তরুণ পরদিনই স্কুলে এল। তার জ্বর সেরে গেছে। তৃতীয় ম্যাচে সে খেলতে চায়।
”কার জায়গায় খেলবে? জ্যোতিকে তো বসাবার প্রশ্নই ওঠে না, আর অন্য কাউকে বসিয়ে যে তোমায় খেলাব তেমন খারাপ কেউই খেলেনি। যদি কারুর ইনজুরি হয়, অক্ষম হয়ে পড়ে তখন বরং তোমাকে নেয়া যাবে।”
বিপিন স্যারের কথা শুনে কিছুক্ষণ গোঁজ হয়ে থেকে তরুণ চলে যায়।
পরদিন ভোরে, যখন সূর্যের আভাটুকু মাত্র আকাশে লেগেছে, কাকপক্ষিরা বাসার আড়মোড়া ভাঙছে গাছের ডালে বসে, দূরের মানুষকে আবছা দেখাচ্ছে, এমন সময়ে জ্যোতি জগামালির মাঠে এল প্র্যাকটিসের জন্য। হাতে উপহার পাওয়া বলটা।
মাঠের মাঝমাঝি বলটা রেখে দিয়ে সে চক্রাকারে মাঠের কিনারা দিয়ে ছুটতে শুরু করল। এটা তার প্রতিদিনের কাজ। ঝড়—জল—বৃষ্টিতেও সে কামাই দেয় না। তার শরীরটা শীর্ণ বটে কিন্তু ফুসফুসের ক্ষমতা তার চেহারা থেকে বোঝা যায় না।
জ্যোতি চিবুক তুলে সামনে তাকিয়ে ছুটে যাচ্ছিল তাই লক্ষ্য করেনি চারটি ছেলে কখন মাঠের ধারে এসে দাঁড়িয়েছে। তারা মন্থরগতিতে মাঠের মধ্যে এসে বলটা নিয়ে পায়ে পায়ে নাড়াচাড়া করছে, তখন জ্যোতি দেখতে পেয়ে ছুটে এল।
”কি হচ্ছে?”
”কি আবার হবে, খেলছি।” রুক্ষস্বরে একজন বলল, এদের তিনজনকে জ্যোতি চেনে। তরুণের সঙ্গে সকালে মেয়ে স্কুলের সামনে বসে থাকে।
”থাক, খেলতে হবে না।”
”খেলব না কি রে ব্যাটা, তোর বাবার বল? এটা স্কুলের বল।”
”তোমরা স্কুলে পড় নাকি?”
”পড়ি কি না পড়ি সেটা কি তোকে বলতে হবে?”
”দিয়ে দাও।”
জ্যোতি ঝুঁকে বলটা কুড়িয়ে তুলতেই একজন তার বল—ধরা তালুতে লাথি কষাল। বলটা ছিটকে গেল। সে ছুটে যাচ্ছিল বলটা ধরার জন্যে। সেই সময় একজন পা বাড়িয়ে তার পায়ে আলতো লাথি মারতেই সে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। দ্রুত উঠে দাঁড়ান মাত্র তার পাছায় এবং উরুতে দুজন লাথি মারল। সে আবার পড়ে গেল। ওদের প্রত্যেকের পায়ে শক্ত চামড়ার জুতো।
এরপর মিনিট খানেক ওই চারজন মাঠে ছিল, জ্যোতির চিৎকার শুনে পথ দিয়ে যাওয়া দুজন লোক এগিয়ে না আসা পর্যন্ত। তারই মধ্যে একজন ওর কাঁধে, আর একজন কোমরে লাথি মেরে চলে। আর একজন পায়ের গোছের উপর দাঁড়িয়ে শরীরের সবটুকু ভার চাপিয়ে লাফাতে থাকে।
চারজন ধীরে সুস্থেই রাস্তায় নেমে অদৃশ্য হয়ে যায়। লোক দু’জন জ্যোতিকে হাত ধরে টেনে তোলে। কয়েক পা এগিয়েই সে কাৎরে উঠে পায়ের যন্ত্রণায় বসে পড়ে।
তার প্রথম চিন্তা হয় বলটার জন্য। হামা দিয়ে সে কুড়ি মিটার গিয়ে বলটা দু হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। এরপর ভয় হয় বাড়ির কথা ভেবে। পড়ার বদলে ফুটবল খেলার জন্য বাবার আপত্তির কিছু কিছু চিহ্ন তার কপালে, বাহুতে, পায়ে জ্বলজ্বলে হয়ে রয়েছে। এখন এই অবস্থায় বাড়ি ফিরলে এই যন্ত্রণার উপর আরো কিছু যন্ত্রণা নিতে হবে।
