সরোজ সেনের কাছ থেকে মোটর গাড়ি আর পাওয়া হয়নি। শেয়ার বাজারে হঠকারিতা করে তিনি এমনই ফাটকা খেলেছিলেন যে শুধু বিষয় সম্পত্তিই নয়, বিরাট অফসেট প্রেসও বিক্রি করতে হয়। এরপর তিনি সারথি সংঘের গেটে আর পা রাখেননি। হাওড়ায় বস্তির মত একটা অঞ্চলে দুটো ঘর ভাড়া নিয়ে এখন সপরিবারে আছেন।
জ্যোতি জানালার বাইরে থেকে চোখ সরাল। বুলেটটা উঠোনে হেলান দিয়ে রয়েছে স্টেপনিতে। গত পাঁচ বছর অবসর পেলেই এই প্রিয় বাহনটিতে চড়ে সে পশ্চিমবাংলা চষে বেড়িয়েছে।
একগোছা কাগজ হাতে ছোটু বাড়িতে ঢুকছে। দেখেই জ্যোতি কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এই কাগজগুলোতেও কি, ধৃতদের মধ্যে অরবিন্দ মজুমদার রয়েছেন, লেখা আছে? ভুলও তো হতে পারে। ভগবান, তাই যেন হয়। অরবিন্দ সমাদ্দার কিংবা অরবিন্দ মুখার্জি নামে কেউ, কিন্তু অরবিন্দ মজুমদার যেন না হয়। ছাপার ভুল কিংবা আদালত সংবাদদাতার লেখার ভুল এইরকম একটা কিছু যেন হয়।
কাগজগুলো বিছানার উপর রেখে সে একটার পর একটা খুঁটিয়ে পড়ল। দুটো কাগজে আইন—আদালত কলামে খবরটা বেরিয়েছে, দুই প্যারাগ্রাফ। বাকিগুলোতে খেলার পাতায় বেরিয়েছে রীতিমত ফলাও করে। ইদানীং চাঞ্চল্যকর খবর বার করায় নাম করেছে ‘প্রভাত সংবাদ’ পত্রিকা। এদের রিপোর্টার রঞ্জন অধিকারীকে টেণ্ট থেকে বার করে দিয়েছিলেন অরবিন্দদা, তার বক্তব্য বিকৃত করে রিপোর্ট করার জন্য। তার ফলে ক্লাবে প্রেসিডেন্ট সন্তাোষ ভট্টাচার্যকে কিছু সমর্থক ঘেরাও করে গালাগালি দিয়েছিল। বিশ্রী একটা নোংরা আবহাওয়া ক্লাবে তৈরি করে দিয়েছিল রঞ্জনের রিপোর্ট। সরোজ সেনের সঙ্গে কথা বন্ধ হয়ে গেছিল প্রেসিডেণ্টের। দিন সাতেক পর রঞ্জন টেণ্টে এলে, অরবিন্দদা ওর জামার কলার ধরে ক্লাবের গেট পর্যন্ত টেনে নিয়ে গিয়ে শুধু বলেছিলেন, ”আগে ভদ্রলোক হও তারপর সাংবাদিক হয়ো।”
রঞ্জনের কাগজ প্রতিশোধ নেবার সুযোগটা ছাড়েনি। বড় অক্ষরে তিন কলাম হেডিং করেছে—ফুটবল কোচ অরবিন্দ মজুমদার গণিকা গৃহে ধরা পড়েছেন। তারপর প্রায় দু’কলাম ধরে, সবিস্তার বর্ণনা পুলিশ হানার, অরবিন্দ মজুমদারের ফুটবল কেরিয়ারের, ওর কোচিংয়ে সারথি সংঘের নানান ট্রফি জয়ের, ব্যক্তিগত জীবনে স্ত্রীর অসুস্থতার এমনকি জ্যোতির্ময় বিশ্বাসকে আবিষ্কার করার কথাও লেখা হয়েছে।
”আশ্চর্য, এত কথা যোগাড় করে এইটুকু সময়ের মধ্যে লিখে ফেলল!” জ্যোতি একদৃষ্টে ছড়ান কাগজগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ঠিক করে ফেলল, দাশুদার সঙ্গে আগে একবার কথা বলে নেবে।
