বোম্বাই থেকে ফেরার সময় ট্রেনে সে বিষ্ণুর কাছে শুনেছিল, মফৎলালের কোচ সাধন নাথকে সারথিতে আনা হবে অরবিন্দদার জায়গায়।
শুধু জ্যোতিই নয়, সারথির মালি থেকে র্যামপার্টের সাপোর্টার সবাই জানত অরবিন্দ মজুমদারকে আর রাখা হবে না। তার জায়গায় কাকে আনা হবে তাই নিয়ে কানাঘুষো শুরু হয়ে গেছিল। পি. কে, অরুণ ঘোষ, অমল দত্ত—এইসব নামগুলি বক্সারদের ঘুঁষির মত ছোঁড়াছুড়ি হচ্ছিল।
জ্যোতিও কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিল। অরবিন্দ মজুমদারকে বাদ দিয়ে সারথিতে সে কিভাবে নিজেকে মানিয়ে রাখবে, তার ফুটবল জীবনে এর প্রতিক্রিয়া কতখানি ঘটবে সেটাই বুঝে উঠতে পারছিল না। প্রতিটি ব্যাপারে অরবিন্দ তাকে সাহস, প্রেরণা এবং সুযোগ, অনেকের মতে ‘লাই’ দিয়ে গেছেন। দুজনের মধ্যে সম্পর্কটা প্রায় বাপ—ছেলের মত হয়ে উঠেছিল। জ্যোতির নিজের সম্পর্কে প্রত্যয়টা বেড়ে উঠেছিল অরবিন্দরই প্রভাবে।
সারথিতে প্রথম ম্যাচ খেলার কথা সে জীবনে ভুলবে না। আটটা লীগ খেলায় তাকে ড্রেস করিয়ে সাইড বেঞ্চে বসিয়ে রেখেছিলেন অরবিন্দ মজুমদার। জ্যোতি বিরক্ত, হতাশ হয়ে উঠছিল। গত বছর অবনমন থেকে কোনক্রমে রক্ষা পাওয়া অরুণোদয়ের সঙ্গে গোলশূন্য খেলার পর সারথি প্রবলভাবে পাঁচ গোলে বান্ধব সমিতিকে হারায়।
দুদিন পর জ্যোতি টেণ্টে অরবিন্দর ঘরে উঁকি দিয়ে দেখল কেউ নেই।
”একটা কথা বলব?”
”কি ব্যাপার, কি বলবে?”
সরাসরি জ্যোতি প্রসঙ্গে এল। ”এবার আমি মাঠে নামতে চাই।”
ঝাঁকুনি দিয়ে অরবিন্দ সিধে হয়ে বসলেন অবাক চোখে। ছেলেটির সাহসে নয়, স্পর্ধায় তিনি বিস্মিত। হেসে উঠতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু জ্যোতির চোখমুখের ভাব দেখে নিজেকে সংযত করলেন।
”খেলতে চাও? ভাল, এরকম অ্যাম্বিশনই দরকার।”
”পরের ম্যাচেই নামতে চাই, যদি টিমে জায়গা থাকে।”
”বসো।” গম্ভীর গলায় অরবিন্দ বললেন। ”সোজাসুজিই কথা বলা ভাল। তুমি মনে করছ যে ফার্স্ট ইলেভেনে খেলার উপযুক্ত?”
”হ্যাঁ।”
”বয়স কত?”
”উনিশ ছাড়াব এই জুলাইয়ে।”
”সারথিতে সবে এসেছ, এখনো পুরো সিজনও কাটেনি। এর মধ্যেই ফার্স্ট টিমে আসতে চাও?” অরবিন্দ সামান্য ধমকের ভঙ্গি স্বরে আনলেও, ছেলেটির নার্ভের তারিফ করলেন মনে মনে।
”রিজার্ভে তুমি একা নও, আরো চারজন আছে যারা গত বছর থেকে রয়েছে।”
”থাকতে পারে। যোগ্যতা না থাকলে অনন্তকাল রিজার্ভে থাকবে কিংবা অন্য ক্লাবে চলে যাবে। কিন্তু আমি ওদের স্ট্যাণ্ডার্ডের নই, এটা আমি জানি।”
জ্যোতির মনে হল, বোধহয় অহঙ্কার দেখাল। কিন্তু নিজেকে হামবড়াই করে তুলে ধরার জন্য সে কোচের কাছে আসেনি। তাকে বিবেচনার জন্য অনুরোধ জানাতেই তার আসা।
”একটা কথা জেনে রাখ, বলা কওয়া করে বা কাউকে দিয়ে পুশ করিয়ে আমার টিমে আসা যায় না। যখন নিজেকে প্রমাণ করতে পারবে তখন সিলেক্টেড হবে। বুঝেছ?”
