”দাদা আর বৌদি তো ভোরবেলাতেই চলে গেছে।”
”চলে গেছে? কোথায়?”
”দেশের বাড়িতে।”
অরবিন্দদার দেশ তারকেশ্বরের দিকে রাজপুর নামে এক গ্রামে, কিন্তু ভোরবেলায় পক্ষাঘাতে পঙ্গু বৌদিকে নিয়ে গেল কি করে?
”সঙ্গে আর কেউ ছিল?”
”এক বাবু এসেছিলেন গাড়ি নিয়ে।”
”কি রকম দেখতে?”
”রোগা, লম্বা, খুব ফর্সা, চোখে সোনার চশমা…”
”ধুতি—পাঞ্জাবি পরা, সামনে চুল ওঠা?”
”হ্যাঁ হ্যাঁ।”
”খয়েরি রঙের মোটর?”
”হ্যাঁ।”
”কিছু বলে গেছে, কখন আসবে?”
”কিছু তো বলেনি। দাদা শুধু বলল, দেশে হঠাৎই খুব জরুরী কাজ পড়ে গেছে, বৌদিকে নিয়ে যেতেই হবে। পরে একসময় এসে কাপড় চোপড় নিয়ে যাবে আর আমাকেও যেতে হবে।”
দরজার ফাঁক দিয়ে জ্যোতি ভিতরে তাকিয়ে দালানে খাবার টেবলের উপর একটা খবরের কাগজ দেখতে পেল। এখনো খোলা হয়নি।
”কাগজটা কখন এল?”
”এই তো একটু আগে দাদারা চলে যাবার পর। বড্ড বেলায় এখানে কাগজ দেয়।”
”যে লোকটা এসেছিল সে কি কাগজ হাতে এসেছিল?”
”হ্যাঁ। দাদা তার কাছ থেকেই কাগজ নিয়ে পড়ল!”
”তারপর বলল দেশে চলে যাবে?”
”হ্যাঁ।”
”বৌদি কি বলল?”
”কি আর বলবে, যে মানুষ শুয়েই থাকে সারাদিন তার আবার বলাবলি কি? আমাকে বৌদি শুধু বলল, দাদার খুব বিপদ হবে কলকাতায় থাকলে, খারাপ লোকেরা দাদার পেছনে লেগেছে, প্রাণে মারারও চেষ্টা করছে তাই কেউ জানার আগেই চলে যাচ্ছে।”
”কবে আসবে কিছু তো বলেনি, তোমাকে বাজার—টাজার করার টাকা দিয়ে গেছে?”
”একশো টাকা দিয়েছে।”
জ্যোতি নীচে নেমে এল। সেই সময় একতলার ফ্ল্যাট থেকে এক মহিলা বাচ্চচার হাত ধরে বেরোলেন। স্কুলে পৌঁছে দিতে যাচ্ছেন মনে হল। চাহনি থেকে জ্যোতির আরো মনে হল, খবরটা ইতিমধ্যে পড়ে ফেলেছেন। ইনি একবার তার সই নিয়েছিলেন ভাইয়ের জন্য। দেখা হলে বিগলিত হাসি হাসেন।
”ওরা তো ভোরবেলায়ই চলে গেছেন।”
গম্ভীর মুখে জ্যোতি শুধু মাথা নাড়ল।
”ভালোই করেছেন,” গলাটা আরো নামিয়ে, ”এরপর এখানে না থাকাই উচিত।”
জ্যোতি তার বুলেটকে দু হাতে ধরে স্টার্ট দিতে যাচ্ছে, মহিলা তখন পাশ দিয়ে এগিয়ে যেতে গিয়েও থমকে দাঁড়িয়ে বললেন, ”ওর স্ত্রী কী ভীষণ মানসিক আঘাত পেলেন বলুন তো? এই শক কাটিয়ে ওঠা—”
জ্যোতি এঞ্জিনটাকে তখন এত জোরে তিন—চারবার রেস করাল যে সেই গর্জনে মহিলার স্বর ডুবে গেল। বুলেট ছিটকে বেরিয়ে গেল মহিলাটির গা ঘেঁষে। জ্যোতি একবারও আর পিছনে তাকায়নি।
তাহলে দাশুদা সকালে এসেছিল। এখন রাজপুরে তার যাওয়ার কোন মানে হয় না। জ্যোতি ধরেই নিল, দাশুদা ওদের সঙ্গে যাবে না। যাতায়াতে প্রায় আশি—নব্বুই মাইল। কাজের লোক, সময় অপচয় করতে চাইবে না। তাছাড়া সঙ্গে থেকেই বা কি করবে! গাড়িটা দিয়েছে ওদের পৌঁছে দিয়ে আসার জন্য। সারথির কোচকে অসম্ভ্রমের হাত থেকে বাঁচাতে, কিংবা সারথিরই মান বাঁচাতে দাশুদা ছুটে আসবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এরপর? অরবিন্দদা কি আর মাঠে আসবেন?
