সুলতা ডাব আনতে নিজেই ভিতরে চলে গেলেন। প্রহ্লাদ তখন কথা শুরু করল কালীর সঙ্গে।
”শুনলুম তুমি নাকি দারুণ গোলকিপারিং করো? কাল দেখব কেমন তুমি খেলো।”
”খেলব কী করে, উড়োনকে তো হাবুদারোগা অ্যারেস্ট করে নিয়ে যাবে।”
”যাক না নিয়ে, তাতে খেলতে অসুবিধের কী?”
প্রহ্লাদের কথা শুনে রাগে থমথমে হয়ে গেল কালীর মুখ। সে উঠে দাঁড়াল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ”যদি আমি সত্যিকারের কিংকং হতুম তা হলে থানাটাকে গুঁড়িয়ে দিতুম।”
কথাটা বলেই সে বাড়ির মধ্যে চলে গেল। সুলতা ডাব হাতে ঝুলিয়ে এলেন। প্রহ্লাদ দেখেই বলল, ”মাসিমা আপনি তো পাঁচটা দিতে রাজি হলেন।”
”আর একটা কাল এসে নিয়ে যেয়ো, এই চারটেই ঘরে ছিল।”
রাতে কালীর ঘুম আর আসছে না। মাথার মধ্যে শুধু পুলিশের বারো জোড়া বুটের শব্দ খট খট করে এগিয়ে আসছে। মাথার উপর দু’পাক ঘুরিয়ে কে যেন খ্যাপলা জাল ছুড়ল উড়োনকে লক্ষ্য করে। চমকে উঠল কালী। ধড়মড় করে বিছানা থেকে উঠে সুইচ টিপে আলো জ্বেলে দেখল ঝুড়ির উপর গুটিসুটি হয়ে বসে রয়েছে উড়োন, মাথাটা সামনে ঝোঁকানো। ঘুমোচ্ছে। কালী আশ্বস্ত হয়ে আবার শুয়ে পড়ল আলো নিভিয়ে। আর একবার তার মনে হল, খোলা জানলায় কেউ দাঁড়িয়ে, মুখটা যেন হাবুদারোগার। ভয়ে তার বুকের মধ্যেটা হিম হয়ে গেল। কোনওক্রমে সে ক্ষীণ স্বরে বলল, ”কে?”
”আমি হাবুদারোগা।”
”কী দরকার আপনার?”
”উড়োনকে ধরতে এসেছি।” বলেই হাবুদারোগা জানলা দিয়ে ঘরের মধ্যে টর্চের আলো ফেলল। কালী মুখ ফিরিয়ে উড়োনকে দেখার জন্য তাকাল। আশ্চর্য, উড়োন ঝুড়ির উপর নেই।
কোথায় গেল পাখিটা, একটু আগেও তো ঝুড়ির উপর ছিল, কোথায় গেল? হাবুদারোগা জানলা দিয়ে হাত বাড়িয়ে কালীর চুল মুঠোয় ধরে ঝাঁকাতে লাগল।
”বলো, বলো, কোথায় গেল উড়োন?”
