লুকিয়ে থাকা একটা রাগ এবার তার মধ্যে ফেঁপে উঠতে লাগল। অসহায় করে দেওয়া এই সব ঘটনা অল্প সময়ের মধ্যে তার স্নায়ুমণ্ডলকে প্রহার করে করে এমন একটা অবস্থায় এনে ফেলেছে যে রেহাই পাবার জন্য অন্ধের মত ঘোরাঘুরি করে একটা কানাগলির মধ্যে এবার সে ঢুকে পড়েছে। রাগ তাকে দেয়ালের সামনে দাঁড় করিয়ে ধাক্কা দিল। তার বোধ বিবেচনা অনুভব থেঁতলে গেল।
”আপনি আমার যা উপকার করেছেন, কোনদিনই তা অস্বীকার করব না—কিন্তু তাই বলে ব্যঙ্গ করছেন কেন? ভুল মানুষ মাত্রই করে।”
”কিন্তু মানুষ সে ভুল শোধরায় যদি সে মানুষ হয়।”
”আমার উপায় ছিল না।”
”ছিল। তুই ঊষাকে বিয়ে করতে পারতিস।”
”না। তাহলে আমার খেলার সর্বনাশ হয়ে যেত।”
”ঊষার থেকেও তোর খেলা বড়!”
”হ্যাঁ।”
বলেই জ্যোতি অবাক হয়ে গেল। শব্দটা তার মুখ থেকে বেরোল কি করে! বলার জন্য মোটেই তার অনুতাপ হচ্ছে না বরং এত সাহস যে তার মধ্যে রয়েছে এটাই তার জানা ছিল না!
”কি বললি! আবার বল, আবার বল।”
বিপিন স্যার উঠে দাঁড়িয়েছেন। দু পাশে তাকালেন। জ্যোতির মনে হল, উনি যেন বেত খুঁজছেন দুর্বিনীত ছাত্রকে সায়েস্তা করার জন্য।
”আমার খেলাই আমার সব কিছু, গোটা অস্তিত্ব। আমি মন—প্রাণ দিয়ে খেলায় যেতে চেয়েছি, খেলাকে শ্রদ্ধা করেছি। এদেশে বিরাট ঝুঁকি কিন্তু তবু চাকরি করিনি আজও। স্বার্থপর না হলে কোন কিছুতেই ঠেলে ওঠা যায় না। নিজেকে নিজেই তৈরি করে নিয়েছি, সেজন্য স্বার্থপরও হয়েছি অনেক ব্যাপারে। সবাই বলবে অন্যায় করেছি, বলুক তারা। মানুষকে আনন্দ দেওয়া আমার কাজ, এর একটা গুরুত্ব সমাজে আছে। সারথির হাজার হাজার সাপোর্টারকে আমি আনন্দ দিয়েছি, এর কি কোন মূল্য নেই?
”তখন বিয়ে করলে আমি আর উঠতে পারতাম না। বিশ্বাস করুন স্যার, তখন সে কি যন্ত্রণার মধ্যে আমি দিন কাটিয়েছি, রাত কাটিয়েছি। তখন আমার বয়স মাত্র উনিশ। কিছু বুঝি না, জানি না। পাপ পুণ্যের কথা ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি। সেই প্রথম তখন আমি জিনিসটার মুখোমুখি হলাম। বয়স তখন উনিশ। কাউকে বলতে পারিনি, কেউ ছিল না আমার যাকে জিজ্ঞাসা করে জেনে নিতে পারি—এবার আমি কি করব? একদিকে ঊষা আমার সত্যিকারের বন্ধু, আমার ভালবাসা আর একদিকে খেলা, বড় হওয়ার আকাঙ্ক্ষা, ভবিষ্যৎ।
”স্যার, আমার অবস্থাটা তখন কি ছিল? আমি নিজেকে সংযত করতে পারিনি, ঠিক কথা। আমি পালিয়ে গিয়ে সারথির মেসে আশ্রয় নিয়েছিলাম, কয়েক বছর এই অঞ্চলেই পা মাড়াইনি। হয়তো সেজন্যই, কৃতকর্মের দাম চোকাতে আমি দ্বিগুণ ভাবে খেলায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম।
