”ক্লাব কি করবে বলে তোর মনে হল…অরবিন্দদা সম্পর্কে?”
”ক্লাবে গিয়ে তো মনে হল শ্মশানে মড়া নিয়ে সবাই বসে রয়েছে।” বিষ্ণু মুখ খুলল। ”একি হল, একি হল! ক্লাবের চরিত্র নষ্ট হল, এইসব কথাই সবার মুখে। চঞ্চলদা বলল, একটা ফোনও যদি থানা থেকে করত, তাহলে ছাড়িয়ে আনার ব্যবস্থা করা যেত। ব্যাপারটা কোর্ট পর্যন্ত যেতই না।”
”ফোন করেছিল কি করেনি, তাই বা কে জানে?” অসিত বলল।
জ্যোতিরও তাই মনে হয়েছিল খবরটা পড়েই। এই ধরনের ঘটনায় নামী অনেক ফুটবলার, ক্রিকেটাররা ধরা পড়েছিল বলে সে শুনেছে। কিন্তু কেস লেখার আগেই তাদের থানা থেকে ছাড়িয়ে আনা হয়েছে। অরবিন্দ মজুমদারের নাম আছে, সারথিও নামী ক্লাব, থানা থেকেই কেউ ফোন করে ক্লাবের চেনাশোনা কাউকে প্রথমে জানিয়ে দেবে। পুলিসের বড়কর্তাদের মধ্যেও সারথির সাপোর্টার আছে। তাদের একটা ফোনেই কাজ হয়ে যাবে। অরবিন্দদা তাদের কাউকে তো থানা থেকে ফোন করতে পারতেন।
”অরবিন্দদা নিজে ছাড়া আর কারুর পক্ষে তো এ বিষয়ে বলা সম্ভব নয়। তবে থানায় খোঁজ নিলেই ব্যাপারটা জানা যাবে, ফোন কাউকে করেছিল কিনা।” অসিত এই বলে, ঘড়ি দেখল।
”আমার এক বন্ধুর দাদা সার্জেণ্ট, এখন বোধহয় পার্ক স্ট্রীট থানায়। ওকে একবার বলে দেখব, খোঁজ নিয়ে বলতে পারে কিনা।” বিষ্ণু বলল।
”অসিত তোর কি মনে হয়েছে অরবিন্দদা কাউকে ফোন করেছিল সাহায্য চেয়ে?”
”আমার ভাই কিছুই মনে হয় না। এই সব ক্লাব হল খচ্চচরদের জায়গা। গরু যখন দুধ দেয় তখন তার চাঁট হাসিমুখে সইবে, দুধ আর দেবে না বুঝলেই কসাইখানায় বেচে দেবে। আগে আগে টাকা চাইলেই পেতুম, এখন শালারা আজ নয় কাল করছে। তোকে তো এসব ঝামেলা পোয়াতে হয়নি কখনো। চল ঢুকি এবার।” বিষ্ণুকে একটা ঠেলা দিয়ে বিরক্ত মুখে অসিত এগিয়ে গেল হলের দরজার দিকে।
জ্যোতি চেঁচিয়ে বলল, ”প্র্যাকটিসে আসছিস তো?”
