প্রিয়রঞ্জন অসচ্ছল কম্পাউণ্ডার। জুট মিলের ডিস্পেন্সারিতে কাজ করেন। চুরির সুযোগ আছে এবং সে সুযোগ নিতে তিনি দুর্বলতা দেখান না। তবু সংসারের টানাটানি ঘোচে না, যেহেতু চুরির পয়সাগুলো খেয়ে নেয় দিশি মদ। নিজে লেখাপড়া না শিখলেও প্রিয়রঞ্জনের মাথায় এটুকু ঢুকে আছে, কলেজের ডিগ্রি চাইই আর সেটা রোজ দু বেলা বই খুলে চিৎকার করে না পড়লে, পাওয়া সম্ভব নয়। ফলে, দু বেলাই জ্যোতিকে বেদম প্রহার থেকে তিনি বঞ্চিত করেননি। বাবাকে মনে প্রাণে ঘৃণা করা, ছোটবেলা থেকেই জ্যোতির মধ্যে শুরু হয়ে গেছিল।
অঘোরচন্দ্র স্কুলে পড়াতে খরচ লাগবে না, শুনেই তার বাবা রাজী হয়ে যান। এরপর জ্যোতি ধাপে ধাপে ক্লাস টেন পর্যন্ত ওঠে, কিন্তু ফুটবলে সে আরো দ্রুত ডিঙিয়ে গেছে ধাপগুলো। কলকাতার ময়দানে সে সতেরো বছর বয়সেই পৌঁছে যায়।
মোটর বাইকটা পুকুরের ধার দিয়ে, চার হাত চওড়া ইঁট বাঁধানো রাস্তার দিকে নিয়ে যাবার সময় একতলা বাড়িটার সামনে আসতেই জ্যোতির ভিতরটা কয়েক সেকেণ্ডের জন্য কাঠ হয়ে উঠল। তাকাবে না ঠিক করেও একবার চট করে আড়চোখে তাকাল।
বাইকের শব্দে একটি কিশোরী কৌতূহলবশতই জানালার কাছে এসে রাস্তায় তাকিয়েছে। ছ্যাঁৎ করে উঠল জ্যোতির বুক। তারপরই স্বস্তিতে শিথিল হয়ে গেল অ্যাক্সিলেটরের মুঠো। এ বাড়ির লোকজনেরা নতুন। এদের কাউকে সে চেনে না, কখনো চোখেও দেখেনি। বাড়িটা সাত বছর আগে বিক্রি করে বিনয় ভটচায আর তার মেয়ে উষা কোথায় যে চলে গেছে, কেউ তা জানে না। মেয়েটি যে জানলাটি থেকে তাকিয়েছে, ঠিক ওই জানলা থেকেই উষা তাকাত!
ইঁট বাঁধানো রাস্তাটা সর্পিলভাবে আধ মাইল গিয়ে বি টি রোডে মিশেছে। মেশার আগে বাঁদিকে একটা ছোট্ট জমির ধার দিয়ে রাস্তাটা বেঁকে গেছে। জনা পনেরো বালক ও কিশোর ফুটবল খেলছে সেই মাঠে।
জগা মালির মাঠ বলা হয় এটাকে। কেন যে এই নাম কেউ তা জানে না। আপনা থেকেই মন্থর হয়ে গেল বাইকটা।
তখন এইরকম দোকানগুলো ছিল না, মাঠের ধারের বাড়িগুলোও নয়। একটি দোতলা বাড়ি আড়াল করে দিয়েছে বিপিন স্যারের কাঠ আর ছিটেবাঁশের দেওয়াল দেওয়া টালির চালের ঘরটাকে। ঘরের জানালা দিয়ে তিনি মাঠে ছেলেদের খেলা দেখতে পেতেন।
জ্যোতি বাইকটা থামাল চায়ের দোকানের সামনে। বেঞ্চে বসে যারা চা খেতে খেতে কথা বলছিল তারা তটস্থ হয়ে গেল। জ্যোতিকে তারা নামে মাত্র চেনে। এই অঞ্চলে সে সবথেকে খ্যাতিমান।
”একটা চা দিন তো ভাই।” বাইকে বসেই সে আন্তরিক স্বরে বলল। চোখ মাঠের দিকে।
”বেঞ্চে এসে বসুন না।” ময়লা গেঞ্জি আর লুঙ্গি পরা মাঝবয়সী চা—ওলা বিগলিত স্বরে বলল।
”এই ঠিক আছি, খেলছে কারা?”
