”কি হচ্ছে কি?” মাথা মোছা থামিয়ে গৌরী কৃত্রিম ধমক দিল।
”তোমারও মেজাজ খারাপ হয়েছে। তোতনের জন্য?”
”স্বাভাবিকই।”
গৌরী স্নানঘরে ঢুকল। জ্যোতি দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
”একমাত্র ছেলের প্রাণ যখন বিপন্ন হয় তখন কোন মা মেজাজ ঠিক রাখতে পারে?”
জ্যোতির উপস্থিতি অগ্রাহ্য করে গৌরী শাড়ি খুলে আলনায় রাখল। সায়া খোলার সময় মুখ তুলে একবার তাকিয়ে নিয়ে বলল, ”লজ্জা পাচ্ছ?”
”না না লজ্জা পাব কেন, টেণ্টে ড্রেসিংরুমে তো উদোম হয়ে থাকিই।”
”সেখানে মেয়েরা তো থাকে না।”
গৌরী শাওয়ার খুলে, চুল বাঁচাতে মাথাটা সামনে ঝুঁকিয়ে দাঁড়াল। জ্যোতির চাহনিতে তারিফ ফুটে উঠল। বছর পাঁচেক আগেও যে শরীর দেখেছে আজও তা অটুট রয়েছে। খাওয়ার এবং ব্যায়ামের ব্যাপারে গৌরী কঠোর নিয়ম মেনে চলে। ”বল আমার ফিগারটা কেমন?” প্রথমবার যখন গৌরী নগ্ন হয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্নটা করেছিল জ্যোতি তখন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকেছিল। সে ভাবতেও পারেনি এত স্বচ্ছন্দে কোন মেয়ে একের পর এক বস্ত্র শরীর থেকে খুলে ফেলতে পারে প্রায় অপরিচিত কোন পুরুষের সামনে, তাও ঘরে আলো জ্বলছে!
”মুখে কথা নেই কেন? শুনেছি তুমি ফুটবলকে দিয়ে নাকি কথা বলাও!”
”দাশুদা বলেছে?”
”তাছাড়া আর কে?”
”দাশুদা তোমায় ফিট করেছে আমাকে পুরুষ মানুষ করে তুলতে?”
”তুমি তো পুরুষই, করে আবার তুলব কি?”
গৌরী এগিয়ে এসে তার বুকে হাত রেখে বলে, ”দাশুদা বললেই সব কাজ আমি করব, এমন কোন কথা আছে কি? আমারও তো ইচ্ছা অনিচ্ছার, ভাল লাগার ব্যাপার আছে।”
”এজন্য দাশুদা তোমাকে টাকা দেবে?”
”কতটা বীয়ার খেয়েছ?”
”আড়াই বোতল—বললে না তো দাশুদা টাকা দেবে কি না?”
দু হাতে গলা জড়িয়ে, মুখের কাছে মুখ এনে বলেছিল, ”না। দিলেও নেব না। একেবারে ভলাণ্টারি সার্ভিস।” তারপর ধাক্কা দিয়ে বলেছিল, ”তুমি তো বললে না আমার ফিগার কেমন লাগল?”
গলা শুকিয়ে আসছিল। ঢোঁক গিলে জ্যোতি শুধু বলেছিল ‘ভাল।’
”শুধুই ভাল, হাত দাও গায়ে, যেখানে খুশি।”
জ্যোতি হাত রেখেছিল কাঁধে। আঙুলগুলো তখন কাঁপছিল। চোখে চোখ রাখতে গিয়েও পারছিল না। গৌরীর মুখ টিপে হাসিটার অর্থ বুঝতে অসুবিধা হচ্ছিল না: বাচ্চচা, নাবালক, অপদার্থ।
কোমরের বেল্ট ধরে গৌরী বলেছিল, ”এগুলো এবারে হঠাও।”
”না।” আর্তনাদ করে উঠেছিল জ্যোতি। ”আলো জ্বলছে!”
