সফর থেকে ফিরে আসার পর শৈবালের মুখে সে সাধন নাথের প্রশংসা শুনেছে। ”খুব স্ট্রিক্ট, ডিসিপ্লিনের দিকে কড়া নজর। আর দারুণ জ্ঞান ট্যাকটিকস সম্পর্কে।”
মাঠে সে সাধন নাথকে দেখেছে, অন্তত সাত—আটবার, কিন্তু কখনো মুখে হাসি দেখেনি। বোধহয় হাসলে লোকে উৎসাহিত হবে অন্তরঙ্গতার, তাই তাদের দূরে রাখার জন্য গোমড়ামুখো। একবার জ্যোতিকে মফৎলালের এক বাঙালী খেলোয়াড় বলেছিল, ”সাধন নাথের সঙ্গে কোনদিন কারুর ঘনিষ্ঠতা দেখিনি। প্রেম করে নাকি বিয়ে করেছে, কি করে যে বৌকে প্রোপোজ করল…আরো অবাক কাণ্ড দুটো মেয়েও হয়েছে, একেই বলে দৈবের হাত!”
ট্রেনেই জ্যোতি জিজ্ঞাসা করেছিল বিষ্ণুকে, ”সাধন নাথকে সারথিতে আসার জন্য কে কথাবার্তা বলল?”
”চঞ্চলদাই বোধহয়। হোটেলে একদিন ওর ঘরে সাধন নাথকে দেখেছি।”
জ্যোতি আর কিছু জিজ্ঞাসা করেনি। কলকাতার কাছাকাছি ট্রেন এলে সে চঞ্চল মৈত্রকে একা পেয়ে জানতে চায় কথাটা সত্যি কিনা এবং নির্বাচনটা কে করেছে? বরাবর অরবিন্দ মজুমদারের আওতায় সে থেকেছে। অঙ্কুর থেকে মহীরুহ হয়ে উঠতে যে অবাধ রোদ বাতাস জল দরকার, অরবিন্দ তাকে তা যুগিয়েছে। মাঠে তার খেলার স্বাধীনতায় কখনো রাশ পরাননি। এখন নতুন কোচ তাকে কি ভাবে ব্যবহার করবে, তাকে তার মত খেলতে দেবে কিনা, এই নিয়ে সে উদ্বেগ বোধ করতে শুরু করেছে।
”সাধনকে আনার কথা তো অনেক দিন ধরেই ভাবা হচ্ছিল।”
”অনেক দিন! কত দিন?”
”সিজনের গোড়া থেকেই।…অরবিন্দকে দিয়ে আর চলে না, মানছি লোকটা সারথির জন্য অনেক করেছে, টিমটা দাঁড় করিয়েছে, অনেক ট্রফি এনে দিয়েছে। কিন্তু গত দু বছর ধরে আর পারছিল না। চিরকাল মানুষ সফল হতে পারে না। একটা সময় আসে যখন সাফল্যগুলোই বোঝার মত কাঁধে চেপে বসে। বিপর্যয় ঘটার সময় তখনই আসে। তখনই সেট—ব্যাক হতে শুরু করে, যা সারথির এখন হয়েছে।
”ওর যা দেবার দিয়েছে। কলকাতার কটা কোচ পেরেছে যা অরবিন্দ পেরেছে? কিন্তু তাই বলে এত বড় একটা ক্লাব তো হাত পা গুটিয়ে বসে থাকতে পারে না। ও সব পুরনো বনেদী বড়লোকের বাড়িতে চলে। কবে ঘি খেয়েছি আজও হাতে তার গন্ধ শুঁকিয়ে বেড়ান, দেখছিস না মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের অবস্থা!”
”ওকে আনাটা কে ঠিক করল?”
