”আমার বয়স কত জানো?”
”কত জায়গায় তোমার জীবনী বেরিয়েছে।”
”তুমি সে সব পড়েছ? ফুটবলে তোমার ইণ্টারেস্ট আছে বলে তো জানা ছিল না।”
”আজও নেই। খেলা—টেলার কোনও খবরই রাখি না।”
”তাহলে পড়লে কেন?”
”দাশুদা একবার একটা ম্যাগাজিন পড়তে দিয়েছিল।”
”কবে, কতদিন আগে?”
”অনেক দিন আগে, তখনো আলাপসালাপ হয়নি। দাশুদা বলল, এই খোকাটাকে পুরুষমানুষ বানিয়ে দে তো।”
”বানাতে পেরেছ?”
চোখ বোজা গৌরীর ঠোঁটদুটোয় স্মিত হাসি ছাড়িয়ে পড়ল।
”মনে তো হচ্ছে পারিনি।”
জ্যোতি মুখটা নামিয়ে গৌরীর দুই স্তনের মাঝে চেপে ধরল। আলতো করে ডান হাতটা গৌরী ওর মাথায় রাখল। চুলের মধ্যে আঙুলগুলো চিরুনির মতো চালাতে চালাতে বলল, ”বড্ড টায়ার্ড লাগছে।”
”রাতে কোথাও ছিলে?”
”হ্যাঁ, গ্র্যাণ্ডে। দিল্লী থেকে একজন বড় অফিসার এসেছে। তার সুইটেই ওরা পার্টি দিয়েছিল।”
”তাহলে ঘুমোও এখন।”
জ্যোতি মুখ তুলতে যাচ্ছিল। গৌরী চেপে ধরে রইল।
”থাকো। ভাল লাগছে।”
জ্যোতি আর একটু সরে এসে মুখটা পাশ ফিরিয়ে দু হাতে গৌরীকে জড়িয়ে ধরল। গৌরী ওর চুলে বিলি কেটে যেতে লাগল।
”কাল ভেলোর যাব।”
”ভেলোর! কেন? ওখানে তো লোকে অপারেশন করাতে যায়।”
”তোতনের হার্টের অবস্থা বিপজ্জনক।”
”তার মানে?”
জ্যোতি মুখ তুলল। গৌরী সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে। চোখে ভেসে রয়েছে চাপা যন্ত্রণা।
”জন্ম থেকেই ওর হার্টে ত্রুটি রয়েছে। একটা ভালভ কাজ করে না। আমায় প্রায়ই বলত, খেলতে গেলে হাঁপিয়ে পড়ে। তখন গ্রাহ্য করতাম না। এবার ও যখন এসেছিল স্পেশ্যালিস্ট দেখাই আর তখনই জানা গেল, ডাক্তার মোদকই বললেন ভেলোরে গিয়ে ঠিক করিয়ে নিতে। তিনিই চিঠিপত্র লিখে যা করার করেছেন। আমি কাল তোতনকে নিয়ে যাব।”
”এত ব্যাপার হয়ে গেছে, কই কিছু তো বলনি?”
গৌরী হাসল, জ্যোতি উঠে বসল।
”আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার এসব। সবাইকে বলে বেড়াব কেন?”
জ্যোতি কখনো কৌতূহল দেখায়নি গৌরীর নিজস্ব ব্যাপারে। দাশুদাই বারণ করে দিয়েছিল, ‘প্রত্যেক মানুষেরই নিজস্ব কিছু গোপনীয়তা থাকে। সেগুলো লোকে জানুক এটা সবাই চায় না। গৌরী খুব চাপা মেয়ে।”
দাশুদার কাছ থেকে সে শুধু জেনেছিল, গৌরী তার একমাত্র ছেলেকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি থেকে চলে যায়, তার পর ডিভোর্স করে। ছেলেকে কালিংপঙে একটা স্কুলে পড়াচ্ছে। এখন বয়েস বছর দশেক। তোতনকে জ্যোতি কখনো দেখেনি। একবার গৌরী তার অটোগ্রাফ করা ছবি চেয়ে নিয়ে ছেলেকে পাঠিয়েছিল। ‘তোতনকে লিখেছিলাম, জ্যোতি বিশ্বাসের সঙ্গে আলাপ হয়েছে। ও তো বিশ্বাসই করতে চায় না। লিখেছে, ওর সই করা ছবি পাঠাও। ও যে তোমার ফ্যান আমি জানতামই না। একটা ছবি সই করে দিও তো।’
জ্যোতি দিয়েছিল এবং ব্যাপারটা ভুলে গেছল।
”কি রকম খরচ পড়বে?”