হাসতে হাসতে গৌরী কুঁজো হয়ে যায়। ”এই যে বললে ড্রেসিংরুমে—”
জ্যোতি ছুটে গিয়ে সুইচ টিপে ঘর অন্ধকার করে দিয়েছিল। তারপর অত্যন্ত দ্রুত ব্যাপারটা ঘটে যায়। একটা নব্বুই মিনিটের হাড্ডাহাড্ডি ম্যাচের পর মাথা যেরকম ঘোরের মধ্যে থাকে, বুকের মধ্যে কলজেটা দপদপায়, চোখে ঝাপসা লাগে, অনুভব ক্ষমতা কমে যায় প্রায় সেই রকমই তার মনে হয়েছিল। স্বপ্নের মত অনেক দূরের ব্যাপার যেন, যত চেষ্টা করে কাছে যেতে ততই সুদূরের মনে হয়েছিল। মহাশূন্যে যেন ভেসে যাচ্ছিল গৌরীর দেহটাকে আঁকড়ে ধরে। অস্পষ্ট গোঙানি, মর্মর ধ্বনির মত হালকা কথা, ভারী নিঃশ্বাস পাচ্ছিল গৌরীর কাছ থেকে। অবশেষে একটা তরঙ্গ তার সারা শরীর বেয়ে নেমে তাকে নির্জীব অসহায় অবস্থায় পৌঁছে দেয়।
যখন গভীর নিঃশ্বাস নিতে সে অকাতরে ঘুমের জন্য প্রার্থনা করছিল সেই সময় গৌরী বলেছিল, ”আমিই কি প্রথম?” সঙ্গে সঙ্গে তার শরীরের সব কটা পেশী শক্ত হয়ে উঠেছিল। একথা বলল কেন? ও কি টের পেয়ে গেছে? গৌরীর এ ব্যাপারে প্রচুর অভিজ্ঞতা আছে। হয়তো তার শরীর থেকে কিছু বুঝে নিয়েছে। তখন চোখে ভেসে উঠেছিল উষার মুখ। গৌরীকে সে বলতে যাচ্ছিল, না তুমি দ্বিতীয়। বলতে পারেনি, আজ পর্যন্ত কাউকেই বলতে পারেনি শুধু বিপিন স্যারকে ছাড়া।
শাওয়ার বন্ধ করে ভিজে শরীরেই গৌরী সায়াটা পরতে যাচ্ছিল। জ্যোতি বলল, ”দাঁড়াও, বেড কভারটা দিয়ে গা মুছিয়ে দি।”
ছুটে গিয়ে বেডকভারটা এনে সে গৌরীকে প্রায় মুড়ে জল শুষে নেবার জন্য পা থেকে গলা পর্যন্ত চেপে দিল।
”তুমি এখন কোথায় যাবে?” জ্যোতি বলল।
”পার্ক সার্কাসে যাব, ঘর দেখতে।” গৌরী চিরুনি দিয়ে চুল ঠিক করছিল। আয়না সামনে।
”ঘর? কার জন্য?”
”আমার জন্য। ফ্ল্যাটের এত ভাড়া আর আমি টানতে পারব না। এখন আমাকে ধার শোধের কথা ভাবতে হবে। তোতনের জন্য বছর বছর খরচের টাকাটা একরকম ভাবে এত কাল ম্যানেজ করেছি কিন্তু এই অসুখটার ধাক্কা—”
কাতর, অসহায় চোখে গৌরী তাকিয়ে আছে। ওর কঠিন, স্বচ্ছন্দ, বাস্তববোধ গলে গলে ধুয়ে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে দিশেহারা একটি কোমল অন্তঃকরণ।
”খুবই কি ভয় পাওয়ার মত অসুখ?”
”ডাক্তার তো বলছেন, এ সব অপারেশন এখন আকছারই হচ্ছে। তবে খরচ খুব।”
”টাকার জন্য কারুর কাছে তুমি চেও না, আমি দেব।”
গৌরীর অবাক এবং বিভ্রান্ত চোখ জ্যোতিকে খুশি করল। তারপরই অনুযোগের স্বরে সে বলল, ”তোমার তো আমাকেই প্রথম বলা উচিত ছিল। হঠাৎ আজ দেখা হল তাই, নইলে আমি তো জানতেই পারতাম না!”
”কাউকে আমি জানাতে চাই না। তোতন আমার নিজস্ব, আমার সব কিছুই ওর জন্যই, শুধু ওর জন্যই। আমি আবার বিয়ে করতে পারতাম, দুটি লোক চেয়েছিল, কিন্তু করিনি। মনে হয়েছিল খুব নির্ভরযোগ্য নয়, তাছাড়া তোতনও সেটা মেনে নিতে পারবে না।”
