”আমি বলছি না তোমার ভগবান নিকৃষ্ট বা অপাংক্তেয়, কিন্তু যা শুধুই সাময়িক আনন্দের বস্তু তা কখনো গুরুত্ব পায় না মানুষের কাছে। এর শেষে আছে ক্লান্তি, অবসাদ, অতৃপ্তি।”
জ্যোতি অধৈর্য স্বরে বলে উঠল, ”মাইক্রোফোনের সামনে এক লক্ষ বার শান্তির কথা বলার থেকে অনেক বেশি কাজ দেয় হাজার হাজার লোকের চোখের সামনে, মাঠের মাঝে যদি একটা স্পোর্টসম্যানশিপ দেখান যায়। এই সবই তো ভাল কাজের প্রেরণা দেয়, সৎ হতে এগিয়ে দেয়, চরিত্র সবল করে। হেরে যাওয়ার পরও হাসিমুখে অপোনেণ্টকে জড়িয়ে ধরা, রেফারীর ভুল ডিসিশনে ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও বিনা প্রতিবাদে তা মেনে নেওয়া, এসবের প্রভাব খোল—কত্তাল বাজিয়ে কীর্তন করার থেকে কি কম কিছু?”
বিপিন স্যারের প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য সে তাকিয়ে রইল। তিনি চুপ করেই রইলেন। জ্যোতির উত্তেজনা তাতে কমল না।
”আপনি যদি মাঠে যান তাহলে দেখতে পাবেন।”
মোটরবাইকে স্টার্ট দেবার আগে সে তার হাতে—ধরা কাগজের টুকরোটা ছুঁড়ে ফেলে দিল।
.
।।ছয়।।
.
রোভার্স থেকে সারথি ফিরে আসে মফৎলালের কাছে তিন—শূন্য গোলে হেরে। অরবিন্দ মজুমদারকে বাদ দিয়েই সারথি বোম্বাই গিয়েছিল। তিনি আর ক্লাবে একবারের জন্যও আসেন নি। একটা তিন লাইনের চিঠি ফুটবল সচিব চঞ্চল মৈত্রর কাছে তিনি পাঠিয়েছিলেন, তাতে শুধু লেখেন, ব্যক্তিগত অসুবিধার কারণে ক্লাবের ফুটবল কোচের কাজ চালিয়ে যাওয়া আমার পক্ষে আর সম্ভব নয়। তাই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিচ্ছি।
রোভার্সে যাওয়ার আগে ট্রেনিং করতে, কয়েকজন খেলোয়াড় মাত্র মাঠে এসেছিল। জ্যোতিও ছিল তাদের মধ্যে। অরবিন্দ মজুমদারের সরকারী রথীন চন্দ, চার বছর আগেও সে জ্যোতির সঙ্গে ফাস্ট ডিভিশনে খেলেছে। তাদের নিয়ে সে দৌড়, শুটিং ও পাসিং প্র্যাকটিস করায়। বয়স্ক প্লেয়াররা রথীনকে পাত্তা দেয় না, কর্তৃত্বব্যঞ্জক ব্যক্তিত্বও তার নেই। জুনিয়র ছেলেরা অবশ্য তাকে মান্য করে। ট্রেনিংয়ে প্রত্যেকেরই ছিল গাছাড়া ভাব। মাঠে এসেও দুজন প্র্যাকটিসে নামেনি, ইনজুরির অজুহাতে। জবেদ আর সত্যমূর্তি দেশে চলে গেছেন, ওরা বাড়ির থেকে বোম্বাইয়ে আসে শ্লথ, আনফিট অবস্থায়। বিষ্ণু কিছুটা সিরিয়াস হয়ে ট্রেনিং করেছিল। অসিত যা বলেছিল তাই করেছে, ট্রেনিংয়ে আসেনি। তবে বাড়িতে ওকে দু হাজার টাকা পৌঁছে দিয়ে আসায় প্লেনে বোম্বাই যায় এবং সবার থেকে ভাল খেলে।
জ্যোতি বুঝেই গিয়েছিল রোভার্স খেলতে বৃথাই যাওয়া। দলে আর বাঁধন নেই। পারস্পরিক ঈর্ষা থেকে যে আকচা আকচি তৈরি হয়েছে সেটাকে কাজে লাগাচ্ছে ক্লাবের কিছু মাতব্বর। খবরের কাগজে প্লেয়াররা, অফিসিয়ালরা নিয়মিত বিকৃতি, প্রতিবাদ আর অস্বীকৃতি জানানোর খেয়োখেয়ি শুরু করেছে। প্লেয়াররা তিন চারটে গোষ্ঠীতে ভাগ হয়ে গেছে। টাকার পেমেণ্ট প্রতিশ্রুতিমত না পাওয়ায়, ক্ষোভ বাড়তে বাড়তে ক্রমশ সন্দেহ এবং হতাশায় পৌঁছেছে। চোট থাকায় এবং ফর্মে না থাকায় কয়েকজন সিনিয়র প্লেয়ার দায়সারা ভাবে খেলে সারথিকে অসহায় অবস্থায় ফেলে দিয়েছে।
