খেলা যখন চলছে উড়োন গাছের ডালে বসেছিল। হাফ টাইমে সে উড়ে মাঠের উপর চক্কর দিতে লাগল। সারা মাঠ মুখ তুলে হাঁ করে পাখি দেখতে লাগল।
কে একজন বলল, ”পাখিটা পয়মন্ত। দেখবি ধানকুড়ি জিতবে।”
আর একজন বলল, ”কালীর পোষা পাখি। দেখতে অদ্ভুত সুন্দর তাই না?”
”ওটা কী পাখি বলুন তো? অনেকটা চিল আর ঈগলের মাঝামাঝি দেখতে।”
উড়োনের জাত কী, তাই নিয়ে আলোচনা হতে হতেই দ্বিতীয়ার্ধের খেলা শুরু হয়ে গেল। কালীর ডান কবজিতে একটা ব্যান্ডেজ। উড়োন গাছের ডালে। নুরুস্যার ছাপা স্কুলের প্যাড বার করেছেন। জঘন্য রেফারিং সম্পর্কে প্রতিবাদ জানাবেন বলে। কালীর হাত বেঁটে ছেলেটা যে মাড়িয়ে দিয়েছিল তার দিকে নজর রেখেছিল পাঁচকড়ি। পেনাল্টি বক্সের মধ্যে বল নিয়ে ঢুকে সেই বেঁটে শট নিতে যাবে পাঁচকড়ি পাশ থেকে তার পায়ের গোছ লক্ষ্য করে পা চালাল। ছেলেটি পড়ে গিয়ে ছটফট করতে লাগল। কোনও দ্বিধা না করে রেফারি পেনাল্টি দিলেন। খেলা তখন ০—০। আর মিনিট চারেক বাকি খেলা শেষ হতে।
পেনাল্টি স্পটে বল বসিয়ে ছেলেটি দশ পা পিছিয়ে এসে কালীর মুখের দিকে তাকাল। পা ফাঁক করে দুটো হাত ডানার মতো ছড়িয়ে কালী ডাইনে—বাঁয়ে দুলছে। ছেলেটি ছুটে এসে প্রচণ্ড শট নিল নিচু এবং সোজা। মাঠের সবাই চোখ বন্ধ করে ফেলল। কালী একচুলও নড়েনি। সোজা বলটাকে সোজা শট মেরে ফাঁকা মাঝ মাঠে পাঠিয়ে দিল। শামিম তড়াক করে বল ধরে হাতাখালির জনবিরল রক্ষণ এলাকার দিকে এগোচ্ছে, গোলকিপারও ছুটে পেনাল্টি এলাকার বাইরে এসে গেছে। শামিম তাড়াহুড়ো করে বলটা মারল। গোলকিপার ডান দিকে ঝাঁপিয়ে হাত দিয়ে কোনও ক্রমে আটকাল।
আইন ভেঙে তার এলাকার বাইরে এসে গোলকিপার বলে হাত লাগিয়েছে। ফ্রি কিক দিলেন রেফারি। নুরুস্যার প্যাডের পাতা মুড়ে পাশে রেখে দিলেন। ভাল ফ্রিকিক মারে অমিয়। মারলও এক ডিফেন্ডারের গায়ে লেগে বল কর্নার হয় গেল। রেফারির সঙ্গে দর্শকদের অনেকেই হাত তুলে ঘড়ি দেখলেন। আর বোধহয় এক মিনিট বাকি।
হঠাৎ উড়োন গাছ থেকে ডানা ঝাপটে উড়ল। কর্নার কিক নিতে গেল রতন। বল মারতে যাবে সেই সময় কালী ছুটতে শুরু করল হাতাখালির গোলের দিকে। খেলোয়াড়রা এবং দর্শকরাও অবাক। গোল ছেড়ে গোলকিপারের এ কী পাগলামি! রতন বল মারল। উড়োন উড়ছে কালীর মাথার উপর। লাফিয়ে সে বলে মাথা ছোঁয়াল। গোলার মতো বলটা গোলে ঢুকে গেল। রেফারি বাঁশি বাজিয়ে দু’হাত দিয়ে সেন্টার দেখালেন। তারপরই খেলা সমাপ্তির লম্বা বাঁশি বাজালেন।