”না।”
অরবিন্দদার জীবনে এতবড় একটা ঘটনা ঘটে গেল অথচ এদের মধ্যে কোন প্রতিক্রিয়া নেই। টাকার চিন্তাই অসিতের মন জুড়ে। সিনেমায় জ্যোতির মন বসল না। হাফ টাইমেই সে হল থেকে বেরিয়ে আসে।
ফেরার পথে তার মনে হল, অসিত বা তার মত প্লেয়ারদের খুব দোষ দেওয়া যায় না। অরবিন্দদার সঙ্গে তার যা সম্পর্ক তেমনটি আর কারুর সঙ্গে হয়নি। অসিত চার বছর হল সারথিতে এসেছে অনেক ঘাটের জল খেয়ে। মুখে আঁটঘাট নেই। একদিন টেণ্টে সে চেঁচিয়েই বলেছিল, ”আমি গরীব ঘরের ছেলে, দারিদ্র্য কি জিনিস তা আমি জানি, লেখাপড়াও শিখিনি, শুধু ফুটবলটাই একটু খেলতে পারি। তাই ভাঙ্গিয়েই ব্যাঙ্কে চাকরি পেয়েছি আর দুটো পয়সার মুখ দেখছি। খেলা চিরকাল তো আর থাকবে না কাজেই যা পারি কুড়িয়ে বাড়িয়ে নেব। কোচ যেমন খেলতে বলবে তেমনি খেলব, ক্লাব যত ম্যাচ খেলতে বলবে তত ম্যাচই খেলব, শরীরে কুলোক আর নাই কুলোক কিন্তু টাকা আমি গুণে নেব, যা কথা হয়েছে তার থেকে একটা পয়সাও ছাড়ব না। গড়ের মাঠ জোচ্চচরদের জায়গা, ভালমানুষী করেছ কি মরেছ। সব ক্লাবে শালা পকেটমার হারামীরা বসে আছে।”
বাইক চালাতে চালাতেই জ্যোতি আপনমনে হেসে ফেলেছিল। অসিতের কথাগুলো একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। দেশ শিক্ষিত বেকারে ভর্তি অথচ লেখাপড়া জানে না। চাকরি কোনভাবেই অসিত পেত না যদি না ফুটবলটা খেলতে পারত। খেলা পড়ে আসছে এটা অসিত যতই বুঝতে পারছে ততই টাকার অর্থাৎ দর রাখার চিন্তা ওকে খেপিয়ে তুলছে। অরবিন্দদার জন্য ওর মনে বিশেষ কোন স্থান নেই। গড়ের মাঠে কেউই ওর আপন নয়। অরবিন্দদাও ওকে ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ করতেন না, তার আপত্তি সত্ত্বেও অসিতকে আনা হয়েছিল। এটা অসিত জানে।
”কই, বললি না তো, কেন অরবিন্দর সঙ্গে দেখা করতে যাবি?”
জ্যোতির চটকা ভাঙল। বিপিন স্যার তীক্ষ্নদৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন।
”ওকে লজ্জা দেবার জন্য?”
”না, না, তা কি করে হয়।”
”তাহলে লজ্জা ভেঙে দেবার জন্য?”
জ্যোতি হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। ঠিক। এই জন্যই সে যেতে চায়। একটা পাতলা হাসি তার মুখে সবে মাত্র ছড়াতে শুরু করেছে, বিপিন স্যার তখন ঠাণ্ডা স্বরে বললেন, ”ঊষার একটা চিঠি পেয়েছি, ওর বাবা ক্যান্সারে মারা গেছেন।”
হাসিটা ছড়িয়ে পড়ার মাঝপথে থেমে গিয়ে আবার ফিরে গেল ভেঙে পড়তে পড়তে। জ্যোতির কাঁধ দুটো সামান্য ঝুলে পড়ল। অস্ফুটে শুধু বলল, ”ঊষা!”
”মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হন। ওরা কয়েকদিন রেখে ছেড়ে দেন…বাড়ি গিয়ে মরার জন্য। মেয়ের কাছেই মারা গেছেন।”
”কোথায়? এখন ঊষা কোথায়?”
”আছে কোথাও…ভালই আছে মনে হয়। বিয়ে করেনি, করা উচিতও নয়। চাকরি করছে একটা গ্রামে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে, নার্সের চাকরি। লিখেছে, বদলি হতে চায় অন্য কোথাও। হেলথ ডিপার্টমেণ্টে আমার এক ছাত্র আছে এটা ও জানে। তাকে ধরেই ওর চাকরিটা হয়েছিল। লিখেছে, যদি তাকে দিয়ে বদলি করাতে পারি। ও আর বাণীপুরে থাকতে চায় না।”
”বাণীপুরটা কোথায়?”
”পশ্চিমবঙ্গেই।” বিপিন স্যার কঠিন স্বরে বললেন, প্রায় বিদ্রূপের মত সেটা শোনাল।
”আমার ঠিকানাটা দেবেন?”
”কেন, কি দরকার? সেখানে গিয়ে ওর লজ্জা ভেঙে দেবে বলে?”
জ্যোতি গুম হয়ে গেল। মাথার মধ্যে অপ্রকৃতিস্থ একটা ব্যাপার শুরু হয়েছে। বস্তুত সকাল থেকেই শুরু হয়ে এখন সেটা চূড়ান্ত পর্যায়ে তাকে ঠেলে তুলেছে।