”লাগছে, ছাড়ুন চুল, লাগছে। উড়োন এখন খালপারের মাঠে অশথ গাছটায় বসে আছে। আমি মাঠে গেলে ও আমার মাথার ওপর চক্কোর দিয়ে উড়বে। আপনি কি ওকে অ্যারেস্ট করবেন?” টর্চের আলো মুখের উপর পড়ায় কালীর চোখ আধবোজা। সে মুখটা পাশে ঘুরিয়ে বলল, ”উড়োনকে আপনি ধরতে পারবেন না। ও বিরল পাখি, ও এখানকার নয়, উড়োন সিন্ধু—গরুড়, আমার বন্ধু। আমি কিংকং, আমিও এখানকার নই। আমরা দু’জনে আকাশে উড়ে যাব কেউ আমাদের ধরতে পারবে না, আপনিও নয়।”
”বটে! দেখা যাক ধরতে পারি কি না।” হাবুদারোগা চুলের মুঠি ছেড়ে দিয়ে বলল, ”কাল দেখা হবে।”
কালী বিছানায় উঠে বসে জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল। ফাঁকা মাঠ, ঝাঁকড়া বটগাছ, একাদশীর চাঁদের আলো, নিঝুম চরাচর। সবই তার পরিচিত কিন্তু হাবুদারোগা এর মধ্যে মিলিয়ে গেল কী করে। সে আলতো করে মাথার চুল টানল। ঝুড়িতে সড়সড় শব্দ হল। কালী ফিসফিস করে ডাকল, ”উড়োন।” খড়খড় শব্দ জোরে হল। ”কাল উড়ে যাব তোর সঙ্গে।”
প্রহ্লাদ বলেছে, বড়বাবু তিনটের সময় বারো জনকে সঙ্গে নিয়ে আসবে। কালী প্রতিদিনের মতো উড়োনকে ছেড়ে দিতেই সে প্রথমে বাঁশের খুঁটির উপর কিছুক্ষণ বসল। তারপর উড়ে গেল দক্ষিণ আকাশে। দেখে কালী ও সুলতা হাঁফ ছাড়লেন। ধানু এসে উপস্থিত।
”কালী আজ আর লেখাপড়া নয়। জীবনের প্রথম বড় ম্যাচ। হাতাখালি টিমে তিন—চারটে বয়স্ক ছেলে আছে, কলকাতার ময়দানে সেকেন্ড ডিভিশনে খেলে। এসব নিয়ে তোকে মাথা ঘামাতে হবে না, যেভাবে খেলিস সেইভাবেই খেলবি। রাতে ভাল ঘুম হয়েছে।”
”হয়েছে।”
”সাড়ে তিনটের সময় টিম মাঠে যাবে। ড্রেস করে রেডি থাকিস। দিদিমা, আমি একটু ঘুরে আসছি।”
ধানু স্কুটার নিয়ে বেরিয়ে গেল।
হবিবুল মোল্লা ঠিক তিনটেয় থানা থেকে জিপে উঠলেন। পিছনে রাইফেল হাতে দু’জন পুলিশের সঙ্গে খ্যাপলা জাল নিয়ে একজন বসে, তার পেশা মাছ ধরা। মেজোবাবুর আজ সাপ্তাহিক ছুটির দিন। থানা দেখার জন্য সেজোবাবু রয়ে গেছেন। দশ জন লাঠিধারী পুলিশ জিপের পাঁচ মিনিট পর হাঁটতে হাঁটতে রওনা দিল।
জিপ বড় সড়ক থেকে মাঝারি একটা রাস্তা ধরবে, তারপর স্কুলবাড়ির পাশ দিয়ে বাজার ঘেঁষে শীতলা মন্দিরের পাশ কাটিয়ে মিউনিসিপ্যালিটির অফিস আর পূর্বাচল ক্লাবের সামনে দিয়ে যে রাস্তাটা দক্ষিণে গেছে সেটা দিয়ে হাবুদারোগার জিপকে সুলতা মণ্ডলের বাড়িতে পৌঁছনোর জন্য যেতে হবে। মোটরে তিন মিনিট, হেঁটে দশ মিনিটের পথ।
জিপ যখন স্কুল বাড়ির কাছাকাছি তখনই ”পিঁইইপ পিপ পিপ” আওয়াজ হল হুইসলের। ঠিক এইভাবেই হুইসলের আওয়াজ করে নুরুস্যার মাঠে ফুটবল প্র্যাকটিস করান। স্কুলের উঠোনে জমা হওয়া শ’তিনেক ছেলে হুইসলের আওয়াজ শোনামাত্র সার দিয়ে, স্কুল গেট দিয়ে দুই সারিতে বেরিয়ে আসতে শুরু করল।
ব্রেক কষে জিপ দাঁড়িয়ে পড়ল। সামনে রাস্তা জুড়ে দুই সারিতে চলেছে ছেলেরা, তাদের হাতে কাঠিতে লাগানো হাতে লেখা পোস্টার। নানানা রকম স্লোগান তাতে লেখা, যেমন—”পুলিশের অন্নায় জুলুম চলবে না।” ”উড়োন বিপন্ন পাখি নয়/ওকে স্বাধীনতা দেওয়া হোক।” ”কালীকিঙ্কর জিন্দাবাদ/আজ কালী খেলবেই খেলবে।” ”হাবুদারোগার কালো হাত/ভেঙে দাও গুড়িয়ে দাও।”
হাবুদারোগা মুখ বার করে দেখে বিড় বিড় করলেন, ”বড়দের দেখে শিখেছে। এই জিপ রাখ। হেঁটেই যাব।”
