তখন প্রধান স্ট্রাইকার ছিল শৈবাল। আগের বছর সে গোড়ালিতে চোট পেয়ে বসে গেছল। ধীরে ধীরে ফর্মে ফিরে এসেছে। ওর খেলাটা দ্রুত এবং কঠিন, ডিফেন্স চেরা থ্রু, পাশ দেয় পরিচ্ছন্নভাবে, আর চমৎকার হেড করে। সারথি থেকে মোহনবাগান হয়ে শৈবাল এখন খেলছে যুগের যাত্রীতে। তার পাশে সেদিন জ্যোতির নিজেকে ক্ষুদ্র মনে হচ্ছিল। কিক অফ থেকে শৈবাল বলটা প্রথম পরশের জন্য জ্যোতিকে দিল। সে হাফ ব্যাককে ব্যাকহিল করেই সামনে ছুটে গেল।
একতার সমর্থকদের উল্লসিত চিৎকারে সে পিছনে তাকিয়ে দেখল একতার খেলোয়াড়রা তাদের একজনকে জড়িয়ে চুমু খাচ্ছে আর গোল থেকে বল বার করে আনছে গৌতম।
শুরুতেই গোল খেয়ে জ্যোতি দমে গেল। শৈবাল অশ্রাব্য কয়েকটা গালি দিল নিজেদের গোলকিপারকে। কিক অফ থেকে আবার সে বল দিল জ্যোতিকে। এবার সে ব্যাকহিল করার ভাণ করে বলটা ডান পায়ে থামিয়ে পায়ের পাতা দিয়ে ইনসাইড লেফটকে দিল। সে বল ধরতে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ায়, দখলে রাখতে পারল না কিন্তু পা চালিয়ে বলটাকে বাঁদিকে জবেদের কাছে পাঠিয়ে দিল। জবেদ দোনামনা করল। টাচলাইন ধরে সোজা দৌড়বে না তুলে গোলমুখে ফেলবে সেটা ঠিক করে উঠতে পারছিল না। অবশেষে গোলের সামনে ফেলল। বলটার জন্য কয়েকটা পা এলোপাতাড়ি চলল। শেষে একজনের বুকের ডগা থেকে এল জ্যোতির কাছে।
বলটা আবার গোলমুখে পাঠিয়ে কিছু একটা প্রত্যাশায় অপেক্ষা করতে পারে অথবা ডানদিকে সরে গিয়ে গোল শট নিতে পারে—কোনটা করবে? কোণাচে ভাবে ডানদিকে সরে গেল জ্যোতি। সারথির জার্সিগুলো প্রত্যাশিত ক্রসের জন্য জায়গা নিয়ে দাঁড়াল আর একতার জার্সিগুলো তাদের সামনে ও পিছনে এসে গেল। কয়েক সেকেণ্ডের জন্য দুই দলের জটলা আর একতা গোলকিপার একই লাইনে জ্যোতির সামনে। সে উঁচু করে আলতো শটে বলটাকে মাথাগুলোর উপর দিয়ে ফেলল এবং ক্রসবার ঘেঁষে সেটা গোলে ঢুকল। একতার গোলকিপার শুধু ফ্যালফ্যাল চোখে বলটার দিকে তাকিয়ে রইল।
জ্যোতিও অবিশ্বাসভরে তাকিয়ে থেকেছিল। গোল? হতে পারে না! মুখ ফিরিয়ে রেফারির দিকে তাকাল। নিশ্চয় কারুর অফসাইড কিংবা কারুর ফাউল হয়েছে আর ফ্রি কিক নেবার জন্য রেফারি আঙুল দেখাচ্ছে জায়গাটার দিকে। এই ভেবেই সে তাকিয়েছিল এবং দেখল রেফারি সেণ্টারের দিকে হাত দেখাচ্ছে। তা হলে গোল! গ্যালারিতে ভূমিকম্প শুরু হয়ে গেছে।
সারথির প্রথম টিমে খেলতে নেমে তিন মিনিটেই জ্যোতি গোল করে। এরপর খেলাটা আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণ, অল্পের জন্য সুযোগ নষ্ট, গোলমুখে জটলা, অফসাইড এবং দীর্ঘ সময় ধরে মাঝ মাঠে আটকে থেকে অবশেষে এক—এক অমীমাংসিত থাকে।