জ্যোতি প্রথমে ভাবল বাড়ি ফিরে যাবে। উল্টাডাঙ্গার মোড়ে পৌঁছে সে মন বদলাল। এখন একবার দাশুদার ফ্ল্যাটে গিয়ে বরং দেখা যাক। হয়তো রাজপুরে নিয়ে গেছেন রটিয়ে দিয়ে আসলে ওখানে নিয়ে গিয়ে ওদের তুলেছে। দাশুদার সরল হাবভাবের আড়ালে চমৎকার একটি কুটিল মন যে লুকিয়ে রাখে, এটা সে এতদিনে জেনে গেছে।
বাড়ির নীচে, সিমেণ্ট বাঁধানো গাড়ি রাখার চত্বর। জ্যোতি তার বুলেট সেখানে রেখে, দারোয়ানকে জিজ্ঞাসা করে জানল দাশুদাকে সে কাল রাতে গাড়িতে বেরিয়ে যেতে দেখেছে। ফিরলে গাড়িটা তো এখানেই থাকত।
ফ্ল্যাটের কলিংবেল সুইচে আঙুল দিতে গিয়ে তার চোখে পড়ল, দরজাটা অল্প ফাঁক হয়ে রয়েছে। কেউ ঢুকেছে অথবা বেরিয়েছে। বেরোলে নাণ্টুই।
পা টিপে সে ভিতরে ঢুকল। বসার ও খাওয়ার জন্য লম্বা দালানটা ফাঁকা, তার দুদিকে তিনটি ঘর। জ্যোতি এসে যে ঘরটায় থাকে সেটার দরজা আধ ভেজান। বাকি দুটি দাশুদার খাস ঘর। বন্ধ রয়েছে। রাতে বেরিয়ে দাশুদা আর তাহলে ফেরেনি।
সন্তর্পণে দরজার পাল্লাটা ঠেলে ঘরের ভিতরে তাকিয়েই জ্যোতি চমকে উঠল। তার পক্ষে এটা কল্পনাতেও অসম্ভব। খাটে উপুড় হয়ে একটা বালিশ বুকে জড়িয়ে ঘুমোচ্ছে এবং চুল, পিঠ, নিতম্ব নির্ভুলভাবে গৌরীকে চিনিয়ে দিচ্ছে। এই দেহটিকে সে চেনে।
এই সকালে! তার ঘরে! ব্যাপার কি!
জ্যোতি নিথর দাঁড়িয়ে রইল মিনিট দুয়েক, চাহনির মারফৎ তার বিস্ময় এবং হঠাৎ জেগে ওঠা কামনা বুলিয়ে দিল গৌরীকে মাথা থেকে গোড়ালি পর্যন্ত। তারপর নিঃসাড়ে এগিয়ে খাটে বসে ঝুঁকে মুখটা নিয়ে গেল ঘাড়ের কাছে। চুলের কিনার ঘাড়ের শেষ হয়েছে, সেখান থেকে নীচু—গলা ব্লাউজের ফাঁকের মাঝে মসৃণ সাটিনের মত গাত্রত্বক। জ্যোতি জিভ দিয়ে চাটল।
”কে, কে!”
গৌরী ধড়মড়িয়ে উঠে বসল। চোখ থেকে ঘুমের রেশ কাটিয়ে ওঠার জন্য বার কয়েক পিটপিট করে ক্ষীণ হাসল।
বুকের কাপড় খসে পড়েছে। জ্যোতি একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে দেখে সে কাপড়টা কাঁধে তুলে দিল, জ্যোতি কাঁধ থেকে সেটা ফেলে দিয়ে বলল, ”এখন তাহলে ব্রা পরতে হচ্ছে!”
গৌরী আবার শুয়ে পড়ল। চোখ বন্ধ করে ঘুমজড়ানো স্বরে বলল, ”বয়স তো হচ্ছে।”
”কত হল?”
”তোমার বয়সের সঙ্গে চার—পাঁচ যোগ কর।”
