তারপর দুজনে দুজনের দিকে চোখ রেখে আর তাকাতে পারেনি। ঊষা ঘর থেকে বেরিয়ে চলে যায়। জ্যোতি আচ্ছন্নের মত বসে থাকে।
জ্যোতি অবশ্যই তার ‘ইম্পর্ট্যান্ট ম্যাচটা’ খেলেছিল। বিপিন স্যারকে কারা জানিয়েছিল জ্যোতির পায়ে সিরিয়াস ইনজুরি হয়েছে। তিনি জ্যোতিকে ডেকে সব ঘটনা শোনেন। বলেছিলেন, ”পারবি খেলতে?” জ্যোতি মাথা হেলিয়ে ছিল। ”মুখে বল।” ”হ্যাঁ পারব।” গম্ভীর স্বরে তারপর তিনি বলেন, ”তুই খেলবি। এবার আমার পরীক্ষা। মানুষ চিনতে পারি কিনা এবার জানতে পারব।”
পায়ের ব্যথা পুরো সারেনি কিন্তু গাঢ় গভীর ইচ্ছা দিয়ে সে নিজের শরীরকে যন্ত্রণার উপরে তুলে নিয়ে গেছল।
দুজন তার গায়ে আঠার মত লেগে ছিল সারাক্ষণ। তার হাঁটু, গোছ আর পাঁজর ছিল ওদের লক্ষ্যবস্তু। জ্যোতি সারা ম্যাচে দুবার শুধু তার প্রহরীদের শ্লথতার সুযোগ নিতে পেরেছিল। বল পায়ে তিরিশ গজ ছুটে সে নীচু স্কোয়্যার পাস দেয়। পেনাল্টি স্পটের কাছ থেকে গোপাল শট নিয়ে প্রথম গোল করে। সাত মিনিটের মধ্যেই গোল শোধ হয়ে যায়। খেলা শেষের চার মিনিট আগে জ্যোতি মাঝ মাঠে বল ধরে গোপালের সঙ্গে ওয়ান—টু—ওয়ান করে বাঁদিকে উঁচু ক্রস পাঠায়। সেখান থেকে ফেরত আসা বল বুকে ধরে জমিতে পড়ার আগেই বাঁ পায়ের ভলিতে জালে পাঠায়।
”স্যার, আপনি কি পাস করেছেন পরীক্ষায়?”
মাঠ থেকে বেরিয়ে এসেই জ্যোতির প্রথম কথা ছিল এইটাই। বিপিন স্যার ওকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। উত্তর দেননি। দু চোখ চেয়ে টপটপ জল ঝরছিল।
রাত্রে বাড়ি ফেরার সময় ঊষাদের বাড়ির সামনে সে দাঁড়ায়। ঘরে আলো জ্বলছে। সে দরজায় টোকা দেয়। জানলায় ঊষার মুখ উঁকি দিয়েই তাকে দেখে সরে গেল। দরজা খুলল।
”কি হল?” উদ্বিগ্ন মুখ, ঊষা প্রতীক্ষা করছিল।
”জিতেছি। উইনিং গোল আমার।”
রাস্তার উপরেই ঘর, খোলা দরজা, ঘরে আলো জ্বলছে। ঊষা হাত ধরে তাকে টেনে ভিতরে এনে দরজা বন্ধ করেই গলা জড়িয়ে ধরে চুমু খায়। এটা ঠিক কৃতজ্ঞতা জানাবার মত চুম্বন নয়। তবে তার থেকেও যে বেশি কিছু সেটা জ্যোতি এর মধ্যে অনুভব করে। কিন্তু সেটা যে কি, কোন দিনও সে বুঝে উঠতে পারেনি।
.
।।পাঁচ।।
জ্যোতি মোটরবাইক রাস্তায় রেখে, বিপিন স্যারের বাড়ির দিকে এগোল। রেডিয়াম ডায়ালের ঘড়িতে দেখল ন’টা—কুড়ি। স্যারের এই সময় বই পড়ার অভ্যাস ছিল, হয়তো এখনো আছে। একতলা কয়েকটা বাড়ির পিছন দিয়ে সরু একফালি পথ। রেডিও এবং টিভি চলছে। তাছাড়া সাড়াশব্দ নেই এবং অন্ধকার। ইঁটে ঠোক্কর লাগল। জ্যোতি অশ্রাব্য একটা গালাগালি দিয়ে উঠল। আগে যখন বাড়িগুলো ছিল না তখন কত সহজ সে স্যারের বাড়িতে আসত।
বিপিন স্যার ডেকেছেন কেন?
