অরবিন্দদার ব্যাপারটা সম্পর্কে কি করা যায় তাই নিয়ে এখুনি একবার দাশুদার সঙ্গে কথা বলা দরকার। অরবিন্দদাকে প্রেসিডেণ্টের দলবল একদমই পছন্দ করে না। ওকে সরাবার জন্য গত সাত বছরে দশবার চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু সরোজ সেন সেগুলো কাটিয়ে দিয়েছেন। তাঁকে সাহায্য করেছে জ্যোতি এবং দাশুদাও। তাছাড়া অরবিন্দদা এমন একটা সময়ে সারথিতে আসেন যখন ক্লাব মুখ থুবড়ে পড়েছে। লীগে মাঝামাঝি জায়গায় থাকার জন্য হাঁকপাঁক করছে, দু বছর ভারতের বড় টুর্ণামেন্টগুলোয় থার্ড রাউণ্ডের উপর যেতে পারছিল না, ছোট টুর্ণামেণ্ট একটাও জিততে পারেনি। ক্লাবের ভিতরে দলাদলি মাথা চাড়া দিয়ে খেলোয়াড়দের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছিল। ট্রান্সফারের সময় ক্লাবেরই কোন কোন কর্তা ”নিজের” খেলোয়াড়দের অন্যান্য ক্লাবের হাতে তুলে দিয়ে ভাঙন ধরিয়ে দেয়। এমন একটা অবস্থা থেকে অরবিন্দদা দু বছরের মধ্যে ক্লাবকে টেনে তুলে লীগে রানার্স করান, পরের বছরই লীগ চ্যাম্পিয়নশিপ এবং রোভার্স কাপ নিয়ে আসেন। সারথি আবার চাঙা হয়ে দাপিয়ে চলতে শুরু করে। অরবিন্দ মজুমদার একটা কথা গভীরভাবে বিশ্বাস করেন, জ্যোতিকে না পেলে তিনি সফল হতেন না। সাহস এবং আস্থা নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষায় নামতে পারতেন না।
এবার থেকে সারথি মুখাপেক্ষী হয়ে পড়েছিল অরবিন্দদার। দলটা তার মুঠোয় এবং সেই মুঠো তিনি কখনো আলগা করতে রাজী নন। কারুর কোন অনুরোধ, যদি না যুক্তিপূর্ণ হত, তিনি রক্ষা করেননি। শৃঙ্খলা ভাঙলে বা নির্দেশ অমান্য করলে কাউকে রেয়াৎ করেননি। অনেক গণ্যমান্য কর্তা তার কাছ থেকে মান হারিয়ে ফিরে এসেছেন। স্বভাবতই, তার বিরুদ্ধে একটা জোরালো গোষ্ঠী ক্লাবের মধ্যে তৈরি হয়ে গেছে যদিও বাইরে হাজার হাজার ক্লাব সমর্থকদের কাছে তিনি পরিত্রাতা গণ্য হয়েছেন। মূলত এই বাইরের সাধারণ সমর্থকদের ভয়েই কেউ এতকাল অরবিন্দদার গায়ে আঁচড় কাটতে পারেনি। তাছাড়া ট্রফি জয়ের সাফল্যগুলো তো ছিলই।
কিন্তু এখন? কাগজের হেডিংগুলোর দিকে তাকিয়ে জ্যোতি মাথা নাড়ল। আর বোধহয় বাঁচান যাবে না। ওর রক্ত নেবার জন্য তো অনেকেই তৈরি, এখন তারা ছুরি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বেই। এবার লীগে ফোর্থ, বরদলুইয়ে সেমি ফাইনাল থেকে আর ডুরাণ্ডে কোয়ার্টার ফাইনালের আগেই বিদায় নিয়েছে সারথি। অরবিন্দদার আগের ঔজ্জল্য আর নেই, দাপটও স্তিমিত। এবার এই ঘটনাই ওঁকে শেষ করে দেবে।
বুকের মধ্যে শুধুই বাতাস ছাড়া জ্যোতি আর কিছু বোধ করছে না। শূন্যতা। এই লোকটিই তার খেলা গড়ে দিয়েছে, আজ সে যতটুকু হতে পেরেছে তা ওঁরই জন্য। ক্লাব থেকে ওঁকে সরিয়ে দিলে সে নিজেও খুব ভাল অবস্থায় থাকবে না। সবাই তাকে জানে অরবিন্দ মজুমদারের ‘ছেলে’। নতুন কেউ ওঁর জায়গায় কোচ হয়ে আসবে। যেই আসুক, তার সঙ্গে বনিবনা হবে কিনা কে জানে! তবে জ্যোতি বিশ্বাসকে তাড়াবার চিন্তা নিশ্চয়ই কারুর মাথায় আসবে না। এক লাখ টাকা চাইলে, যুগের যাত্রী তাকে সামনের বছরই কাঁধে তুলে নিয়ে যাবে। দু বছর আগে দেড়লাখ পর্যন্ত ওরা উঠেছিল তাকে পাওয়ার জন্য।
‘ছোটু, ছোটু।”
লুঙ্গি ছেড়ে ট্রাউজার্স পরতে—পরতে জ্যোতি হাঁক দিল।
”ছোটু বেরিয়ে গেছে, কি দরকার কি?” আশালতা দরজায় এসে দাঁড়ালেন।
”এই তিরিশটা টাকা নাও, ছোটুকে বাজারে গিয়ে মাছ আনতে বল, আমি একটু কলকাতায় যাচ্ছি, খুব দরকার।”
”ফিরবি কখন, খাবি তো?”