যে কোন সফল ফুটবল ক্লাবে একটা সময় আসেই যখন চূড়া থেকে গড়িয়ে পড়তে হয়। কোন কিছুই সঠিক ভাবে চলে না। নতুন করে সব কিছু আবার গড়ে তুলতে হয়। এমন ব্যাপার, গড়ের মাঠে বারবার দেখা গেছে ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান, মহমেডান বা যুগের যাত্রীর জীবনে। সারথি সংঘও ওঠা—পড়ার চক্রে এখন পড়তি ক্লাব।
অরবিন্দ মজুমদার ওটা বুঝতে পেরেছিলেন। গত সিজনের শুরুতেই তিনি কয়েকটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন ফুটবল কমিটির কাছে। টুর্নামেণ্ট খেলা, ট্রেনিং, রিত্রূ«ট করা ও প্লেয়ার ছেড়ে দেওয়া সম্পর্কে তার একটি কথাও কমিটি মেনে নেয়নি। তারপর একদিন তিনি আলগোছেই জ্যোতিকে বলেছিলেন, ‘আর আমার এখানে থাকার দরকার নেই।’
”সেকি! কেন?”
”আমি আর পারছি না, আর ভাল লাগছে না।”
বুঝতে না পেরে জ্যোতি তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
”জ্যোতি তোরও কি আর আগের মত আনন্দ হয় মাঠে নেমে? নেহাত টাকা নিয়েছিস তাই ম্যাচের পর ম্যাচ খেলতে নামছিস, এরকম কি এখন মনে হয় না? অন্তরের ভেতর থেকে কি আর তাগিদ পাস?”
জ্যোতি চুপ করে ছিল। কিছুকাল ধরেই এক ধরনের ক্লান্তি মাঝে মাঝে তাকে হাঁফিয়ে তুলছে। ফুটবল ক্রমশ একঘেয়ে হয়ে উঠছে। যাদের সঙ্গে বা যাদের বিরুদ্ধে তাকে খেলতে হয়, তাদের স্কিল বা বৈচিত্র আর তার কাছে প্রতিবন্ধক বা চ্যালেঞ্জ হয়ে তাকে উত্তেজিত করায় না, তার উদ্ভাবনী ক্ষমতার কাছে দাবী তোলে না। রুটিন মাফিক সে খেলে চলেছে। নিজেকে উন্নত করার দরকারটা তার কাছে এখন আর জরুরী ব্যাপার নয়।
”বদল ঘটা দরকার।”
”এই ফুটবল কাঠামোটার?” জ্যোতি কৌতূহল দেখাল।
অরবিন্দ মজুমদার হাসলেন, মাথা নাড়লেন। ”আমাদের জীবন যাপন প্রণালীটার, যে ছকের মধ্যে দিন কাটাচ্ছি সেটা একঘেয়ে হয়ে গেছে। ফুটবল ছেড়ে অন্য কোন জীবনে যাওয়া দরকার। আসল কথা হল বেঁচে থাকা। কি ভাবে প্রতিটি মুহূর্ত কাটাচ্ছি, সেটা যথার্থই আমাকে জীবন্ত করে রাখছে কিনা—”
অরবিন্দ মজুমদার আর কথা বাড়াননি। এখন জ্যোতির মনে হচ্ছে, যে তীব্রতা, উদ্যম আর পরীক্ষা—নিরীক্ষা চালিয়ে গড়ার যে ইচ্ছা এক সময় সে অরবিন্দদার মধ্যে দেখেছিল সেটা যেন ইদানীং ঝিমিয়ে পড়েছিল। ক্লাবে তাঁর বিরোধীরা ধীরে ধীরে ক্ষমতা দখল করে নানান ভাবে তাঁর কাজে বাধা তৈরি করছিল। টিম সিলেকশনে এক সময় তাঁর ইচ্ছাই ছিল চূড়ান্ত কিন্তু তাঁর কব্জা থেকে এই অধিকারটা ধীরে ধীরে কেড়ে নেওয়া হয়। ফুটবল সেক্রেটারির নির্দেশে এমন সব খেলোয়াড়দের দলে রাখতে শুরু করেন যাদের তিনি সারথির জার্সি গায়ে দেওয়ার যোগ্য বলে মনে করতেন না।
