রাতে বৃষ্টি হয়েছিল। মাধবপুর হাইস্কুল গোবড়ডাঙ্গা এলাকায়। এই মাঠ তাদের অপরিচিত নয়। মাঠ অসমান, অল্প জায়গাতেই ঘাস রয়েছে। পেনাল্টি এলাকায় বিশেষ করে গোলের সামনে কাদা। মাঝে মাঝে জোরালো হাওয়া বইছে। মাঠ এবং মেঘলা আবহাওয়া জ্যোতির পছন্দের নয়। তার সূক্ষ্ম ছোঁয়ার জন্য দরকার খটখটে ঝকঝকে মাঠ আর মৃদু বাতাস।
কাদাই তাকে মুশকিলে ফেলে দেয়। এড়াতে হলে পেনালটি এলাকার বাইরে তাকে খেলতে হবে অর্থাৎ শট নিতে হবে দূরপাল্লার। প্রথমার্ধে বাতাসের সাহায্য পেলেও, বলের জন্য তাকে ছ’—সাত মিনিট অপেক্ষা করতে হয়। মাধবপুর গোঁয়ারের মত খেলছে। কোনক্রমে বাতাসের বিরুদ্ধে প্রথমার্ধ কাটিয়ে, দ্বিতীয়ার্ধে সুবিধা নেবার পরিকল্পনা নিয়ে ওরা খেলছিল। বল ধরে রেখে সময় কাটাচ্ছিল মাধবপুর।
হতাশ হয়ে পড়ছিল জ্যোতি। ডিফেন্সকে সাহায্য করার জন্য নেমে গিয়ে খেলছে তার রাইট আউট নবারুণ। ডানদিকটা একদম ফাঁকা পড়ে আছে। একবার যদি একটা বল সে পায় তাহলে চড়চড় করে সে গোলের দিকে এগোতে পারবে। দু’—তিনবার হাত তুলে সে বল চাইল। কিন্তু কেউ নজরই করল না। ভাবল চেঁচিয়ে বল চাইবে। কিন্তু টিমে এই প্রথম সে বড় ছেলেদের সঙ্গে খেলছে, যদি ওরা বিরক্ত হয়! যদি বল নিয়ে কিছু একটা করতে না পারে তাহলে ওরা বিপিন স্যারকেই দুষবে, এমন একটা অপদার্থকে নামাবার জন্য।
অবশেষে সে বল পেল। নিজেদের কারুর দেওয়া পাস থেকে নয়। মাধবপুরের স্টপার একটা জোরালো শট নিতে যায়। বলটা তার বুকে কেটে গিয়ে সোজা আসে জ্যোতির কাছে। তার ধারেকাছে কেউ নেই। বলটা পেয়েই সে তরতরিয়ে গোলের দিকে ছোটে মাঠের শুকনো জায়গা ধরে। মাধবপুরের চারজন ছুটছে তাকে লক্ষ্য করে। কিন্তু তারা পৌঁছবার আগেই পেনালটি এলাকার কিনার থেকে ডান পায়ে জমিঘেঁষা শট নিয়ে দ্বিতীয় পোস্ট ঘেঁষে বল গোলে পাঠায়, এগিয়ে আসা গোলকিপারের ডানদিক দিয়ে।
ওরা ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে, কেউ কেউ চুমুও খায়। ”দারুণ শটটা নিয়েছিস,” ”আর একটা গোল দে” ”তুই এত ভাল শট নিস!” জ্যোতি মাঠের বাইরে একজনকে ছাতা নাড়তে দেখেছিল। বিপিন স্যার।
এরপর তার কাছে বল আসতে শুরু করে। সে যে কিছু করতে পারে এটা দেখিয়েছে, ওরা চায় আবার করে দেখাক। জ্যোতি হতাশ করেনি। পনেরো গজ দূর থেকে একটা শট গোলকিপারের মাথার উপর দিয়ে ডীপ করে গোলে ঢোকে। দ্বিতীয়ার্ধে কর্ণার থেকে হেড করে সে তৃতীয় গোলটি করে। হ্যাটট্রিক!
বাড়ি ফেরার সময় বাস থেকে নেমে নাইলন জালের থলিতে রাখা চারটি বলের একটা বার করে বিপিন স্যার তার হাতে দিয়ে বলেন, ”এই নে।”
জ্যোতিকে অবাক হতে দেখে বলেন, ”এটা তোকে দিলাম।”
”দিলাম!…একেবারে?”
