এইভাবে প্রায় লটারি করেই সাত—আটজনের দুটো দল হত। মুশকিল হত জ্যোতিকে নিয়ে। দুই ক্যাপ্টেনই তাকে চাইত। অনেক দিন জ্যোতিকে দুই দলের হয়েই আধাআধি করে খেলতে হয়েছে।
লাথি মারা, ঘুঁষি মারা, থুথু দেওয়া, গালাগালি, খিমচে রক্ত বের করা, এগুলো হতই। এজন্য প্রায়ই খেলা বন্ধ হয়ে যেত এবং আবার কিছুক্ষণ পর শুরু হত। বেশির ভাগ ছেলেই ছিল জ্যোতি থেকে পাঁচ—ছয় বছরের বড়। জ্যোতিকে আটকাতে তাদের কাজ ছিল, বল ধরলেই তাকে পিঠে ধাক্কা দিয়ে বা পিছন থেকে গোড়ালিতে লাথি কষিয়ে বা সররা কেটে ফেলে দিয়ে তাকে বল থেকে সরিয়ে দেওয়া।
প্রথম প্রথম সে ক্ষেপে উঠত। চিৎকার করত, মাঠ থেকে বেরিয়ে যেত কিন্তু এসব করে সে মার খাওয়া থামাতে পারেনি। অবশেষে নিজেকে বাঁচাবার জন্য উপায় খুঁজতে খুঁজতে সে জানতে পারল, হঠাৎ যদি নিজের দৌড়ের গতিটা বাড়িয়ে দেয় বা বল ধরার সময়টা নিখুঁত ভাবে বুঝে নিয়ে এগোয় তাহলে ওদের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যেতে পারবে। কখন তাকে মারতে আসবে, ওটাও সে ধীরে ধীরে শিখতে শুরু করে।
জ্যোতির মনে তখন ঘূণাক্ষরেও এই চিন্তাটা আসেনি যে, বড় হয়ে ফুটবল খেলেই সে অর্থ রোজগার করবে, পঁচিশ বছর বয়সের আগেই দেড় লাখ টাকার বাড়ি তৈরির জন্য আর্কিটেক্টের সঙ্গে দেখা করবে।
মাঝে মাঝে যখন সে ছোটবেলার দিকে তাকিয়েছে, জগামালির মাঠের কাছে সে কৃতজ্ঞ থেকেছে। এখানেই সে কষওয়ালা ফুটবলার হবার প্রাথমিক প্রক্রিয়াগুলোর মধ্যে দিয়ে জীবন শুরু করেছিল। এই মাঠেই সে শিখেছিল কিভাবে মার নিতে হয় এবং তার থেকেও বড় কথা, কিভাবে মার এড়াতে হয়। আজ পর্যন্ত জ্যোতি বড় ধরনের আঘাত পায়নি।
একবার একটা ইংরাজী ম্যাগাজিনে, তার সাফল্যের কারণ সম্পর্কে লেখা হয়েছিল, ‘বছরের পর বছর ধরে অসাধারণ ধৈর্যে প্র্যাকটিস আর নিবিড় ট্রেনিংয়ের ফলেই সে এমন নিখুঁত হয়ে উঠেছে।’ পড়ে সে খুব হেসেছিল। জ্যোতির মনে হয়েছিল জগামালির মাঠে যা করেছে তার থেকে বেশি কিছু সে এখন করে না। তফাৎটা শুধু, এখন যা করে থাকে সেটা বড় মাঠে, ভিন্ন পরিবেশে আর বেশি লোকের সামনে।
সারথিতে আসার তিন বছরের মধ্যেই খবরের কাগজ আর ম্যাগাজিনগুলো তাকে ফুটবলের সুপারম্যান বানিয়ে এমন একটা জায়গায় তুলে দেয় যে, অপরিণত মস্তিষ্ক, নাবালক, সারথি ভক্তরা তাকে ‘সারথির সারথি’ বলা শুরু করে দেয়। এই ধরনের স্তুতি সে কখনো গায়ে মাখেনি , স্তাবকতা তার পায়াভারি করেনি। বরং এগুলোকে সে নানান ধরনের সুবিধা আদায়ের সুযোগ রূপেই ব্যবহার করেছে।
