”অদ্ভুত তো!”
”কিসের অদ্ভুত? আমার এমন মনে হওয়াটা?”
গৌরী নিস্পৃহ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল জানলার দিকে। জ্যোতি তাকিয়ে আছে গৌরীর মুখে। বয়স হঠাৎ যেন আঁচড়িয়ে দিল মুখটায়। হালকা সুর্মার নীচে কালি পড়েছে, গালের মাংস ঝুলে গেছে, ভাঁজ পড়েছে ঠোঁটের দুধারে।
”মাঠের ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না, কিন্তু জীবনে কিছু অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে। অনেক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গেছি, যা তুমি হয়তো যাওনি।”
”তুমি কতটা জান আমার সম্পর্কে?”
”কিছুই না।”
”তাহলে একথা বললে কী করে?”
”মনে হল। একটা অবিবাহিত ছেলে বছরে লাখটাকা কামাচ্ছে, দায়দায়িত্ব বলে কিছু নেই, মানছি তারও যন্ত্রণা থাকতে পারে, কিন্তু সেটা আমার সমান নয়, হতে পারে না। আমাকে এই জীবনে আসতে হল কেন? সেটা বোঝার ক্ষমতা তোমার আছে কি? তুমি যদি মেয়ে হতে আর কোন পুরুষ যদি বিশ্বাসঘাতকতা করত…”
”থাক থাক, আর বলতে হবে না।” জ্যোতি রুক্ষস্বরে বলে উঠল গৌরীকে থামিয়ে দিয়ে। ভ্রূ—কুঁচকে গৌরীকে তাকিয়ে থাকতে দেখে সে মুখটা ঘুরিয়ে উঠে দাঁড়াল। নিজের গলার স্বর নিজের কানেই তার খারাপ লেগেছে।
”চান করতে হবে।” অপ্রতিভ বোধটা কাটিয়ে ওঠার জন্য খাপছাড়া ভাবে কথাটা বলে সে ঘরের লাগোয়া স্নানের ঘরের দরজা খুলে ভিতরে তাকিয়ে, দরজা বন্ধ করল।
”আশ্চর্য, তোয়ালেটাও রাখেনি।”
জামাটা খুলে খাটের উপর ছুঁড়ে দিয়ে জ্যোতি স্নানের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। গৌরীর কথাটা এখনো ঝিমঝিম করছে তার মাথায়।
‘তুমি যদি মেয়ে হতে আর কোন পুরুষ যদি বিশ্বাসঘাতকতা করত…কোন পুরুষ যদি বিশ্বাসঘাতকতা করত…বিশ্বাসঘাতকতা…করত…’
অনেক দিন আগে, অনেক দিন আগে, উষা…এই নামে একটা মেয়ে, ছোটবেলা থেকে জ্যোতি তাকে চেনে। পুকুরপাড়ের সরু পথটা দিয়ে রাস্তায় পড়লেই উষাদের একতলা বাড়ি। ওর বাবা সুবিনয় ভট্টাচার্য রেশনের দোকানে চাকরি করতেন আর বাকি সময় ব্যস্ত থাকতেন পুরোহিতের কাজে। ওর চার বছর বয়সে মা নিরুদ্দেশ হয়। দূর সম্পর্কের এক বৃদ্ধা পিসিকে ওর বাবা এনে রাখেন। বছর দশেক পর পিসি মারা যান। তারপর থেকে বাড়িতে শুধু বাবা আর মেয়ে।
উষা তার থেকে এক বছরের ছোট। সকালের স্কুলে পড়ত। সে যখন স্কুল থেকে ফিরত জ্যোতি তখন স্কুলের দিকে যাচ্ছে। পথে দেখা হত, দু—চারটে কথা হত আর চিঠি বিনিময়।
তারপর জ্যোতি কলকাতায় প্রথম ডিভিশনে ফুটবল খেলতে গেল। প্রথম বছরেই তার গোলে মহমেডান স্পোর্টিং হারল, ইস্টবেঙ্গল আর সারথি সংঘের সঙ্গে ড্র হল। সেই বছরই অরবিন্দ মজুমদার সারথির কোচ হয়ে এসেছেন। খেলার পর তাঁবুতে নিজের ঘরে জ্যোতিকে ডেকে আনিয়ে কোন ভণিতা না করেই বলেছিলেন, ”সামনের বছর সারথিতে এস। তোমার গোলটা নিশ্চয় দারুণ হয়েছে কিন্তু অনেক ত্রুটি আছে তোমার খেলায়, মাজাঘষা দরকার। ভাল প্লেয়ার পাশে না পেলে তুমি ডেভেলাপ করতে পারবে না। ছোট টিমে খেলে সময় নষ্ট করে লাভ নেই। আসবে আমার ক্লাবে?”