”হ্যাঁ।”
জীবনে এই প্রথম তার নিজস্ব ফুটবল। অবাক হয়ে সে বলটার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর বুকে জড়িয়ে ধরে তার মনে হচ্ছিল একটা বেড়াল যেন পাকিয়ে গোল হয়ে বলে রূপান্তরিত হয়েছে। দু হাতে সে বলটাকে আদর করে।
দ্বিতীয় ম্যাচ দক্ষিণেশ্বরের রাজা প্রাণকৃষ্ণ স্কুলের সঙ্গে। খেলা শুরু হবার সঙ্গে সঙ্গে দু’দলই বলের পিছনে তাড়া করে অদ্ভুত তালগোল পাকান অবস্থা তৈরি করে ফেলল। দু’দলের স্টপাররা ছাড়া আর সবাই গোঁতাগুতিতে মেতে গেছে। জ্যোতি ভীড় থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখল। প্রথমার্ধ শেষ হল গোলশূন্য থেকে।
গ্লুকোজ জল খাবার সময় বিপিন স্যার একটা কথাই শুধু তাকে বলেন, ”একটু স্কিল দরকার। মাঠের মাঝখানে জড়াজড়ি হচ্ছে। ডানদিকটা ফাঁকা পড়ে। ফাঁকা জায়গা কাজে লাগা।”
দ্বিতীয়ার্ধে জ্যোতি তাই করল। বলটা এর পায়ে তার পায়ে হয়ে ঘুরছে লাফাচ্ছে। সে হঠাৎ ভিতরে এসে বল ধরেই ইনস্টেপে প্রাণকৃষ্ণ স্কুলের তিনজনের মাথার উপর দিয়ে ফ্লিক করে, নিজেই ছুটে গিয়ে বলটা ডানদিকে ধরল। সামনে তাকিয়ে দেখল লেফট ব্যাক এগিয়ে আসছে বুনো মোষের মত। তার পিছনে, একই লাইনে গোলকীপার ছাড়া আর কোন ডিফেণ্ডার নেই।
জ্যোতি বলটাকে ডান পায়ে বাঁ পায়ে করল বিদ্যুৎ ঝলকের গতিতে। লেফট ব্যাক থমকে যেতেই তার পাশ দিয়ে বল নিয়ে বেরিয়ে ছুটল পেনাল্টি এলাকার দিকে। এখন শুধু গোলকিপারকে হার মানানো, গোলের মুখ ছোট হয়ে এসেছে। গোলকিপার যদি বেরিয়ে আসে তাহলে মাথার উপর দিয়ে বলটা লব করে দেবে অথবা বল নিয়ে সরে যাবে বাঁদিকে। কিন্তু গোলকিপার এক জায়গায় দাঁড়িয়ে রয়েছে শটের অপেক্ষায়।
শট নিলে সহজেই পাঞ্চ করে বল সরিয়ে দেবে, এটা বুঝতে পেরেই জ্যোতি গোলকিপারের ছ’ গজের মধ্যে পৌঁছেই গমনপথটা বদলে গোলের মাঝের দিকে এত দ্রুত সরে গেল যে, গোলকিপার বিপদ যখন বুঝতে পারল তখন দেরী হয়ে গেছে। ডান পায়ে বলটা ঠেলে বাঁ পায়ে জ্যোতি সুইং করিয়ে গোলে মারল। ঝাঁপান গোলকিপারের আঙুল ছুঁয়ে উপরের জালে বল আটকাল।
ফুটবল শিল্পের সঙ্গে সম্পর্করহিত এই ম্যাচে একবারই সে মায়াবী একটা মুহূর্ত তৈরি করে দিয়েছিল। এ গোলে জ্যোতির স্কুল জেতে। গোল দেবার পরই মাঠের বাইরে একটা ছাতাকে পতাকার মত নাড়তে দেখার আশা নিয়ে সে তাকায়। নিরাশ হয়নি।
দুটি ম্যাচ চারটি গোল। অঘোরচন্দ্র আন্তঃ আঞ্চলিক খেলছেই জ্যোতির জন্য। স্কুলের প্রায় বারশো ছেলের চোখ তার উপর পড়ল। এখন সে স্কুল হিরো।