একটা ফুটবলারের, বিশেষত স্ট্রাইকারের জীবন, ক’বছর টপ ফর্মে থাকতে পারে? চুনী গোস্বামী থেকে হাবিব পর্যন্ত হিসেব করে সে এই সিদ্ধান্তে এসেছে যে, খুব গুছিয়ে, শৃঙ্খলা মেনে জীবন যাপন এবং খেলার গুরুত্ব বুঝে শক্তি ক্ষয় করে সে সাত বড় জোর আট বছর চুটিয়ে খেলতে পারবে।
দাশুদা তাকে আর একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছতে বিরাট সাহায্য করেছিল। একদিন তার ফ্ল্যাটে দুজন অচেনা লোক আর দুজন বান্ধবীর সঙ্গে দাশুদা খানা—পিনার সন্ধ্যেটা কাটাবার পর রাত্রে দাশুদা তাকে ঘর থেকে ডাকিয়ে মুখোমুখি বসে।
”জ্যোতি তোকে একটা কথা বলি, এই যে ব্যাঙ্কে চাকরি করছিস, এটা ছেড়ে দে। ক্লাব থেকে অনেক টাকাই তো পাচ্ছিস, বিয়ে—থা করিসনি, বাড়িতেও এমন কিছু খরচের চাহিদা নেই, তোর নিজেরও খরচ বলতে প্রায় কিছুই নেই, কেমন ঠিক বলছি?”
জ্যোতি মাথা হেলান।
”তোর কাজ মাঠে গোল দেওয়া। সেটা যত বছর ধরে দিবি, তত বছর তোর টাকা। কেমন? তুই যদি বছরগুলো বাড়াতে পারিস তাহলে টাকাও বাড়বে। এই যে হাবিজাবি এধার ওধার ম্যাচ খেলা আর অফিসের খেলা, এগুলো ফুটবলারের শক্তি শুষে নিয়ে শরীরের জোর যেমন কমায় তার থেকেও বেশি ক্ষতি করে মনের দিক থেকে বোদা করে দিয়ে। ফুটবলে অরুচি ধরায়, মাঠে নামতে বিতৃষ্ণা আসে, অনেকেই আমাকে বলেছে সামনে খোলা গোল পেয়েও শট নিতে গাছাড়া ভাবের জন্য বাইরে মেরেছে। এইভাবেই ভেতর থেকে ফুটবল সম্পর্কে আগ্রহ চলে যায় ফলে বছরগুলোও কমে আসে। নিজেকে তাজা রাখার চেষ্টা কর, অফিস ছেড়ে দে।”
”মাসে মাসে এতগুলো টাকা যখন পাচ্ছিই…” জ্যোতি কথাটা শেষ করার আগেই দাশুদা হাতের গ্লাসটা টেবলে ঠুকে আওয়াজ করল চুপ করার জন্য আদেশ জানাবার ঢঙে।
”এতগুলো টাকা! কত টাকা! তোর খেলা, সুনাম, যশ, খ্যাতি এসবের থেকেও কি বেশি? কয়েক সেকেণ্ড জ্যোতির মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে দাশুদা মেঝে থেকে হুইস্কির বোতল তুলে নিয়ে গ্লাসে অল্প ঢালল। আর একটা বোতল থেকে জল ঢেলে গ্লাসটা ভর্তি করে নিল।
”আজ সওয়া লাখ টাকার অর্ডার পাকা করে নিলুম। যে দুটো লোক এসেছিল দেখেছিস তো…ওদের ব্যাণ্ডেল অফিসের চেয়ার টেবল থেকে পর্দা পর্যন্ত সব আমার কোম্পানি করে দেবে। এজন্য আমাকে কি করতে হল? দুটো মেয়েমানুষ, ওদের তো এখানে অনেকবার দেখেছিস, দেড় বোতল ভ্যাট সিক্সটিনাইন আর ব্লু ফিল্ম। ঘরে প্রোজেক্টার আছে এটা বোধহয় তুই এখনো জানিস না।”
জ্যোতি জানত না তাই অবাকই হল। ব্লু ফিল্মে কি থাকে সেটা অনেকের কাছে শুনেছে কিন্তু কখনো দেখেনি। দেখার জন্য কৌতূহল যথেষ্ট আছে।
