”তোকে দেখাব। তোকে একটা পুরুষমানুষ তৈরি করে দোব। হ্যাঁ, কি যেন বলছিলুম, সওয়া লাখ টাকার অর্ডার…লোক দুটো খুব শিক্ষিত, একজন আবার ম্যাগাজিনে পদ্যও লেখে, দুজনেই সোনাগাছি যায় বলে খবর পেয়েছি, ব্যাস, এটুকু জানাই যথেষ্ট। হ্যাঁ, তুই কি যেন বললি তখন…টাকা, মাসে মাসে অতগুলো, কতগুলো? এই অর্ডারের জন্য যে টাকা খরচ করলুম, এটা করতে হতো না যদি তুই একবার গিয়ে দাঁড়াতিস।”
”মানে!”
”মানে আবার কি, তুই কি জানিস কতটা তোর পপুলারিটি, তোর ফ্যান, তোর ভক্ত কত আছে? যে কোন অফিসে তুই গিয়ে দাঁড়ালে কত লোক তোকে শুধু দেখতে আসবে, সই নেবে, তা কি তুই জানিস?”
জ্যোতি একদৃষ্টে শুধু তাকিয়ে রইল দাশুদার মুখের দিকে। খুব আন্তরিক ভাবে বলছে। এত ঘনিষ্ঠ ভঙ্গিতে আগে তার কাছে কখনো মন খোলেনি।
”তুই গিয়ে যদি একটু হেসে বলিস, এই কাজটা আমার জন্য একটু যদি করে দেন, তাহলে উপকার হয়, তাহলে মিনিস্টার থেকে বেয়ারা—কোন ব্যাটা না করে দেবে? করবি?”
”কি করব?”
”আমার হয়ে একটু বলা—কওয়া, এখান—ওখানে যাওয়া, বাড়িতে গিয়ে বৌদের কি ছেলেমেয়েদের সঙ্গে গল্পগুজব, রিকোয়েস্ট করলে ফাংশানে প্রধান অতিথি—টতিথি হওয়া, মোট কথা, ওদের ধন্য করে দিবি, আর তুইও কৃতার্থ হচ্ছিস এমনভাবে করবি…করবি?”
”তোমার অর্ডার সিকিওর করার জন্য?”
”টেন পার্সেণ্ট দোব, চাকরি করার থেকে অনেক ভাল। তাছাড়া ইচ্ছে আছে, তোর টাকাগুলো যাতে কাজে লাগিয়ে বাড়াতে পারিস তেমন একটা ব্যবস্থা করার। শৈবাল রেস্টুরেণ্ট করেছে শ্যামবাজারে, অজিত স্টিলের বাসনকোসনের দোকান দিয়েছে গড়িয়াহাটে, বাচ্চচু মিত্তির কাপড়ের এজেন্সি নিয়েছে এক গুজরাটির সঙ্গে শেয়ারে, শোরুম খুলেছে বেলেঘাটায়। ভাবছি প্লাইউডের বিল্ডিং মেটিরিয়াল সাপ্লাইয়ের কাজে নামব। আমার এক বন্ধুর কাছে শুনছিলাম, দুর্গাপুরে তাদের নতুন দুটো অফিস বাড়ি হচ্ছে আর স্টাফ কোয়ার্টার। শুধু দরজার জন্যই ওরা আট লাখ টাকার অর্ডার দিয়েছে। শুনে মনে হয়েছিল, আমিও তো অনেকটা এই ধরনের জিনিসই করি। কারখানাটা বাড়িয়ে আলাদা একটা বিজনেস শুরু করা যায়। যদি চাস তো তোকে পার্টনার করব। এখনই নামছি না, আগে বাজার বুঝেনি, হুট করে এসব ব্যবসায়ে তো আর নামা যায় না। তোকে শুধু আমার মনের ইচ্ছেটা জানিয়ে রাখলাম। পরে ভেবে দেখিস।”
জ্যোতি বলতে যাচ্ছিল, ব্যবসার সে কিছুই বোঝে না, যদি টাকা মার যায় তাহলে তো পথে বসতে হবে। দাশুদা তার মুখের দিকে একবার তাকিয়েই মনের ভিতরটা পড়ে নিয়ে বলল, ”লোকসান যাবে তোর, এমন কাজ আমার দ্বারা হবে না জেনে রাখিস।”
