আজ শুক্রবার। অরবিন্দদা এখন নিশ্চয়ই বাড়িতে। বাড়ি মানে সল্ট লেকে দু’ ঘরের ফ্ল্যাট। অরবিন্দদা আর প্রভাতী বৌদি। সন্তান নেই। গত চোদ্দ বছর ধরে বৌদি পক্ষাঘাতে বিছানায়। জ্যোতি বিছানা থেকে উঠে পড়ল। সে ঠিক করে উঠতে পারছে না, এখন কি করবে। ফুটবল খেলোয়াড় হিসাবে এখন তার যত নামডাক, প্রতিষ্ঠা, তার কিছুই হত না যদি সে সাত বছর আগে বাড়ি থেকে পালিয়ে অরবিন্দদার ফ্ল্যাটে গিয়ে একদিন না দাঁড়াত।
ঠিক এই সময়ে কি অরবিন্দদার মুখোমুখি হওয়া উচিত? সামনে দাঁড়ান কি সম্ভব? দাঁড়াল ওঁর কি হবে জানি না কিন্তু নিজেরই লজ্জা করবে। বস্তুত সল্ট লেক থেকে টিটাগড়, অন্তত ষোল—সতেরো কিলোমিটার দূরে নিজের ঘরে একা, তবু সে অদ্ভুত একটা লজ্জার মধ্যে নিজেকে নিয়ে বিপন্ন বোধ করছে। বুকের ভিতরটা কুঁকড়ে যাচ্ছে। অরবিন্দদা কিনা শেষকালে…।
কিন্তু খবরের কাগজে অনেক তো ভুল খবরও বেরোয়।
”ছোটু, ছোটু।” জ্যোতি চেঁচিয়ে তার ছোটভাইকে ডাকল। বছর আঠারোর ছোটু আসতেই সে একটা পাঁচটাকার নোট তার হাতে দিয়ে বলল, ”দৌড়ে যা, যে কটা কাগজ পাবি, সব একটা করে কিনে নিয়ে আয়, জলদি, চটপট।”
”কিন্তু আমি যে এখন—।”
”যা বলছি।” এত জোরে চীৎকার এ—বাড়িতে জ্যোতি আগে কখনো করেনি। ছোটুর হাতটা কেঁপে গেল।
”কটা কাগজ আনব?”
”পাঁচটা, ছ’টা, যে কটা হয়।”
ছোটু আর কথা বাড়াল না। আশালতা ঘরে এলেন।
”কি হল, চেঁচিয়ে উঠলি কেন? ওমা, চায়ের কাপটা যে—” কাপটা তুলে নিয়ে তিনি ন্যাতা আনতে বেরিয়ে গেলেন। জ্যোতি জানালায় দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল। জানালার পাশেই ছোট্ট একটা পুকুর। তার ডানদিকে একতলা পাকা বাড়ি। সাত বছর আগে বাড়িটা কিনে, মেরামত করে বসবাস করছে একটি পরিবার। জ্যোতি ওদের কাউকে চেনে না, নাম পর্যন্ত জানে না।
গত সাত বছর নিজের বাড়ি, বাবা—মা, ভাইদের সঙ্গে জ্যোতির সম্পর্ক প্রায় ছিলই না। ভাইয়ের হাত দিয়ে সে মাসে মাসে টাকা পাঠিয়েছে। আশালতা দু’বছর আগে চিঠিতে একটা ফিরিস্তি দিয়েছিলেন, বাড়িটার জন্য কি কি করতে হবে। জ্যোতি তার পরের ভাই লাটুকে মুখেই বলে দিয়েছিল, এই বাড়িতে থাকার কোন ইচ্ছেই তার নেই। সুতরাং মুখে রক্ত তুলে ফুটবল খেলে যে টাকা আয় করছে, সেই টাকা এই বাড়ির পিছনে সে ঢালবে না। তাছাড়া বাড়িটাও তার নিজের নয়, বাবার। অন্য ছেলেদেরও অংশ আছে। সে একা টাকা খরচ করে দোতলা তুলবে আর অন্য ভাইয়েরা ভোগ করবে, তা হতে পারে না। একটা কথা শুধু সে বলেনি, মিনিস্টারকে ধরে পাতিপুকুরে সে পাঁচ কাঠার সরকারী প্লট কিনেছে। সেখানেই নিজের বাড়ি করবে।
একটা লীগ ম্যাচের পর ক্লাব তাঁবুর বাইরে চেয়ারে বসে দুই ভাই কথা বলছিল। লাটু চুপ করে মেজদার কথাগুলো শুনে যায়, ঘাসের দিকে চোখ রেখে। জ্যোতিকে তার ভাইয়েরা মেজদা বলে। বড় ভাই কৈশোরে গঙ্গায় ডুবে মারা গেছে। ”আমার যা কর্তব্য আমি তা করেছি, করেও যাচ্ছি। তোকে একটা চাকরিতে ঢুকিয়ে দিয়েছি, মাসে ছশো টাকা এই বাজারে এমন কিছু খারাপ নয় ক্লাস নাইন পর্যন্ত পড়া একটা ছেলের পক্ষে। ছোটুর পড়ার খরচ আমার। যতদিন পড়াশুনো চালাবে ততদিন চালাব। বাবা—মা যদ্দিন বাঁচবে আমি দেখব। মাসে মাসে হাজার টাকা দিচ্ছি…এরপর আর আমি কি করতে পারি? বাড়িটা দোতলা করে দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। ছোটখাটো মেরামতি, নতুন পায়খানা, জলের কল, ইলেকট্রিক সবই তো করে দিয়েছি। তুই আর ছোটুই বাড়িটা ভোগ করবি, আমি ওখানে থাকব না। যা করার তোরা দুজনই করবি।”