”তুলে রেখে দিও, যখন ফিরব তখন খাব। কালই আমি মেসে চলে যাব।”
সোমবার থেকে রোভার্সের জন্য প্র্যাকটিস শুরু হবার কথা। জ্যোতি কালো চশমাটা চোখে লাগিয়ে ঘর থেকে বেরোল। চশমাটা চার বছর আগের, কুয়ালালামপুরে কিনেছিল, মারডেকা টুর্ণামেণ্টে খেলতে গিয়ে। চশমাটা ছাড়া সে মোটরবাইকে চড়ে না।
বুলেটটাকে ঠেলে বাড়ির বাইরে এনে স্টার্ট দেবার আগে হঠাৎ মনে পড়ায় সে মাকে ডেকে বলল, ”কাগজগুলো বিছানায় ছড়ান রয়েছে, আমার দরকারে লাগবে, গুছিয়ে তুলে রেখে দিও। আর বিপিন স্যার যদি খোঁজ নেন তো বোলো খুব দরকারে কলকাতায় গেছি, ফিরে এসেই ওঁর বাড়িতে যাব।”
বিপিন গোস্বামী, অঘোরচন্দ্র উচ্চচ মাধ্যমিক বিদ্যাসদনের শিক্ষক। জ্যোতিকে কেউ যদি আবিষ্কার করে থাকেন তো তিনি এই বিপিন স্যার। জ্যোতি যখন বাড়ির কাছে প্রাইমারি স্কুলের ছাত্র তখন একটা ছোট মাঠে পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে খেলতে দেখে বিপিন স্যার দাঁড়িয়ে পড়েন। জ্যোতিকে ডেকে তার বাড়ির ঠিকানাটা নিয়ে দু’দিন পরই প্রিয়রঞ্জনের কাছে হাজির হন।
ছেলে ভাল ফুটবল খেলে বা তাকে উৎসাহিত করলে বড় খেলোয়াড় হতে পারবে, একথা শুনে প্রিয়রঞ্জন মোটেই উদ্দীপ্ত হননি। বেঁটে, টাকমাথা বিপিন স্যারকে ঘাবড়ে দেবার মত দৃষ্টি হেনে বলেছিলেন, ”ফুটবল কি আমার গুষ্টি উদ্ধার করবে? খালি খেলা আর খেলা, লেখাপড়া না করলে এই দিনকালে করেকম্মে খাবে কি? আর আপনি, একটা জ্ঞানীগুণী শিক্ষক হয়ে কিনা বলছেন, ওকে ফুটবল খেলতে দিন!”
”হ্যাঁ বলছি।” ছোট্টখাট্ট মানুষটার গলা থেকে যে এমন কঠিন স্বর বেরোতে পারে, প্রিয়রঞ্জন তা আশা করেননি। থতমত হলেন। কিঞ্চিৎ ঘাবড়ালেনও।
”যাঁর যেটা হবে তাকে সেই পথে যেতে দেওয়াই ভাল। জ্যোতিকে আমাদের স্কুলে নেব। ফ্রিশিপ পাবে, পড়ার বইপত্তর আমিই দেব, আপত্তি আছে আপনার?”
