”গৌরীকে দেখেছিস? আজকেই তো ছিল এখানে, লম্বা ছিপছিপে ফর্সাটারে। পছন্দ হয়?”
”কি যে আবোলতাবোল বকছ তখন থেকে।” জ্যোতি উঠে দাঁড়াল। ”ঘুম পাচ্ছে আমার।”
”বোস। বোস বলছি।”
ধমকে উঠল দাশুদা। গ্লাসটায় শেষ চুমুক দিয়ে ঝুঁকে বোতলটা তুলল। চোখের সামনে ধরে কতটা রয়েছে দেখে নিয়ে বলল, ”এটা শেষ করে আমিও ঘুমোব। ততক্ষণ বোস।”
ছোকরা চাকর—তথা—ফ্ল্যাটের কেয়ারটেকার নাণ্টু এসে টেবল থেকে খালি বোতলটা তুলে নিল।
”দুটো কাটলেট আছে, গরম করে দেব?”
”নাহ, বরং জ্যোতিকে দে।”
”এত রাতে কাটলেট, পাগল হয়েছ!”
”নাণ্টু, তাহলে তুইই খেয়ে নে।”
নাণ্টু ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার পর দাশুদা একটু আনমনা হল। একদৃষ্টে দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে কি একটা ভাবতে—ভাবতে বলল, ”নাণ্টুকে রাস্তা থেকে কুড়িয়ে এনেছি যখন ওর বারো বছর বয়স। ফুটপাথেই জন্মেছে, বাপ জিনিসটা যে কি তা জানে না। ওর পাঁচটা ভাইবোন, কে কোথায় ছিটকেছাটকে গেছে জানে না। খুব ফেইথফুল। ও জানে এখানে কি কাজকম্মো হয়, কিন্তু ওর পেট থেকে একটা কথাও কেউ বার করতে পারবে না।”
দাশুদা হাসল। স্বচ্ছ নির্মল হাসি।
”নাণ্টুর মত বারো বছর বয়েসে আমার বাবা মারা যায়। দাদা তখন কলেজে পড়ে। খুব কষ্টে আমরা বড় হয়েছি। তুই কি কখনো কষ্ট পেয়েছিস?”
জ্যোতি ইতঃস্তত করল। অভাবের সংসারে সে জন্মেছে, বড় হয়েছে। তবু একটা পর্যায় রেখে তাদের সংসারটা বাবার চাকরির টাকায় চলেছে। গায়ে জামা, পায়ে চটি বা থালার ভাত বরাবরই পেয়েছে। কিন্তু সবই ছিল দারিদ্র্যের কিনার ঘেঁষে।
”পেয়েছি, কিন্তু বলার মত নয়।”
দাশুদা একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলল। তারপর হাতের গ্লাসটা ঝাঁকিয়ে যেন নিজের অতীতকে খারিজ করে দিয়ে বলল, ”গৌরী মেয়েটা আমার অনেক কাজ উদ্ধার করে দিয়েছে। ওকে মাসে মাসে টাকা দিই, আটশো করে, কাজ না থাকলেও। কাজ করে দিলে আলাদা দু’হাজারও দিয়েছি। দু’ তিনটে ক্লায়েণ্টও জুটিয়ে দিয়েছি। এই ধরনের কাজই। চেহারায়, কথায়, চালচলনে সফিস্টিকেটেড। প্রত্যেকেই হ্যাপি ওর সম্পর্কে। মাস চারেক আগে এক সুগার ফ্যাক্টরির গুজরাটি মালিকের সঙ্গে মহারাষ্ট্রের কতকগুলো জায়গা ঘুরে এল। ভাল টাকাই পেয়েছে। ভাল ঘরেই ওর বিয়ে হয়েছিল। স্বামীটা কোকেনের নেশা করত।…যা এবার ঘুমো গে।”
”তুমি একে পেলে কি করে?”
”পেতে কি হয়, নিজেরাই আসে। যেমন, তুই একদিন নিজেই এসেছিলি অরবিন্দ মজুমদারের কাছে, মনে আছে?”
.