সারথি সংঘে এসে জ্যোতি প্রথম বছরটা কাটিয়েছে ক্লাবের তালতলার মেসে, সাতটি খাট পাতা লম্বা ঘরটায়। দ্বিতীয় বছরেই দোতলায় উত্তরপ্রান্তের ঘরটা একা থাকার জন্য তাকে দেওয়া হয়, যখন শৈবাল মণ্ডল মোহনবাগানে সই করে সারথি ছেড়ে চলে যায়। জ্যোতির মত নবাগতকে একবছর খেলিয়েই পঁচাত্তর হাজার টাকা দেওয়া হবে শুনে স্টপার ব্যাক শৈবাল নব্বই হাজার চেয়েছিল। জেনারেল সেক্রেটারি সরোজ সেন রাজী হননি। বরং বলেছিলেন, ”শৈবাল, এ বছর যা পেয়েছে, সেই পঁচাত্তরই দেব সামনের সিজনে, তাতে যদি থাকতে রাজী থাকে তো থাকবে, নইলে মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল কি যুগের যাত্রী যেখানে যেতে চায় যেতে পারে।” শৈবালকে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে শুনে বিক্ষোভ, ঘেরাও, হাতাহাতি হয়েছিল। সারথির প্রেসিডেণ্ট সন্তাোষ ভট্টাচার্য আর ট্রেজারার কিরণ ঘোষের জোটের লোকদের সঙ্গে সরোজ সেন আর ফুটবল সেক্রেটারি চঞ্চল মৈত্র জোটের লোকেদের। যারা হাতাহাতি, খেস্তাখেস্তি করেছিল তাদের অবশ্য ‘লোক’ বললে ঠিক পরিচয়টা বোঝান যায় না। কলকাতার প্রত্যেক ফুটবল ক্লাবের কর্তা—ব্যক্তিরা ক্ষমতা হাতে রাখার ও নানান ব্যক্তিগত স্বার্থ পূরণের জন্য নিজস্ব দল পোষে।
ট্রান্সফারের সময় ফুটবলার গায়েব করা থেকে শুরু করে, গ্যালারিতে মারপিট, ক্লাবের বিপক্ষ গোষ্ঠীর পেটোয়া খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধে সমর্থকদের উস্কে দিয়ে চড়—ঘুঁষির শিকার বানিয়ে নার্ভাস করে দেওয়া, সাংবাদিকদের অকথ্য নোংরা ভাষায় গালিগালাজ করে যথার্থ রিপোর্ট লেখা বন্ধ করার চেষ্টা—এইসব কাজ করার জন্য অল্পবয়সী, বেকার, অশিক্ষিত, কিছু ছেলে পোষা হয়। এরা ক্লাবের সাফল্যের জন্য যে কোন কাজ করতে পারে, এমনকি প্রাণও দিতে পারে। ক্লাবের খেলা দেখার জন্য অবাধে মেম্বার গেট দিয়ে মাঠে ঢোকার পুরস্কারটুকু ছাড়া এরা আর কিছু পায় না। শৈবালকে নিয়ে ক্লাব যখন তপ্ত তখন সরোজ সেন শুধু একটা কথাই অরবিন্দ মজুমদারকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ”আপনার এই জ্যোতির্ময় বিশ্বাস ছেলেটা সম্পর্কে যা বলেছেন, তা ঠিক তো? শেষকালে ডোবাবে না তো?” অরবিন্দ মজুমদার জবাব দিয়েছিলেন, ”পঁয়ত্রিশ বছর মাঠে আসছি, খেলেছি সব কটা বড় ক্লাবে, কোচ করছি এগারো বছর, ভারতের হেন ট্রফি নেই যা আমি জিতিনি। কিছুটা ফুটবলার চেনার ক্ষমতা আমার হয়েছে। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, জ্যোতি আপনাকে ডোবাবে না, ভাসাবে।” সেই মরশুমে মোহনবাগান লীগ চ্যাম্পিয়ন হল কিন্তু একটি মাত্র ম্যাচই তারা লীগে হেরেছিল, সারথির কাছে দু গোলে। দুটো গোলই জ্যোতির। খেলার পর টেণ্টে নিজের কামরায় জ্যোতিকে ডাকিয়ে এনে সরোজ সেন বলেন, ”তোমার নাকি মোটর সাইকেল চড়ার খুব শখ?” অরবিন্দ মজুমদার তখন সেখানে বসে। মিটমিট হাসছিলেন। জ্যোতি তার এই শখের কথা একবারই শুধু অরবিন্দদাকে বলেছিল সিজনের প্রথম দিকে। সরোজদার কানে কথাটা তোলা তাহলে ওরই কাজ। ”আমি কালই বুক করব, রয়্যাল এনফিল্ড, বুলেট। দু গোলের জন্য দু চাকার, যেদিন চার গোল দেবে মোহনবাগান কি ইস্টবেঙ্গলকে কি যাত্রীকে সেদিন চার চাকার গাড়ি…।”