”তা ভালই পড়বে। যা জমাতে পেরেছি সবই যাবে। আরও হাজার দশেক যোগাড় করতে হবে।”
”তোমার সঙ্গে অনেক টাকাওলা লোকের চেনা আছে।”
”তা আছে। কিন্তু দশ হাজার কেউ দেবে না।”
”দাশুদা?”
”সে জন্যই তো এসেছি। নাণ্টুর কাছে শুনলাম কাল রাতে এসেই আবার চলে গেছে।”
জ্যোতির মনে পড়ে গেল তার নিজের এখানে আসার উদ্দেশ্যটা।
”তুমি আজকের কাগজ পড়েছ?”
নাহ, পড়ার সময় পেলাম কই। কেন কি হয়েছে?”
জ্যোতি কাগজের খোঁজে ঘর থেকে বেরিয়ে দেখল নাণ্টু সোফায় বসে একটা বাংলা কমিকস মন দিয়ে দেখছে। তাকে দেখে সে মুখ তুলে তাকাল।
”কোথায় ছিলিস এতক্ষণ? দরজা খুলে রেখে বেরিয়েছিলি!”
”ওপরের ফ্ল্যাটে গেছলুম, বইটা আনতে।”
”রান্না করেছিস?”
”গৌরীদি বলল খাবে না শরীর খারাপ। শুধু আমার জন্য রেঁধেছি।”
”আজকের কাগজটা কোথায়?” এই বলে জ্যোতি নিজেই টেবলের নীচের র্যাক থেকে দু—তিনটি কাগজের মধ্যে প্রভাত সংবাদটা তুলে নিল। ”আমার জন্য আড়াইশো দই নিয়ে আয়, ভাত দিয়ে খাব।”
পাঁচ টাকার নোট নাণ্টুকে দিয়ে সে ঘরে এল। গৌরী মুখ ফিরিয়ে শুয়ে।
”এই খবরটা আগে পড়।”
গৌরীর মুখের দিকে জ্যোতি তাকিয়ে রইল। যতক্ষণ ধরে সে খবরটা পড়ল। বিশেষ কোন ভাবান্তর হতে দেখল না। তার মনে হল, সারথি বা তার ফুটবল কোচ সম্পর্কে কোন পরিচয় বা আগ্রহ না থাকায় গৌরীর কাছে এই ধরনের খবরের কোন তাৎপর্য নেই।
”অরবিন্দ মজুমদারের বাড়ি থেকে এখানে আসছি। ওখানে শুনলাম অরবিন্দদা আর তার পঙ্গু বৌকে কেউ একজন ভোরে এসে গাড়িতে করে নিয়ে গেছেন দেশের বাড়িতে। ওই একজনটি দাশুদা।”
”কেন?”
”বৌদি এখনো বোধহয় জানে না। জানার আগেই সরিয়ে নিয়ে গেল।”
”তোমার অরবিন্দদাকেও এবার ক্লাব থেকে সরিয়ে ফেলা সহজ হয়ে যাবে।”
”এরকম বললে কেন?” জ্যোতি চমকে উঠে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
”এমনিই মনে হল তাই বললাম। তুমি এসব জায়গায় যাওটাও না তো?”
”কোনদিনই না।”
”সাবধান। তাহলে কিন্তু হঠাৎ পুলিশ রেড করে ধরে নিয়ে গেলে কাগজে এইরকম বড় বড় করে হেডিং বেরোবে, আর কেরিয়ার খতম হয়ে যাবে।”
”কিন্তু তুমি একথা বললে কেন, অরবিন্দদাকে এবার ক্লাব থেকে সরিয়ে ফেলা সহজ হয়ে যাবে? এ সম্পর্কে জান কিছু?”
”একবার, মাস চারেক আগে, দাশুদা গল্প করতে করতে ওর এক ক্লায়েণ্টকে বলেছিল, আমিতো ক্লাবটলাব অত বুঝি না তাই কানও দিইনি, তবে কথাটা কানে গেছল, ‘অরবিন্দ মজুমদার ফিনিশ হয়ে গেছে, সারথি আর কিছু ওর কাছ থেকে পাবে না, একটা ট্রফিও এবছর আনতে পারল না’ তারপর হঠাৎ এই খবরটা পড়ে কি রকম যেন মনে হল তাই বলে ফেললাম।”
