”কিন্তু এখন যা করছ সেটা তো একদিন জানতে পারবে!”
”আমি সরে যাবার চেষ্টা করছি। চাকরি বাকরি পাওয়া আমার পক্ষে শক্ত, চেহারাটা ছাড়া কোন যোগ্যতাই নেই। সিনেমায় চেষ্টা করেছিলাম, হয়নি। স্টেজে চেষ্টা করে যাচ্ছি, যাত্রায়ও। মডেলিং লাইনে আছে এমন কয়েকজনকে চিনি, এবার দেখি ওখানে কিছু হয় কি না।”
”কবে তোমার টাকার দরকার?”
”ভেলোর ঘুরে আসি তারপর বলব। কিন্তু অত টাকা দিতে তোমার অসুবিধা হবে না তো?”
”দশ বিশ হাজার যখন তখন দেবার ক্ষমতা আমার আছে।” কথাটা বলেই জ্যোতির হাসিমুখটা হঠাৎ পাংশু হয়ে গেল। জগামালীর মাঠের ধারে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে বিপিন স্যার কাঁধে হাত রেখে বলেছিলেন, ”জ্যোতি, ডাক্তার পাঁচশো টাকা চাইছেন, যোগাড় করতে পারিস?” শুনে তার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়েছিল। ”স্যার, এত টাকা এখন কোথায় পাব!” যেখানে থেকে পারিস যোগাড় কর, নয়তো উষার সর্বনাশ হয়ে যাবে। আমার কাছেও তো অত টাকা নেই যে দেব।”
”একটু সময় লাগবে শোধ দিতে।” গৌরীর সারা শরীরে অনুনয়ের সঙ্গে কাতর আবেদন। জ্যোতি বিষণ্ণ বোধ করল। সেটা কাটিয়ে ওঠার জন্য হালাকা ফাজিল স্বরে বলল, ”আরে সেজন্য ভাবতে হবে না।” গলার স্বর নামিয়ে বদমাইসী চাহনি নিয়ে তারপর বলল, ”তুমিই তো আমায় পুরুষ মানুষ করে দিয়েছ।”
”বটে! পুরুষ মানুষ হয়েই তুমি আমার কাছে এসেছিলে।”
জ্যোতি ম্লান হয়ে গেল। গৌরীর কথার মধ্যে কি যে এক ইঙ্গিত রয়েছে, বারবার কেন জানি উষাকেই মনে পড়ছে। সে কোথায় এখন? বাড়িটা বিক্রি করে মেয়েকে নিয়ে সুবিনয় ভট্টাচার্য কোথায় যে মিলিয়ে গেলেন! আর সে নিজেও কেন যে উর্ধ্বশ্বাসে ছুটে গেল অরবিন্দ মজুমদারের কাছে! অবশ্য তখন সে জানত না এতদিন লোকে ‘সারথির সারথি’ বলে বিস্ময়ে, সম্ভ্রমে, আদরে তাকে উল্লেখ করবে।
”নাণ্টু দই এনেছে, একটু খেয়ে যাও।”
”এক চামচও নয়, একদম উপোস। আমি এখন যাই।” ঘড়ি দেখল গৌরী। ”আমার পৌঁছবার টাইম হয়ে গেছে। বাড়িঅলা অপেক্ষায় থাকবে। অ্যাপয়েণ্টমেণ্ট ফেল করলে প্রথমেই একটা ব্যাড ইম্প্রেশন হবে। চলি।”
জ্যোতি পিছু ডেকে বলল, ”তোমাকে পাব কোথায় তাহলে?”
”আমাকে পেতে হবে না, বিখ্যাত লোক তো, আমিই তোমাকে খুঁজে নেব! গরজ তো এখন আমার। তুমি নিশ্চয় এখন একটা ঘুম দেবে, তারপর সিনেমা।”
”এক্স্যাকটলি। এর মধ্যে দাশুদা এসে পড়লে তো ভালই।”
।।চার।।
বিপিন স্যার ডাকছেন। জ্যোতি অবাক হয়ে গেছল বেয়ারা কাশিদা যখন টিফিনে খবরটা দেয়।
টিচার্স রুমের জানলার কাছে বসেছিলেন বিপিন স্যার।
”জ্যোতি, হাবড়ায় পরশু স্কুলের খেলা মাধবপুরের সঙ্গে, খেলতে পারবি?”