”পাড়ারই ছেলেপুলে সব। আপনিও তো জগামালির মাঠে খেলেছেন ছোটবেলায়।”
”হ্যাঁ। তখন মাঠটা একটু বড় ছিল। এইসব বাড়িটাড়ি তখনো হয়নি।”
”আরো ছোট হয়ে যাবে। ধারের দিকের জমি বিক্রি হয়ে গেছে। খেলাটেলা ক্রমশ বন্ধ হয়ে যাবে।”
জ্যোতি কথা না বলে চায়ের কাপটা নিল। ছোট ছোট চুমুকে দু মিনিটেই চা শেষ করে, পয়সা দিয়ে বাইকে স্টার্ট দিল। আড়চোখে দেখল ছেলেরা খেলা থামিয়ে তাকে দেখছে।
.
।।দুই।।
এগার বছর বয়সে অঘোরচন্দ্র স্কুলে আসার পর জ্যোতির্ময় বিশ্বাস শুনতে থাকে, বিশেষ এক ধরনের ফুটবল—প্রতিভা নাকি তার মধ্যে রয়েছে। পরবর্তী কালে অবশ্য ফুটবল সাংবাদিকরা তার সম্পর্কে সঠিক বিশেষণ খুঁজে না পেয়ে অবশেষে ‘দ্বিতীয় চুনী’/ ‘নতুন বলরাম’ ইত্যাদি বাক্যাবলী তার নামের সঙ্গে জুড়েছে।
কি করে ফুটবল খেলতে হয়, সেটা একজনও তাকে শেখায়নি। স্বাভাবিকভাবেই, খেলাটা তার কাছে এসেছে। খেলতে খেলতেই সে ‘অফ সাইড’ ‘থ্রো’, ‘ফ্রি কিক’ ইত্যাদি শব্দ শুনেছে আর খেলার নিয়ম জেনেছে। এখন তবু বাঁশের গোলপোস্ট, তার ছোটবেলায় জগামালির মাঠে ইঁট কিংবা শার্ট খুলে গোলের চিহ্ন রাখা হত।
পার্টি করে খেলা হত। দু পক্ষের জন্য ক্যাপ্টেন ঠিক হবার পর ছেলেরা দুজন—দুজন করে দূরে সরে গিয়ে কানে কানে নিজেদের একটা নাম ঠিক করে নিত। তারা দুজন ছাড়া নামদুটো আর কেউ জানবে না।
”ডাক ডাক ডাক কিসকো ডাক?” কাঁধ ধরাধরি করে জোড়ায় জোড়ায় ছেলেরা এসে ক্যাপ্টেনদের সামনে দাঁড়িয়ে ওই বলে জিজ্ঞাসা করত। দুই ক্যাপ্টেনের একজন তখন বলত, ”হাম কো মেরি তোমকো ডাক।” দুজন ছেলের একজন তখন বলত, ”কে নেবে চাপাটি কে নেবে পরোটা, কিংবা হয়তো বলত, ”কে নেবে টগর ফুল, কে নেবে পদ্ম ফুল।” কিংবা এই ধরনেরই কিছু।
যে ক্যাপ্টেনের ডাক দেবার কথা সে তীক্ষ্ন চোখে বোঝার চেষ্টা করত, দুজনের মধ্যে যে ছেলেটি ভাল খেলে তার নাম কোনটা হতে পারে? চাপাটি না পরোটা? দুজনের কেউ অবশ্য ইশারা করে বা ভাবভঙ্গিতে বুঝিয়েও দিতে পারে সে—ই চাপাটি বা সে—ই পরোটা। অবশ্য এসব ব্যাপার করতে গিয়ে ধরা পড়ে গেলে তুমুল ঝগড়া এবং হাতাহাতিও শুরু হয়ে যেতে পারে। ক্যাপ্টেন স্রেফ আন্দাজেই বলে দেয়, ”আমি নেব পরোটা।’ তখন দুজনের মধ্যে যার নাম পরোটা, সে এগিয়ে এসে ডাকদেওয়া ক্যাপ্টেনের বাঁদিকে দাঁড়াবে। এরপর অন্য ক্যাপ্টেনের ডাক দেবার পালা। আর একজোড়া ছেলে এগিয়ে এসে তাকে বলবে, ‘ডাক ডাক ডাক কিসকো ডাক।’