”অনেকেই চাইছে। সন্তাোষদা, কিরণ ওরা তো গত বছরই বলেছিল, প্লেয়াররা সব মাথায় চড়ে বসছে অরবিন্দর আস্কারায়, পেমেণ্ট নিয়ে ঝগড়া করছে, খেলব না বলে মোচড় দিয়ে টাকা আদায় করছে, ছোটলোকের মত ব্যবহার করছে ক্লাবের সঙ্গে।”
”কিন্তু চঞ্চলদা, প্লেয়ারদের সঙ্গে যা কথা হয়েছিল, যে ভাবে কিস্তিতে টাকা দেবার কথা, তা যদি না দেওয়া হয়, আজ নয় কাল বলে যদি ঘোরানো হয়, তা হলে তো ওরা খেপে যাবেই। গত বছর পুলক যাত্রীতে চলে গেল। ও নাকি সারথির কাছ থেকে এখনো আট হাজার টাকা পায়।”
”মিথ্যে কথা। তুই আসিস, তোকে খাতা দেখাব, ওর সই দেখাব। কড়ায় গণ্ডায় সব টাকা নিয়ে গেছে। এমন কি মায়ের গলব্লাডার অপারেশন হবে বলে পাঁচ হাজার টাকা অ্যাডভান্স চেয়ে পায়ে ধারধরি করেছিল, দিয়েছি। সেই টাকা কেটে রেখে ওর সব প্রাপ্য চুকিয়ে দিয়েছি। আর এখন বলে বেড়াচ্ছে সারথি টাকা মেরেছে, নেমকহারাম…সব নেমকহারাম। থাকত তো হাওড়ার অজ গাঁয়ে একটা ভাঙা কুঁড়েঘরে, দেখেছি তো। সেখান থেকে তুলে এনেছিলাম। আর আজ কিনা…”আচ্ছা জ্যোতি এত বছর তো তুই আছিস, কোনদিন কি তোর একটা পয়সা বাকি ফেলেছি? বল, বল?”
জ্যোতি মাথা নাড়ল। সে জানে তার পাওনা টাকা বাকি থাকলে অরবিন্দদার জিভের চাবুকে প্রেসিডেণ্ট বা সেক্রেটারি জর্জরিত হবে। ‘ভক্ত’রা যদি জানতে পারে তা হলে কমিটি সদস্যদের মোটর গাড়িগুলোর কাচ আস্ত থাকবে না। সব থেকে বড় কথা, জ্যোতি বিশ্বাসকে অখুশি রাখাটা বিপদ ডেকে আনবে। প্রতি বছরই ট্রান্সফারের আগে জল্পনা হয় জ্যোতিকে নিয়ে, ক্লাব কত টাকার অফার নিয়ে ঝুলোঝুলি করছে তাই নিয়ে ময়দানে কানাঘুষো শুরু হয় এবং সে উইথড্র না করা পর্যন্ত সারথির সাপোর্টাররা যন্ত্রণায় দিন কাটায়।
”চঞ্চলদা, তা হলে আপনারা ঠিক করেই ফেলেছিলেন অরবিন্দদাকে সরাবেন?”
”আহ হা, সরাব বললেই কি ওকে সরান যায়? ওর কত সাপোর্টার ক্লাবে আর ক্লাবের বাইরে আছে তা জানিস? সরোজদা ওকে এনেছিলেন, আমিই তো গিয়ে কথাবার্তা বলেছিলাম। ক্লাবে সরোজদার প্রভাব প্রতিপত্তি তখন তুঙ্গে। যা বলে তাই হয়। খরচও করত দু হাতে, মেজাজও ছিল নবাবের মতো। তোর মোটর—বাইকটার কথাই মনে কর না, পেলি কি করে?…তারপর কি যে শনির দৃষ্টি ওর ওপর পড়ল, শেয়ার বাজারে একেবারে ভিখিরি হয়ে গেল। কিন্তু দ্যাখ, সেজন্য সারথি সঙ্ঘ কি ধুলোয় লুটোল না ক্লাব উঠে গেল? একটু তখন অসুবিধে হল বটে কিন্তু আবার নতুন লোক এসে সব ঠিকঠাক হয়ে গেল। একটা—দুটো লোক কি প্লেয়ারের ভরসায় বড় বড় ক্লাব তো চলে না, চলে নিজের জোরে। নামের ভারেই কেটে যায়।”
”প্রথম প্রথম একটু খিচখিচ করে, তখন একটু ঝাড়পোছ, এখানে ওখানে গ্রীজ আর মোবিল, নাট বল্টুগুলো একটু টাইট, তারপর চাকা যেমন ঘুরছিল তেমনিই ঘুরছে। বড় বড় কোম্পানিতে, কত ম্যানেজার, কন্ট্রোলার, ডিরেক্টর ছেড়ে যাচ্ছে, সরে যাচ্ছে, তাই বলে কি কোম্পানি উঠে যাচ্ছে?”