পরদিন প্রত্যেকটি কাগজে তার ছবি বেরোয়। ম্যাচের প্রত্যেক রিপোর্টেই রেখে—ঢেকে, সতর্কভাবে, মোটামুটি একটি ধারণা, বিভিন্ন ভাষায় ও ভঙ্গিতে বলা হয়েছে—নতুন একটি তারকার উদয় হতে চলেছে।
পরের ম্যাচ হাওড়া ফ্রেণ্ডসের সঙ্গে। প্রথমার্ধেই সারথি দু গোলে পিছিয়ে গেল। অরবিন্দ মজুমদার বিরতির সময় কোনরকম উত্তেজনা প্রকাশ বা কাকে কি করতে হবে বলা পছন্দ করেন না। নাটুকে বক্তৃতা করে আবেগের তোড়ে ভাসিয়ে দেওয়া কি চিৎকার করে গালিগালাজ, তার রণকৌশলের অন্তর্গত নয়। খেলোয়াড়রা শান্তিতে জিরোক, এটাই তিনি চান।
”এবার চার—তিন—তিন ফর্মেশন নিয়ে আর আমরা খেলব না। এবার অল আউট অ্যাটাক। হারলে লড়ে হারব। মনে হচ্ছে, ওরা ধরেই নিয়েছে আমাদের হাঁটুতে জং ধরে গেছে, ঘুরে দাঁড়াবার ক্ষমতা আর নেই। কিন্তু এবার আমরা ওদের হাঁটু খুলে নেব, কয়েকটা গোল ওদের গেলাব। টু—থ্রি—ফাইভ—পুরনো আমলের ছকে এবার আবার আমরা খেলব। কিছু জিজ্ঞাসা করার আছে?”
কেউ কোন জিজ্ঞাসা তোলেনি। পঞ্চান্ন আর আটান্ন মিনিটে শৈবাল দুটো গোল দেয়, আটষট্টি মিনিটে জ্যোতির গোলে সারথি ম্যাচ জেতে। দু ঘণ্টা পর, স্নান সেরে যখন সে তাঁবু থেকে বেরোচ্ছিল তখন অরবিন্দদা তাকে ডেকে পাঠান।
”জ্যোতি তোর গায়ের মাপটা দিস তো। তোর বৌদি ভাল সোয়েটার বোনে।”
”এই গ্রীষ্মে সোয়েটার কি করব!”
”আহা, বোনা শেষ হতে হতে শীত এসে যাবে। নড়াচড়া তো নেই, বসে বসেই যতটা কাজ—টাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে পারে আর কি…তুই বরং নিজে গিয়ে মাপ দিয়ে আসিস।”
এই অরবিন্দ মজুমদারের জায়গায় আসবে সাধন নাথ। লোকটি সম্পর্কে জ্যোতি বিশেষ কিছু জানে না। কলকাতায় ছোট কয়েকটা ক্লাবের কোচ করেছিল এন আই এস থেকে ফিরে। ক্লাবগুলোর কোন উন্নতি হয়নি বরং একটি নেমে যায় দ্বিতীয় ডিভিসনে । তারপর এক বছর হাতে কোন ক্লাব পায়নি। একদিন হঠাৎ চাকরি নিয়ে সাধন নাথ ভিলাই স্টিলের ফুটবল কোচ হয়ে কলকাতা ছেড়ে চলে যায়। তারপর কলকাতার সঙ্গে তার কোন সম্পর্ক ছিল না, শুধু টিম নিয়ে আই এফ এ শীল্ডে খেলতে আসা ছাড়া।
সাধন ভিলাই ছেড়ে কবে বোম্বাইয়ে গেছে কেউ সে খবর রাখেনি। টাটা স্পোর্টস থেকে মফৎলালে গিয়ে দু বছর তাদের হারউড লিগ চ্যাম্পিয়ন করার পর সাধন ভারতীয় ফুটবল দলের কাজাকিস্তান সফরে কোচ হয়েছিল। জ্যোতি ও শৈবাল নির্বাচিত হয়েছিল কিন্তু জ্যোতি যেতে পারেনি। ম্যালেরিয়া তাকে ভারত দলে প্রথমবার খেলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেছিল।