”মাত্র এই বছরই গড়ের মাঠে খেলছি।” জ্যোতি বলেছিল, ”এখনো কিছুই জানি না, বুঝি না। বড় ক্লাবে গিয়ে অনেককেই তো সাইড লাইনের ধারে সারা সিজন বসে থাকতে দেখেছি। আমি বসে থেকে পচে যেতে চাই না।”
”আমি যখন তোমাকে যেচে ডেকে আনছি তখন এটা নিশ্চয় বুঝতে পারছ বসিয়ে রাখার জন্য ডাকছি না। আমার কলেজেরই সহপাঠী তোমরা স্কুলের টিচার বিপিন গোস্বামী আমাকে মাসখানেক আগে চিঠি দিয়ে তোমার কথা বলেছিল। তোমার চারটে ম্যাচ আমি তারপর দেখেছি। এর মধ্যে যদি মোহনবাগান বা ইষ্টবেঙ্গল তোমার সঙ্গে কনট্যাক্ট করে না থাকে, নিশ্চয়ই করেনি, তাহলে আমি তোমাকে অফার দিচ্ছি।”
জ্যোতি হ্যাঁ বা না কিছুই বলেনি। শুধু বলেছিল, ভেবে দেখব। বিপিন স্যার যে চিঠি দিয়েছেন একথা উনি ঘুণাক্ষরেও তাকে বলেননি। তবে অরবিন্দ মজুমদার যে তার সঙ্গে কলেজে পড়তেন কয়েকবার সেটা বলেছিলেন। মনে মনে সে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিল প্রকৃতপক্ষে তার প্রথম আবিষ্কর্তাকে। বিপিনস্যার তার ফুটবল কোচ, তার প্রথম প্রকৃত বন্ধু। তাকে পরামর্শ দিয়ে চালনা করেছেন যখন সে বাস্তব জগৎ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অসহায় বোধ করেছে। বিপদের সময়ও পাশে দাঁড়িয়ে অভয় দিয়েছেন। আর সেই বিপদও সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ভাবে একদিন এসেছিল যেদিন উষা জানলা থেকে ডেকে তাকে দাঁড় করিয়ে আতঙ্কিত মুখে তাকে কথাটা জানাল। তারপর কাতরস্বরে বলেছিল, ”জ্যোতি আমাকে বিট্রে করো না।”
স্নানঘরের দরজায় খটখট শব্দটা অনেকবার হয়েছে। শাওয়ারের নীচে চোখ বুঁজে দাঁড়িয়ে জ্যোতি সাত বছর পিছিয়ে স্মৃতির মধ্যে ডুবে থাকায় শুনতে পায়নি, অবশেষে খুব জোরে ধাক্কা পড়তে তার হুঁশ ফেরে।
”কে?”
”আমি। তাড়াতাড়ি কর, আমাকেও চান করতে হবে।”
তোয়ালে নেই ভেজা গায়েই প্যাণ্ট পরে সে বেরিয়ে এল। মাথার চুল থেকে জল ঝরছে।
”দেখি, মাথাটা নিচু কর।”
বাধ্য ছেলের মতো জ্যোতি মাথা নামাল। গৌরী আঁচল দিয়ে মাথাটা মুছিয়ে দিতে দিতে বলল, ”হঠাৎ মেজাজটা বদলে গেল যে? তোমার অরবিন্দদার জন্য?”
জ্যোতি ভাল সেণ্টের ফিকে গন্ধ পেল গৌরীর শরীর থেকে। স্নান করবে বলে ব্লাউজটা খুলেছে। পাতলা শাড়ির আড়ালে স্তনের নড়াচড়ার আভাস পাচ্ছে। জ্যোতি তার ঠোঁট চেপে ধরল স্তনাগ্রে এবং হাঁ করে কিছু কিছুটা মুখে পুরে হালকাভাবে দাঁত বসাল।