”হ্যাঁ। আমি ভেবেছিলাম যদি একটা সুযোগ…”
”সুযোগ তখনই পাবে যখন আমি মনে করব তুমি তৈরি হয়েছ। ইতিমধ্যে যা ট্রেনিং করে যাচ্ছ করে যাও। এখনো তোমার সামনে বারো—চোদ্দ বছর পড়ে আছে। এত ব্যস্ত হবার কি? কতদিন বাড়ি যাওনি?”
”মেসে আসার পর আর যাইনি।”
”বিপিন গোস্বামী আমাকে চিঠি দিয়েছে, তুমি কেমন করছ—টরছ তাই জানতে। লিখেছি ভালই করছে।”
অরবিন্দ টেবলের কয়েকটা চিঠি তুলে নিয়ে তাতে মনযোগ দিলেন। কথাবার্তা শেষ হয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত।
”বেশ।” জ্যোতি হাসিমুখে বলল।
”মনে রেখ, মেনি আর কল্ড, ফিউ আর চোসন।”
জ্যোতি চলে যাবার পর অরবিন্দর মুখ হাসিতে ভরে ওঠে। ফুটবলারদের জীবন গড়ে তোলায় ভাগ্যের হাত থাকেই। পর পর কয়েকটা চোট আর রেড কার্ড, চারজনকে প্রথম টিম থেকে সরিয়ে দিতেই জ্যোতির সুযোগ এল।
”মনে কোর না তুমি পাকাপাকি টিমে এলে। সেরে উঠে ওরা ফিরে এলেই আবার সাইড বেঞ্চে বসতে হবে।” অরবিন্দ জল ঢেলে দিয়েছিলেন জ্যোতির টগবগে উৎসাহে। কিন্তু যেটা তিনি বলেননি কিন্তু বলার ইচ্ছা ছিল—এমনভাবে নিজেকে প্রমাণ কর যেন দল থেকে তোমাকে বাদ দেওয়া না যায়, এমনকি পুরো দল ফিট থাকলেও।
অরবিন্দ মজুমদার পঁয়ত্রিশ বছর গড়ের মাঠে ঘোরাফেরা করছেন। প্রতিভা চিনে নিতে তাঁর বেশি সময় লাগে না। তিনি বোঝেন জ্যোতিকে খুব সাবধানে গড়ে তোলা দরকার, বেশি চাপের মধ্যে ঠেলে দিলে পঙ্গু হয়ে যাবে। ওর পিছনে ডায়নামো লাগিয়ে উৎসাহ উদ্দীপনা বৃদ্ধি করাতেও তাঁর সায় নেই। স্বাভাবিকতা নষ্ট করে দ্রুতবেগে বৃদ্ধি ঘটাতে গেলে সর্বনাশ হয়ে যেতে পারে। এরকম তিনি অনেক দেখেছেন, প্রতিশ্রুতিবান ছেলেরা কুড়ি পার হতে না হতেই জ্বলে শেষ হয়ে গেছে, ক্ষমতার অতিরিক্ত নিজেদের ঠেলে তুলতে গিয়ে।
”নিজের যা খেলা তাই খেলবি। হাঁকপাক করে খেলবি না।” কথাগুলো মাঠে নামার সময় অরবিন্দ তাকে বলেছিলেন। ”দমদম একতাকে হারান কঠিন কাজ। টাফ ডিফেন্সের এগেনস্টে তোকে খেলতে হবে। বল থেকে যতটা পারবি দূরে ফাঁকায় থাকবি, বাচ্চচু, তোকে ফীড করাবে। আবার বলছি হাঁকপাক নয়, নিজের খেলাটা খেলে যাবি…আর কিছু আমার বলার নেই।”
অরবিন্দর কথাগুলো কতটা তার মাথায় ঢুকেছিল সে জানে না তবে একটা ব্যাপার আজও মনে আছে—অরবিন্দদা সেদিন ‘তুমি’ থেকে ‘তুই’—তে নেমেছিলেন। এটাই সেদিন তাকে একটা গভীর সুখে ভরিয়ে মাঠে নামিয়েছিল।
