তিনি জিপ থেকে নামতেই ড্রাইভার বাদে বাকিরাও নামল। তারা দুই সারি ছেলের মধ্যে দিয়ে হেঁটে এগোতে লাগল। ড্রাইভার জিপটা ঘোরাবার জন্য পিছনে হটতে গিয়ে দেখল সার দিয়ে খালি ভ্যানরিকশা দাঁড়িয়ে, প্রথম দুটো রিকশায় ছোট গ্যাঁড়া আর অসিত।
”এই রিকশা হটা।” ড্রাইভার খেঁকিয়ে উঠল।
”হটাব কোথায়, পেছনে তাকিয়ে দেখো না!” অসিত বলল।
ড্রাইভার মুখ উঁচু করে তাকিয়ে দেখল অন্তত কুড়িটা রিকশা পর পর দাঁড়িয়ে। ড্রাইভার হতাশ হয়ে মাথা নেড়ে বলল, ”মতলবটা কী বল তো?”
”তোমার বড়বাবু রিকশার দুটো চাকা নিয়েছে, আমরা তোমার গাড়ির চারটে চাকা নোব।” ছোট গ্যাঁড়া হাতে তুলে ধরল এক হাত লম্বা লোহার তীক্ষ্ন মুখ একটা গজাল। অসিত তুলে দেখাল একটা করাত।
ড্রাইভার আর কথা না বাড়িয়ে বড়বাবুকে খবর দিতে ছুটল। হনহনিয়ে হেঁটে হাবুদারোগা তখন পূর্বাচল ক্লাব পর্যন্ত পৌঁছেছেন, ছাত্রদের মিছিলকে পিছনে ফেলে।
”স্যার স্যার”। বলে চিৎকার করতে করতে ড্রাইভার ছুটে এল। ”বিপদ স্যার। অসিত আর ছোটগ্যাঁড়া কালকের বদলা নিতে জিপের চাকা ফাঁসাচ্ছে, কাটছে।”
”জিপ ব্যাক করে থানায় চলে যাও।”
”যাবার উপায় নেই স্যার, রাস্তা জ্যাম করে রেখেছে গোটা কুড়ি—তিরিশ ভ্যানরিকশা।”
হাবু ঠোঁট কামড়ালেন। ”প্ল্যান করে সরকারি কাজে বাধা সৃষ্টি করছে।” রাইফেলধারী দু’জনকে বললেন, ”এখুনি গিয়ে রাস্তা ক্লিয়ার করে দাও।”
”স্যার, যদি ক্লিয়ার না হতে চায়।”
”ফায়ার করবে।”
”ফায়ারিং—এর অর্ডার কে দেবে স্যার। আপনি তো এখানে।”
”নিজেরা দেবে।”
”না, স্যার, আপনি অর্ডার না দিলে ফায়ার করতে পারব না। শেষে চাকরি নিয়ে টানাটানি হোক আর কী!”
তিক্ত মুখে হাবুদারোগা বললেন, ”সিপাইরা পিছনে আসছে। তাদের বলো বড়বাবু অর্ডার দিয়েছেন লাঠি চার্জ করতে। রাস্তা ক্লিয়ার হলে জিপটা থানায় নয় এখানে নিয়ে আসবে। ছেলেদের মিছিল তো মাঠে চলে যাবে। আমি কালী মণ্ডলকে আগে অ্যারেস্ট করে জিপে তুলব তারপর পাখিটাকে—যাও যাও, কুইক।”
রাস্তা থেকে বাঁ দিকে বেঁকে নিমগাছটাকে ডাইনে রেখে অন্তত তিরিশ গজ মাটির রাস্তা ধরে গেলে সুলতা মণ্ডলের বাড়ির বাইরের উঠোন। ছাত্রদের সারি সোজা মাঠের দিক না গিয়ে নিমগাছের পাশ দিয়ে সুলতা মণ্ডলের বাড়ির দিকে বেঁকে গেল। বাইরের উঠোনে বাঁশের খুঁটির উপর বসে রয়েছে উড়োন, খুঁটির পাশে দাঁড়িয়ে সুলতা, ধানু আর খেলার ড্রেস করে কালী। উড়োন ব্যস্ত উদ্বিগ্ন চোখে এতগুলো ছেলেকে দেখে উড়ে পালাবার উদ্যোগ নিচ্ছে।
”এই উড়োন বসে থাক।” কালী থমকে উঠল।
ছাত্ররা নিঃশব্দে গোল হয়ে খুঁটিটাকে ঘিরে দাঁড়াল। কম করে দশ সারি ছেলে। হাবুদারোগা এসে হতভম্ব। পাখিটা দেখতে পাচ্ছেন, কালীকেও। জাল হাতে জেলে তাঁর পাশে। তিনি বললেন, ”এখানে থেকে জাল জুড়ে পারবে ওটাকে ধরতে?”