দূর থেকে জানলা এবং জানলার মধ্য দিয়ে সে স্যারকে দেখতে পেল। গেঞ্জির উপর হাতকাটা সোয়েটার, মাথাটা নীচু করে টেবিলের দিকে তাকিয়ে। টেবল ল্যাম্পটা বইয়ের উপর হুমড়ি খেয়ে রয়েছে। ঘরটা আবছা অন্ধকার। দেয়ালে কাঠের পাটাতনে কিছু বই। এই ঘরে দিনের অধিকাংশ সময় তাঁর কাটে। বাইরের লোক আর ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলা বা খাতা দেখা, বই পড়া এই ছোট্ট ঘরেই।
”স্যার আমি জ্যোতি, ডেকেছেন?”
জানলার কাছে দাঁড়িয়ে সে বলল। বিপিন স্যার ঘুরে তাকিয়ে অন্ধকারের সঙ্গে চোখ সড়গড় করে নিয়ে বললেন, ”দরজা খোলা আছে, আয়।”
ঘরের দ্বিতীয় চেয়ারটায় বসার পর জ্যোতি কৈফিয়ৎ দেবার স্বরে বলল, ”কলকাতায় গেছলাম। অরবিন্দদার সঙ্গে…”
”কাগজে দেখলাম।” কিছুক্ষণ টেবিলের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে বললেন, ”দেখা হল?”
”না। বৌদিকে নিয়ে ভোরেই কোথায় চলে গেছেন। মনে হয় দেশের বাড়িতে। ভাবছি সেখানে একবার যাব।”
”কেন?”
জ্যোতি চট করে জবাব দিতে পারল না। কেন সে যেতে চায় সেটা তার কাছে পরিষ্কার নয়। কেউ বিপদে পড়লে সাহায্য করতে যেতে হয়। শোক পেলে সান্ত্বনা দিতে যেতে হয়। কিন্তু অরবিন্দদার ব্যাপারটা বিপদ বা শোকের পর্যায়ে পড়ছে না। এখন তাকে সাহায্য করারও কিছু নেই। যা হবার হয়েই গেছে।
সন্ধ্যায় সিনেমা দেখতে গেছল। ইংরাজী মারপিটের ছবি। সিনেমা হলে ঢোকার মুখে দেখা হয় অসিত আর বিষ্ণুর সঙ্গে। অসিত এগারো বছর ফাস্ট ডিভিশনে খেলছে। সারথি তার পঞ্চম ক্লাব। একবার মারডেকা টুর্নামেন্ট খেলে এসেছে। লেফট ব্যাক ছিল কিন্তু অরবিন্দদা ওকে লিঙ্কম্যান করেছেন। অসিত এজন্য অসন্তুষ্ট। বিষ্ণু এই বছরই সারথিতে এসেছে টালিগঞ্জ অগ্রগামী থেকে। ময়দানে অন্যতম উদীয়মান লেফট আউট। মোট ছ’টা পুরো ম্যাচ খেলেছে। সুবিধে করতে পারছে না।
ওদের দেখে জ্যোতি এগিয়ে গেল।
”দাশুদাকে দেখেছিস আজ?”
”দাশুদা? না।” অসিত অধৈর্য। শো আরম্ভ হতে এখনো দশ মিনিট বাকি। ”তুইও কি বইটা দেখতে এসেছিস।”
”হ্যাঁ। ক্লাবে গেছলি?”
”গেছলুম। টাকা দেবে বলেছিল কিরণদা, দু হাজার। দিল না। এই নিয়ে তিনবার ঘোরাল। আমিও বলে দিয়েছি, রোভার্সে যাব না, প্র্যাকটিসেও আর আসব না। আরে বাঞ্চোৎটা বলে কিনা—ক্লাবের সব্বোনাশ হয়ে গেছে, মানসম্মান ধুলোয় লুটিয়ে গেছে আর তুই কিনা টাকা চাইছিস? শোন কথা, ক্লাবের মান আমি নষ্ট করেছি নাকি যে টাকা দেবে না? অরবিন্দ মজুমদার করেছে, সেজন্য তার পেমেণ্ট আটকাও!”