দাশু বা দাশরথি সেনশর্মা, সারথি সংঘের একজন সক্রিয় সদস্য ছাড়া, ক্লাবে তার আর কিছু পরিচয় নেই। কখনো কোন কমিটিতে থাকেনি, বিয়ে করেনি, ইনটিরিয়ার ডেকরেটিংয়ের ব্যবসা করে, প্রতিদিন ক্লাবে হাজিরা দেয়, প্রেসিডেণ্ট থেকে মালি সবাই তাকে চেনে, ক্লাবের প্রয়োজনে পনের কুড়ি হাজার টাকা বিনা প্রশ্নে ধার দেয়, ফুটবলারদের বিপদে আপদে তাদের বাড়িতে ছুটে যায়, অন্য ক্লাব থেকে কাউকে ফুসলে আনতে সে মাসের পর মাস পিছনে লেগে থাকতে পারে, আই এফ এ, রাইটার্স বিল্ডিংস, ফোর্ট উইলিয়াম আর লালবাজার, প্রত্যেক জায়গাতেই, যাদের দিয়ে কার্যোদ্ধার হয়, তাদের সঙ্গে দাশুর চেনাপরিচয় আছে। সারথির উপকার হবে, এমন কাজ থেকে তাকে দমান অসম্ভব। ওর আনুগত্য ক্লাবের কোন ব্যক্তিবিশেষের প্রতি নয়, সারথির মঙ্গল বা হিতই প্রধান বিবেচ্য। হাসিখুশি দিলখোলা বছর পঞ্চাশের এই লোকটির বাইরেটা যত নরম, ভিতরটা কিন্তু ততটা নয়। বিশেষত সারথির স্বার্থ যেখানে জড়িত।
ক্লাবে প্রথম বছরেই জ্যোতিকে পছন্দ করে ফেলে দাশু। বড় ভাইয়ের স্নেহে, নানা উপদেশ ও শাসনের মধ্য দিয়ে সে জ্যোতিকে আড়াল করে প্রথম দুটো বছর রেখেছিল। দরকারও ছিল। তিন চারটি ক্লাব জ্যোতিকে পাবার জন্য হাত বাড়াচ্ছিল। সারথির দামী সম্পত্তিটিকে ধরে রাখার সুখ ছাড়া তার আর কোন স্বার্থ নেই। জ্যোতি বহুবার নানান ধরনের উপকার নিয়েছে। সর্বশেষটি জমি কেনার ব্যাপারে। রাইটার্সে যথাস্থানে কলকাঠি নেড়ে দাশু সেই ব্যবস্থা করে দিয়েছে।
দাশুদার বাড়িতে আর কারখানায় ফোন আছে। কিন্তু এখানে ধারেকাছে ফোন নেই। এটাই জ্যোতির মুশকিল। যদি সে অনেকের মতই, মেসে না থেকে বাড়ি থেকেই যাতায়াত করত, তাহলে টেলিফোন এনে দিত। এসব তার কাছে সমস্যা নয়। কিন্তু বাড়িটা তার কাছে বসবাসের স্থান হিসেবে একদমই পছন্দ নয়। একটা মানসিক প্রতিবন্ধকতা সাত বছর আগে তৈরি হয়ে গেছল যেটাকে আজও কাটিয়ে উঠতে পারেনি। প্রথম তিন বছর সে একদিনের জন্যও টিটাগড় মুখো হয়নি। তারপর মাঝেমধ্যে আসতে শুরু করে কয়েক ঘণ্টার বা একবেলার জন্য। গত বছর থেকে তিন চারদিন টানা থাকছে। নয়তো সিজন শেষ হয়ে গেল, মেস যখন ফাঁকা, ঘরগুলো বন্ধ, তখন সে দাশুদার গড়চার ফ্ল্যাটে গিয়ে থাকে।
এটা দাশুদার লুকোন আস্তানা। বন্ধু এবং বান্ধবীদের সঙ্গে হুল্লোড়—ফুর্তি করে সন্ধ্যেটা কাটাবার জন্য পাঁচতলা ফ্ল্যাট বাড়ির দোতলায় পিছনদিকে তিনঘরের ফ্ল্যাটটা বছর দশেক আসে সে ভাড়া নেয়। ফুর্তি গভীর রাত পর্যন্তই গড়ায় এবং বান্ধবীদের কেউ কেউ আর বাড়ি ফেরে না। জ্যোতি প্রথমদিকে নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে কাঠ হয়ে শুয়ে থাকত। কিন্তু দাশুদাকে সে কখনো অপ্রতিভ বা লজ্জিত হতে দেখেনি। ”এসব একটু আধটু দরকার। এখন ঠিক বুঝবি না। আর একটু লায়েক হয়ে নে তারপর আমিই ডাকব, আয় জয়েন কর। এখন একমনে খেলাটা তৈরি কর, কেরিয়ার গড়ে নে।”