”না দারোগাবাবু, আর একটু কাছে যেতে হবে।”
”ঠিক আছে, আমার পেছনে এসো।” হাবুদারেগা রাস্তা বার করার জন্য ছেলেদের ধাক্কা দিয়ে এগোতে যাওয়া মাত্র ”পিপ পিপ পিইইপ” হুইসল বেজে উঠল। ছেলেরা মুহূর্তে হাবুদারোগাকে ঘিরে শুয়ে পড়ল।
”এখন তো আমিই বিপন্ন প্রজাতির হয়ে গেলুম।” বড়বাবু কাকে শুনিয়ে বললেন কে জানে।
ধানু বলল, ”কালী, এখন মাঠে যেতে হবে। উড়োনকে কোলে করে নে।”
কালী ”আয়, আয়” বলে মাটিতে চাপড় দিল। খুঁটির উপর থেকে উড়োন ঝপ করে মাটিতে নেমে এল। কালী দু’হাতে তাকে তুলে বুকের কাছে ধরে রইল।
ঘেরাও করে শুয়ে থাকা ছেলেদের মাঝে দাঁড়িয়ে হাবুদারোগা দেখলেন, কালীর কোলে চড়ে বিরল বিপন্ন সিন্ধু—গরুর ফুটবল খেলা দেখতে রওনা হল।
”ও ধানুদা, কতক্ষণ শুয়ে থাকব, আমরা খেলা দেখব না?”
”হুইসল বাজলে ছেড়ে দিবি।”
পাঁচ মিনিট পর কালী যখন উড়োনকে কোলে নিয়ে মাঠে পৌঁছেছে তখন নিমগাছের তলা থেকে ‘পিইইইইপ’ শোনা গেল, স্কুল ছুটির ঘণ্টা শুনে ছেলেরা যেমন কলরব করে ওঠে, সেইভাবে ঘেরাওকারীরা হইহই করে লাফিয়ে উঠে ছুট লাগাল মাঠের দিকে।
হাবুদারোগা নিমগাছের তলায় হুইসল মুখে লোকটির দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, ”নুরমহম্মদ, চক্রান্তটা তা হলে তোমার।”
কালী উড়োনকে ছেড়ে দিতেই সে অশ্বত্থ গাছে নীচের ডালটিতে গিয়ে বসল। মাঠে দুটো টিমই নেমে ওয়ার্ম—আপ করছে। মাঠ ঘিরে হাজার পাঁচেক লোক। ভিড়টা দু’দিকের গোলের পিছনে ও দু’পাশে, খুব কাছের থেকে ওরা কালীকে দেখতে চায়।
হাতাখালির বেশিরভাগ ছেলেই আকারে বড়। বয়সও বেশি। ওদের দু’তিনজন কলকাতার ময়দানে খেলে। হাতাখালি স্কুলই আজ ফেভারিট। নুরুস্যার গত তিন দিন ধরে সকালে প্র্যাকটিসে বলেছেন, ”মনে আছে ভারত বিশ্বকাপ জিতেছিল। লয়েডের টিমে তো বাঘা—বাঘা ব্যাটসম্যান আর ফাস্ট বোলার ছিল, ওরাই তো ফেভারিট। কিন্তু কী হল বল তো। শেষ পর্যন্ত তো কপিলরাই জিতল। কেন জিতল? এগারো জনই জান লড়িয়ে দিয়েছিল। ভারত রান কম করেছিল তাতে কী, একটা ক্যাচও কেউ ফসকায়নি। বাউন্ডারি লাইন পর্যন্ত তাড়া করে বল ধরেছে। ওদের মতো তোরাও বিশ্বাস কর আমরা জিতছি, জিতব। হাতাখালি তো রিয়েল মাদ্রিদ নয়। পজিটিভ চিন্তা কর।”
ধান্যকুড়িয়া যে চিন্তাই করে থাকুক খেলার প্রথম দশ মিনিট পায়ে বল ঠেকাতে পারেনি। তার মধ্যে চারটে শট, দুটো হেড কালী দু’হাতে চাপড়ে, ঘুঁষি মেরে, হাঁটু দিয়ে থামিয়ে নিশ্চিত গোল খাওয়া থেকে ধানকুড়িকে রক্ষা করে। অবশ্য হাফ টাইমের আগে তারা হাতাখালির কাছ থেকে খেলার দখল কিছুটা নিয়ে নেয়। সেখানে বল সেখানেই ধানকুড়ির কেউ না কেউ বল ছিনিয়ে নেবার জন্য হাজির। এই পদ্ধতি নিয়ে তারা ব্যতিব্যস্ত করে দেয় হাতাখালিকে। প্রচুর ফাউল হতে থাকে। একবার গোলের মুখে উঁচু বল কালী ধরার জন্য লাফিয়ে উঠতেই কে একজন তার পেটে ঘুঁষি মারল। সে জমিতে পড়ে গিয়ে ফসকানো বলটা আঁকুপাকু করে ধরতে হাত বাড়াল। হাতটা মাড়িয়ে দিল একজন। কালী হাতটা দু’বার ঝেড়ে নিল মাত্র।