তারপর হঠাৎই ছলছল করে ওঠে দাশুদার চোখ। গলা নামিয়ে কোমল স্বরে বলে, ”জ্যোতি, তোকে আমি ভালবাসি। তোর খেলা আমাকে নেশা ধরিয়ে দেয়, বুঁদ হয়ে যাই, কেমন যেন উদাস লাগে। মদ, মেয়েমানুষ, টাকা, সব কিছু তুচ্ছ মনে হয়। বিয়ে করিনি, কিন্তু তুই যদি আমার ছেলে হতিস! ছেলের জন্য যা যা করতাম সেইসব করতে ইচ্ছে করে তোর জন্য।”
”একটু আগে তুমি ব্লু ফিল্ম দেখাবে বলেছ।”
গ্লাসটা মুখের কাছে তুলেছিল, ধীরে ধীরে নামিয়ে নিয়ে দাশুদা আচমকা অট্টহাসে উছলে উঠল।
”ব্যাটা ধরেছিস তো বেশ। ছেলেকে ব্লু ফিল্ম দেখাবে কিনা বাবা? হ্যা হ্যা হ্যা, না রে জ্যোতি, তুই আমার ছেলে হোসনি। আমার দ্বারা বাপ হওয়া সম্ভব নয়।”
আবার অট্টহাসি। কিছুক্ষণ পর চোখের জল মুছে নিজেকে সামলে তুলে দাশুদা গম্ভীর গলায়, কেজো গলায় বলল, ”আসলে ব্যাপারটা কি জানিস, ফুটবল বা এইরকম সব খেলায় যাতে গতর খাটাতে হয়, রীতিমত ঘাম রক্ত ঝরাতে হয়, টেনশনে থাকতে হয়, এতে শরীরটা ছিলেটানা ধনুকের মত হয়ে যায়। বেশিক্ষণ এই ভাবে টেনে রাখলে ধনুকটা মটাৎ করে ভেঙে যেতে পারে। তাই ছিলেটা আলগা করে দিতে হয়। যে কোন স্পোর্টসম্যানের শরীরও এই ধনুকের মত।”
থেমে গিয়ে দাশুদা মিটমিট চোখে জ্যোতির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। অস্বস্তি বোধ করল সে। কি বলতে চায় দাশুদা বুঝতে পারছে না।
”মাথায় ঢুকল না? কলকাতার ফুটবলাররা বড় মাথামোটা হয়, তোর শরীর গরম লাগে না? ভেতরে টান ধরে না ধনুকের ছিলের মত?”
জ্যোতি নড়ে বসল। দাশুদার কথার ইঙ্গিতটা সে বুঝতে পারছে।
”আলগা করা দরকার, নয়তো মটাৎ হয়ে যাবে। এটা খারাপ কিছু নয়। আমি নিজে খেলি না কিন্তু বুঝতে পারি। কত বড় বড় ফুটবলারকে তো দেখেছি, টান আর সহ্য করতে পারে না, মেয়েমানুষের কাছে ছুটে যেতেই হয়। ভগবানের এই আশ্চর্য এক যন্তর হল মেয়েমানুষ। সবার দরকার হয়। কি খুনী, কি পুলিশ? কি ঘুষ দেনেওলা, কি ঘুষ লেনেওলা, কি ফুটবলার, কি রেফারী, যারাই টেনশনের মধ্য দিয়ে চলে তাদের আলগা হওয়ার কাজটা মেয়েমানুষ ছাড়া আর কিছুতে হয় না। জ্যোতি, যদি তুই তাড়াতাড়ি খাক হয়ে জ্বলে যেতে না চাস তাহলে মেয়েমানুষ ধর। লোকে বলবে তোকে নষ্ট হবার বুদ্ধি দিচ্ছি, কিন্তু আমি বলি তুই মাঝে মাঝে ফুর্তি কর। ডিসিপ্লিনড থাকবি, বাড়াবাড়ি করবি না, শুধু ঠাণ্ডা করার জন্য নিজেকে ভিজিয়ে নিবি। তোর ভাবসাব আছে কি কোন মেয়ের সঙ্গে?”
সন্ত্রস্তের মতো কুঁকড়ে গিয়ে জ্যোতি ব্যগ্র স্বরে বলল, ”না না, কারুর সঙ্গে ভাব নেই।”