।।তিন।।
জ্যোতির অবশ্যই মনে আছে সেকথা। সারা জীবন সে মনে করে রাখবে। কেন সে মার খাওয়া ভীত কুকুরের মতো শুধুমাত্র লুকিয়ে থাকার একটা জায়গা পাবার আশায় সল্ট লেকে অরবিন্দ মজুমদারের ফ্ল্যাটের কলিংবেল টিপেছিল এবং তারপর জীবনের মোড় দ্রুত ঘুরে গিয়ে কিভাবে একটা সফল জীবনের দিকে তাকে ঠেলে দিয়েছিল, সে কথা কোনদিন সে কাউকে বলেনি কারণ সেগুলো বলার মতো কথা নয়।
শ্যামবাজার মোড় থেকে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রোড ধরে জ্যোতির বুলেট দক্ষিণে এগিয়ে অরবিন্দ সরণিতে বাঁক নিল। পূব দিকে মিনিট তিন—চার গিয়েই উল্টাডাঙ্গা রেলস্টেশন। আরো এগিয়ে তিনটি রাস্তার মোড়। সেখান থেকে বুলেট সল্ট লেক শহরের রাস্তা নিল।
দু’ঘরের ফ্ল্যাট নিয়ে সরকারী আবাসন। দোতলায় অরবিন্দ মজুমদারের ফ্ল্যাট। জ্যোতি প্রথম যখন আসে তখন সবেমাত্র আবাসনটি তৈরি হয়েছে। চারিদিকে ধূ—ধূ মাঠ। প্রাইভেট বাসের টার্মিনাস দশ মিনিট হেঁটে এবং কমপক্ষে আধঘণ্টা অপেক্ষা করে বাস পাওয়া যেত। ফ্ল্যাট কিনেও বহু মালিকই থাকত না। দোকান—বাজার এত দূরে, তাছাড়া নির্জনতা এবং মশার জন্যও থাকা সম্ভব নয়। অনেকেই ফ্ল্যাট ভাড়া দিয়ে দেয়। তখন অরবিন্দ মজুমদার ভাড়া নিয়েছিলেন। বলা বাহুল্য সারথি—সংঘের কোচের জন্য দাশুদাই ফ্ল্যাটটি সংগ্রহ করে দেয়।
কিন্তু তিন—চার বছরের মধ্যেই শ’য়ে শ’য়ে বাড়ি তৈরি শুরু হয়ে যায়। অধিকাংশ দোতলা এবং অনেকগুলিরই বাইরের চেহারা আধুনিক গৃহস্থাপত্যের নিদর্শনরূপে তাকিয়ে থাকার মতো। সরকারী অফিসের সংখ্যা বেড়েছে, লোকজনের বাস বেড়েছে, পরিবহণ বেড়েছে। জ্যোতির প্রথম দেখা সল্ট লেক বা বিধাননগর এখন আর নেই।
কলিংবেলের আওয়াজটা আর আগের মতো নেই। তিনটি মিষ্টি শব্দের বদলে এখন সুরেলা ধ্বনি। প্রভাতীবৌদি এই সময় বারান্দায় হেলান চেয়ারে বসে থাকেন। বিধবা এক প্রৌঢ়া তাকে রাতদিন দেখাশোনা এবং রান্নার কাজ করে। ঠিকে ঝি বাকি কাজ করে চলে যায়।
একতলায় সিঁড়ির পাশে সরু জায়গায় স্কুটারটা দেখে জ্যোতি আশ্বস্ত হয়েছিল। তাহলে আছে। কিন্তু বেল টেপার পরই সে কাঠ হয়ে রইল। ভিতর থেকে কেউ যেন ”কে” বলল। হঠাৎই তার মনে হল, চলে যাই। এখন আসাটা বোকামি হয়েছে। দাশুদার কাছে প্রথমে যাবে ঠিক করেছিল। নানান কথা ভাবতে ভাবতে শ্যামবাজার থেকে অন্যমনস্কের মতো বাইক চালিয়ে সল্ট লেকে ঢোকার আগেও তার মনে ছিল না, ঠিক কি জন্য সে অরবিন্দদার কাছে যাচ্ছে।
মনে যখন পড়ল, কলিংবেল সুইচ ততক্ষণে টেপা হয়ে গেছে। দরজাটা সামান্য ফাঁক হল। একটি চোখ আর সাদা থান কাপড়। চেনা লোক দেখে পাল্লাটা আরো ফাঁক হল।
”অরবিন্দদা…”