মাঠে লোক নেমে এসেছে। কালীকে কাঁধে তোলার জন্য একটা চেষ্টা শুরু হল। নুরুস্যার মন্তব্য করলেন, ”গুড রেফারি।” গোলটা হওয়ার পরই উড়োন উধাও। কোথায় গেল? কালী এই নিয়ে চিন্তিত নয়। সে জানে উড়োন এখন বাঁশের খুঁটিতে বসে। ধান্যকুড়িয়া স্কুল মূলপর্বে উঠল।
শোভাযাত্রা করে কালীকে বাড়ি পৌঁছে দিল স্কুলের ছেলেরা। তাদের মুখে ছিল একটাই স্লোগান ”কিং কিং, কিং কিং, কিং কং।”
কালী যা ভেবেছিল তাই, বাঁশের খুঁটিতে বসে উড়োন আর খুঁটির পাশে টুলে বসে হাবু দারোগা। সুলতা বললেন, ”আর এক গ্লাস দি?” হাবু দারোগা বললেন, ”দিন আপনার ডাবের জল সত্যিই মিষ্টি।”
তখনই হইহই করে ছেলেরা নিয়ে এল ধানকুড়ির কিং কং—কে।
সারথির সারথি
সারথির সারথি – মতি নন্দী – কিশোর উপন্যাস
।।এক।।
”অ্যাঁ, একি!” জ্যোতি আধশোয়া থেকে সিধে হয়ে বসল বিছানায়, খবরের কাগজটা ইঞ্চি চারেক এগিয়ে আনল চোখের কাছে। যেন কাছে আনলেই খবরের সত্যতা আরো ভাল করে যাচাই করা যাবে। মাথামুণ্ডু কিছুই সে বুঝতে পারছে না। অক্ষরগুলো ঝাপসা হয়ে ক্রমশ এগিয়ে এসে আবার হটে যাচ্ছে সর্ষেদানার মত ছোট হয়। তিন চার বার এমনটি হল।
জ্যোতি অন্যমনস্কর মত ডানহাতটা পাশে বাড়াল। হাতের ধাক্কায় নীচু ত্রিপদে রাখা চায়ের কাপটা ছিটকে মেঝেয় পড়তেই সে চমকে তাকাল। কাপটা ভাঙেনি। কোনদিন এমনটা হয় না। আঙুলগুলো অব্যর্থভাবেই কান ধরে কাপটাকে তুলে মুখের কাছে এনে দেয়।
”কি হল জ্যোতি, কি ভাঙল রে?”
ঘরের বাইরে থেকে আশালতা চেঁচিয়ে উঠলেন।
”কিছু না।” অধৈর্য, রুক্ষ স্বরে সে জবাব দিল।
”আজ বাজার যাবি নাকি? কাল যে বললি, এক বেঘৎ লম্বা কই মাছ নিজে গিয়ে কিনবি?”
জ্যোতি কথাগুলোকে গ্রাহ্যে না এনে খবরের হেডিংটা আবার পড়ল—পতিতাগৃহ থেকে ধৃতদের মধ্যে ফুটবল কোচ।
তার নিজের ষাট বছর বয়সী বাবা বলাৎকার করে ধরা পড়েছে, এমন একটা খবর যেন সে শুনল, জ্যোতি সেই রকমই বিমূঢ় বোধ করেছে। অবিশ্বাস্য, তার কাছে একদমই অবিশ্বাস্য যে অরবিন্দদা, যিনি তার বাবার থেকে দশ বছরের ছোট, রিপন স্ট্রীটে এক বেশ্যাবাড়িতে যেতে পারেন।
আদালতের সংবাদদাতার খবরটায় বিশেষ বিস্তারিত নেই। অরবিন্দদা কোন ক্লাবের কোচ তারও উল্লেখ নেই। শুধু বলা হয়েছে—রিপন স্ট্রীটে জনৈকা মিসেস সিকুয়েরার বাড়িতে বুধবার রাত্রে পুলিশ হানা দেয়। সেখানে বদ্ধ ঘর থেকে অশালীন অবস্থায় পাওয়া চারজোড়া নারী ও পুরুষকে পাকড়াও করে তারা থানায় নিয়ে যায়। ধৃতদের মধ্যে আছে এক ফুটবল কোচ অরবিন্দ মজুমদার। পুলিশ গৃহকর্ত্রীকেও গ্রেপ্তার করেছে। ধৃতদের বৃহস্পতিবার আদালতে হাজির করা হয়। ব্যক্তিগত জামিনে তারা ছাড়া পেয়েছেন।