”পাপবোধ কিনা জানি না, তবে অন্যায় করেছি, এটা সবসময় আমার মাথায় থেকে গেছে। কিন্তু সাহসে কুলোয়নি ঊষার খোঁজ নিতে। সে বেঁচে আছে কিনা, বিয়ে করেছে কিনা, কিছুই আমি জানি না। ইচ্ছে করেই জানার চেষ্টা করিনি। হ্যাঁ, খেলা আমার কাছে ঊষার থেকেও বড় হয়ে উঠেছিল।
”স্যার, ঘর সংসার, ছেলে বৌ ফেলে রেখে কেউ যখন সন্ন্যাসী হবার জন্য নিরুদ্দেশ হয় তখন কি বলেন লোকটা নিষ্ঠুর, দায়িত্ববোধহীন, স্বার্থপর? বলেন না, কেননা সে বড় কাজ করার জন্য বৌ—ছেলেকে ফেলে বেরিয়ে গেছে, ভগবান পাবার জন্য তপস্যায় বসতে গেছে, জ্ঞানী হয়ে এসে মানুষকে উদ্ধার করবে বলে সংসার ছেড়েছে। আমি ভগবান—টগবান বুঝি না, বুঝি ওই হাওয়াভরা গোল জিনিসটাকে, ওটাই আমার ভগবান। আমার ভগবানের জন্য আমিও বেরিয়ে গেছি। আমাদের মধ্যে তাহলে তফাৎটা কোথায়? আমার সাধনার ফল দিয়ে আমি মানুষকে আনন্দ দিয়েছি, পার্থক্যটা কোথায়? আমি পাপী আর সে পুণ্যবান হবে কেন? গতর ভাঙ্গিয়ে আমার ভগবানের সেবা করি বলেই কি আমি নিকৃষ্ট আত্মার লোক, অপাংক্তেয়?”
জমে ওঠা অনেক কথা, যা বহুকাল বুকের মধ্যে দমবন্ধ করা অবস্থা তৈরি করে জ্যোতিকে বিস্ফোরণের পর্যায়ে নিয়ে গেছল, তারই সেফটি ভালভ খুলে সে যেন কিছুটা বার করে দিল। চোখ দুটি বিষ্ফারিত করে সে বিপিন স্যারের দিকে তাকিয়ে শক্ত করা মুঠো, শিরা ফুলে উঠেছে পুরো বাহুতে, ঠোঁটের কোণে ফেনা।
অনেকক্ষণ দুজনে চুপ করে বসে রইল। দেখে মনে হয় দুজনেই গভীর কিছু ভাবছে, আসলে একদমই ভাবছে না। এত শূন্য হয়ে পড়েছে মানসিক ভাণ্ডার যে কথা বলার কোন উপাদানই ওদের কাছে এখন নেই।
জ্যোতি উঠে দাঁড়াল। কথা না বলে দরজায় পৌঁছে একবার ঘুরে তাকিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল ঘর থেকে, বিপিন স্যার ডাকলেন। জ্যোতি দাঁড়িয়ে পড়ল।
”এই নে ঊষার ঠিকানাটা।”
কাগজের টুকরোটা হাতে নিল জ্যোতি। সেটার দিকে একবার তাকিয়েও দেখল না।
”জ্যোতি, মানুষ নিজের মত করে ভগবান গড়ে নেয়। কারুর ভগবানই ছোট নয়। কিন্তু কথাটা হল, সন্ন্যাসীরা বা সাধকরা যে সাধনায় জ্ঞান অর্জন করেন তার উদ্দেশ্য সাধারণ মানুষকে উন্নত জীবনের পথ দেখাবার জন্য, সমাজের মঙ্গল সাধনের জন্য, স্থায়ী আনন্দ লাভ যাতে হয়, প্রেম প্রশান্তি যাতে পায়, তার জন্যই তারা কষ্ট করেন। উদ্দেশ্য শুভ তাই তারা শ্রদ্ধেয়, মাননীয়। তোমার সাধনার দ্বারা তুমি কি মানুষকে ভালবাসার পথে, মঙ্গলের পথে নিয়ে যেতে পেরেছ? হিংসা, হানাহানি, রক্তপাত বন্ধ করার নির্দেশ কি তোমার খেলা দিতে পেরেছে?