ওরা মারল কেন, তা বুঝতে জ্যোতির মাথা খাটাতে হল না। পরের ম্যাচে তার খেলা বন্ধ করতে চায়। তার ইনজুরি হলে তরুণ নামতে পারবে। একমাত্র পায়ের গোছের আর কাঁধের আঘাত ছাড়া খুব বেশি তার লাগেনি। দুটো দিন সে হাতে পাচ্ছে, এর মধ্যে কি ঠিক করে ফেলতে পারবে না? যেভাবেই হোক পারতেই হবে। ওদের দেখিয়ে দিতে হবে, এভাবে মেরে তাকে দাবান যায় না, যাবে না।
একটা রাগ দপদপ করে উঠল তার শরীরের মধ্যে। শিরাগুলোর মধ্যে দিয়ে গরম স্রোত ছড়িয়ে পড়ল, কোষে কোষে। জ্যোতির পা থেকে কিছুক্ষণের জন্য যেন বেদনা মিলিয়ে গেল। সে কখন যে হাঁটতে হাঁটতে ঊষাদের বাড়ির সামনে পৌঁছে গেছে খেয়াল করেনি।
”কি ব্যাপার, এত সকালে?”
ঊষা স্কুলে যাবার জন্য তৈরি। খয়েরি স্কার্ট, সাদা ব্লাউজ, টেনে চুল বাঁধা, খয়েরি টিপ, কানে ছোট্ট সোনার রিং।
”কি হয়েছে তোমার? খোঁড়াচ্ছ কেন?”
”একটু চূণ—হলুদ যদি করে দিতে। প্র্যাকটিস করতে গিয়ে গর্তে পা’টা মুচকে গেল।” মার খাওয়ার ব্যাপারটা সে চেপে গেল।
ঊষা আর স্কুলে যায়নি সেদিন। ধারে কাছে বরফ না পাওয়ায় তার বাবা সুবিনয় বাসে ব্যারাকপুরে গিয়ে বরফ আনেন। সারা সকাল বরফে আর গরম জলে পাল্টাপাল্টি করে ডান পায়ের শুশ্রূষা করে যায়।
”ঊষা, বাড়িতে যেন না জানতে পারে। তাহলে বাবা মেরে ফেলবে।”
”না, বলব না। তুমি বরং এখানেই দুপুরে শুয়ে থাক। আমি তোমাদের বাড়িতে গিয়ে খবর দিয়ে আসছি।”
”না, না, একদম নয়। এখানে আছি বলো না। বরং বলে এসো স্কুলে আজ ফাংশন আছে, স্টেজ তৈরি করছে বলে আটকে পড়েছে। অবশ্য দুপুরে বাড়ি না ফিরলে মা কিছু মনে করবে না, ভাতটা বেঁচে গেল তো!”
ব্যথাটা কমে গেল বিকেলের মধ্যেই। ঊষার কাঁধ ধরে জ্যোতি ঘরের মধ্যে চলাফেরা করল। ডান পায়ে শরীরের ভর রেখে দেখল ব্যথা কম লাগছে।
”তোমার জন্যই সম্ভব হল।’ কৃতজ্ঞ স্বরে সে ঊষাকে বলেছিল। ”খুব ইম্পর্ট্যান্ট এই ম্যাচটা, আমার কাছে।”
খুশিতে ঝকঝকে হয়ে ওঠা ঊষার মুখটা তখন তার কাছে পৃথিবীর একমাত্র সৌন্দর্য বলে মনে হল। সে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে।
”যদি খেলতে পারি, তাহলে তোমার জন্যই পারব। চ্যালেঞ্জ দিয়ে এই ম্যাচটা খেলব।”
এরপরই সে অদ্ভুত এক কাণ্ড করে বসে। ঊষাকে দু হাতে জড়িয়ে বুকের কাছে এনে তার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরে। কৃতজ্ঞতার প্রকাশ ছাড়া ওই চুম্বনে আর কিছু ছিল না। ঊষা চোখ বুঁজে ছিল, বাধা দেয়নি।