”স্যার!…” জ্যোতির মুখ থেকে আর কোন শব্দ বেরোয়নি।
”তোর বয়সটা খুবই কম, অভিজ্ঞতাও নেই। আপত্তি উঠবেই। তাহলেও আমি তোকে টিমে রাখব। অন্য ছেলেরা কম করেও তোর থেকে তিন—চার বছরের বড়। ঘাবড়ে যাবি না তো?”
”না স্যার।” জ্যোতি ঢোঁক গিলতে গিলতে বলে।
”তরুণ কাল জ্বরে পড়েছে। একটু আগে ওর কাকা খবর দিয়ে গেল একশো তিন জ্বর উঠেছে। ওর জায়গায় ফরোয়ার্ডে তোকে খেলতে হবে। রিজার্ভে অবশ্য পলাশ আর বঙ্কু আছে, কিন্তু…যদি না পারবি তো বলে দে, তাহলে পলাশকে নামাব।”
”না না স্যার পারব।”
বোঁ বোঁ ঘোরা মাথা নিয়ে জ্যোতি ক্লাসে ফিরেছিল। স্কুল টিমে চান্স পাওয়ার কথা সে এখনো ভাবতে পারে না। দিল্লিতে সুব্রত কাপ খেলার জন্য অঘোরচন্দ্র বিদ্যাসদন গত পাঁচ বছর চেষ্টা করে ব্যর্থ। বাংলার আঞ্চলিক প্রতিযোগিতাতেই উঠতে পারেনি। বিপিন স্যার গোঁ ধরে রয়েছেন স্কুলকে দিল্লিতে নিয়ে যাবেনই। ঘুরে ঘুরে ফুটবল খেলা দেখে বেড়ান। ভাল প্লেয়ার বুঝলে ধরে—বেঁধে স্কুলে এনে ভর্তি করান। তাদের অধিকাংশই স্কুলে ক্লাসে আসে না। কোথায় যে তাদের বাড়ি তাও জ্যোতি জানে না। অনেককেই প্রতিদিন দাড়ি গোঁফ কামাতে হয়। অথচ সতেরো বছরের বেশি বয়সীদের খেলার নিয়ম নেই।
”রাখ তোর এজ—লিমিট। কটা স্কুল মানছে এসব নিয়ম? দ্যাখ গিয়ে দু ছেলের বাপও সুব্রত কাপের ফাইনালে খেলছে।” কথাটা বলেছিল তরুণই। ওর বয়স কমপক্ষে একুশ।
তরুণ মাঝে মাঝে ক্লাস করে। এজন্য কোন শিক্ষক কিছু বলেন না। প্রতি বছর ক্লাস পরীক্ষায় পাস হয়ে গেছে। মাধ্যমিক পরীক্ষায় তিন বছর ফেল করেছে। জ্যোতি ওকে সকালে মেয়ে স্কুলের সামনে সঙ্গীদের আড্ডা দিতে দেখেছে। ঊষা বলেছিল, গায়ে পড়ে তার সঙ্গে তরুণ কথা বলার চেষ্টা করে। অবশ্য সে পাত্তা দেয়নি।
একদিন তরুণ তাকে বলেছিল, ‘এই জ্যোতি, তোর সঙ্গে ঊষার অত ভাব কেন রে? রোজই কথা বলিস, লাইন করেছিস?” ”আমার পাড়ার মেয়ে” জ্যোতি সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়ে সরে যায়।
হাবড়ায় তিনটি লীগ ম্যাচ। সেখান থেকে উঠতে পারলে আন্তঃ অঞ্চল প্রতিযোগিতায় খেলতে হবে। কোথায় যে সেটা হবে জ্যোতি জানে না। গত বছর শিলিগুড়িতে হয়েছিল। কিন্তু আন্তঃ অঞ্চল নয়, জ্যোতির মাথায় এখন পরশুর খেলা ঘুরপাক খাচ্ছে। রাত্রে সে অন্ধকারে জগামালির মাঠে টানা আধ ঘণ্টা চক্কর দিয়ে দৌড়ল, না জিরিয়ে। নিজের ফুটবল নেই। বিপিন স্যারের বাড়িতে স্কুলের জার্সি, ফুটবল ইত্যাদি থাকে। সকালে সে বল চাইতে গেল। বিপিন স্যার দিলেন না। ”নিজেকে টায়ার্ড করিসনি। বিশ্রাম নে। আজ আর স্কুলে যেতে হবে না।”
