! তিন—চারমাস ধরে চিঠির সংখ্যা কমে আসছে। জ্যোতির খারাপ লাগে ভক্তদের চিঠি না পেলে। অধিকাংশই বালক বা কিশোরদের লেখা। উচ্ছ্বাস, স্তুতি আর ট্রফি জেতার জন্য মিনতি, কখনো বা দাবী। এগুলো প্রথম দিকে পড়তে জ্যোতির ভালই লাগত। কিছু কিছু জমিয়ে রেখেছিল। পরে আর সে চিঠিগুলো পড়ত না, চোখ বুলিয়ে ফেলে দিত।
সই করা ফোটো চেয়ে চিঠি আসত। এক ফোটোগ্রাফার জ্যোতিকে তার দুটো ছবির নেগেটিভ দিয়েছিল। গোল দিয়ে দুহাত তুলে রয়েছে আর বিছানায় পাজামা পরা বালিশে হেলান দেওয়া—এই দুটির কয়েকশো প্রিণ্ট করিয়ে রেখেছিল। দুমাসেই সেগুলো শেষ হয়ে যায়। তারপর আবার প্রিণ্ট করায় এবং চিঠির বয়ান আর গুরুত্ব বুঝে এরপর সে ছবি উপহার দিত।
কিছু চিঠি আসত বয়স্কদের কাছ থেকে। প্রশংসা অথবা সমালোচনা এবং উপদেশে ভরা সেই সব চিঠি। সে খুঁটিয়েই পড়ত। কিভাবে শরীরের যত্ন নিতে হবে, ত্রিফলার জল খায় কিনা, ঘানির সর্ষের তেল মাখে কিনা থেকে শুরু করে টাকা কি ভাবে জমাতে হয়, জাতীয় সার্টিফিকেট কিনতে হলে কোন পোস্ট অফিসে কার সঙ্গে দেখা করতে হবে তাও বলা থাকত। সে সাঁই বাবার ভক্ত কিনা, স্বামী বিবেকানন্দর লেখা পড়েছে কিনা ইত্যাদি ছাড়াও একজন তার মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দেবার প্রস্তাবও পাঠিয়েছিল, মেয়ের ছবিসহ। তাই নিয়ে মেসে হাসাহাসি পড়ে গিয়েছিল। ”চল মেয়ে দেখে আসি, এক প্লেট খাবার তো পাওয়া যাবে,” গৌতম এই বলে জনাচারেককে রাজি করিয়েও ফেলেছিল।
চিঠি আসত মেয়েদের কাছ থেকেও। সাধারণ অভিনন্দন থেকে শুরু করে গদগদ আবেগভরা উচ্ছ্বাস, যাকে অনায়াসেই প্রেম নিবেদন বলা যায়। জ্যোতির লোভ হত এদের সঙ্গে আলাপ করতে, ঘনিষ্ঠ হতে। কোন কোন মেয়ে পরিষ্কারই লিখেছিল তারা জ্যোতির সঙ্গে শুতে চায়। নিজেকে দমন করতে না পেরে একজনকে সে উত্তরও দিয়েছিল।
কালো কাচের চশমা পরে জ্যোতি অপেক্ষা করেছিল পার্ক স্ট্রিটে মুলাঁ রুজ—এ। জীনস পরা, ঢোলা ব্লাউজ ছেলেদের মত ছাঁটা চুল, লম্বা, রুগণ একটি মেয়ে, চিঠির নির্দেশ মত যথাসময়ে তার টেবলে এসে দাঁড়ায়। তাকে দেখেই জ্যোতি ঢোঁক গিলেছিল। মেয়েটি ইংরাজী মিডিয়াম স্কুলে পড়ে, ঝরঝরে ইংরাজী বলে, বাবা রেলওয়েজে বড় অফিসার। কিছুক্ষণ গল্প করে, বীয়ার ও তন্দুরি চিকেন খেয়ে, দরকারী কাজ আছে আবার পরে দেখা হবে বলে জ্যোতি উঠে পড়ে। ট্যাক্সি ডেকে অনিচ্ছুক মেয়েটিকে তাতে তুলে দিয়ে এবং ভাড়ার জন্য কুড়ি টাকার একটি নোট জোর করে হাতে ধরিয়ে দেয়।
