হাবুদারোগা ধানুকে বললেন, ”কালীকে গিয়ে বল, পাখিটাকে থানায় দিয়ে যেতে।”
”থানায় রাখবেন কোথায় চাচা?”
হাজত এখন খালি রয়েছে ওখানেই রাখব।”
আর কথা না বলে ধানু বেরিয়ে এল থানা থেকে। স্কুটারে কিছুটা যেতেই দেখল ভ্যানরিকশা দুটো হাতে করে টানতে টানতে চলেছে অসিত আর ছোট গ্যাঁড়া। ধানুকে হাত তুলে থামিয়ে বলল, ”বড়বাবুকে একটা শিক্ষে দিতে হবে। কী ক্ষতিটা আমাদের করে দিল দেখেছিস।” ধানু দেখল অসিতের চোখ দিয়ে আগুন বেরোচ্ছে।
”দেখব পাখিটাকে কী করে অ্যারেস্ট করে। মামদোবাজি করে, আমি দেখাব কে মামদো, আমি না হাবুদারোগা।” ছোট গ্যাঁড়ার কথাগুলো হাবুদারোগার দেহের খণ্ড খণ্ড মাংসের মতো তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল। হিংস্রমুখে সে রিকশার সিটে ঘুঁষি বসাল।
ধানু বলল, ”আমি তো অবাক হয়ে গেলুম। ওইভাবে যে সাইকেলের টায়ার ফাঁসিয়ে দেবে কল্পনাও করতে পারি না। অথচ লোকটা সৎ, আইন মেনে কাজ করে, ডিসিপ্লিনড। ওর মনের মধ্যে যে এমন একটা কসাই লুকিয়ে আছে জানতুম না।”
”তুই জেনে রাখ ধানু, যা বললুম, তাই করব। চল অসিত, সবাইকে গিয়ে চাকাদুটো দেখাই।”
ধানু এবার নুরুস্যারের বাড়ির দিকে রওনা দিল, উনি কথা দিয়েছেন উড়োন কালীর কাছেই থাকবে, হাবুদারোগা ধরতে পারবে না। কী করবেন নুরুস্যার যে জন্য উড়োনকে ধরা যাবে না? সেটা এখন তাকে জানতে হবে।
.
খেলা শনিবার, তার আগের দিন নুরমহম্মদ ওরফে নুরুস্যার বিজন, ভোলা, অমিয়, শামিম, পাঁচকড়ি এবং আরও দু’জনকে সঙ্গে নিয়ে ক্লাসে ক্লাসে ঘুরে তিন মিনিটের একটি বক্তৃতা দিলেন, তার শুরুটা ছিল এই রকম।
”তোমরা নিশ্চয় চাও তোমাদের স্কুলের গৌরব বাড়ুক, ঠিক কি না? এই যে কালকের ফুটবল ম্যাচ এটা যদি জিতি তা হলে জেলা চ্যাম্পিয়ন হবার পথে আমরা প্রথম ধাপটা পেরোব, এটা গৌরব অর্জনের জন্য উদ্বুদ্ধ করবে আমাদের। আর এই জয়ের জন্য আমরা নির্ভর করছি আমাদের গোলকিপার কালীকিঙ্করের উপর।” এইবার ক্লাসের ছেলেরা ”কিংকং, কিংকং” বলে ফিসফিস শুরু করে দেয়।
”শোনো মন দিয়ে, কালী বলছে তার পোষা পাখি উড়োনকে অ্যারেস্ট করবে দারোগা হবিবুল মোল্লা, কেন না উড়োন বিরল বিপন্ন প্রজাতির, কিন্তু আমরা মনে করি সে বিরল বটে, কিন্তু বিপন্ন নয়, উড়োনকে যদি দারোগা ধরে, কালী বলেছে তা হলে সে খেলবে না। সুতরাং তাকে অ্যারেস্ট করা চলবে না। এবার আমাদের কী করতে হবে সেটা এরা তোমাদের বলে দেবে।” নুরুস্যার আঙুল দিয়ে পাঁচকড়ি , অমিয়দের দেখিয়ে তাঁর বক্তৃতা শেষ করে অন্য ক্লাসে চলে যান। সেখানেও আবার একই বক্তৃতা তিনি দেন।
হাবুদারোগার ভয়ে কালী হাফ ছুটি হওয়ামাত্র বাড়ি ফিরে বাইরের উঠোনের বাঁশের খুঁটির উপর উড়োনকে বসে থাকতে দেখল। সুলতা খুঁটির পাশে বসে কুড়োনকে তখন কাঁঠালপাতা খাওয়াচ্ছিলেন। কালীকে দেখে বললেন, ”উড়োনকে বসিয়ে রেখে আমিও বসে আছি। দারোগাকে দেখলে ওকে উড়ে যেতে বলব। দেখি কী করে ওকে ধরে।”
”দিদিমা, উড়োনের বদলে তখন তো আমায় ধরবে।”
”ধরুক না। উড়োনের কথা এখন ধানকুড়ির সবাই জেনেছে। চণ্ডীউকিলের বউ এসেছিল ওকে দেখতে। বললাম দারোগার কথা। তো বউমা বলল, ওরেন্ট ছাড়া কাউকে অমনি অমনি হাজতে ভরা যায় না, ভরলে দারোগাকে কোর্টে টেনে নিয়ে গিয়ে হাকিমের ধমকানি খাওয়ানো যাবে। ওর স্বামীকে উকিল দিলে সে ব্যবস্থাও হবে।”
কালী কিছু বলল না। উড়োনকে দু’হাতে তুলে ঘরে নিয়ে গিয়ে তক্তপোশের ধারে উপুড় করা ঝুড়িটার উপর বসিয়ে দিয়ে বলল, ”চুপ করে বসে থাক। হাবুদারোগা যেন দেখতে না পায়। দেখলেই ধরে নিয়ে যাবে।”
আজ কালী খালপাড়ের মাঠে প্র্যাকটিসে গেল না। বাইরের উঠোনে বসে দিদিমার সঙ্গে এটা—ওটা নিয়ে কথা বলতে লাগল। তখনই হাজির হল প্রহ্লাদ।
”কী ব্যাপার পেল্লাদ, ডাব খেয়ে বউ কী বলল?” সুলতা একটু বাঁকাসুরে বললেন।
”ডাব খেয়ে তো বাপের বাড়ির জন্য বউয়ের মন কেমন করতে লেগেছে। এমন মিঠে জলের ডাব ওর বাপের বাড়ির একটা মাত্তির গাছেই হয়। সেই গাছটার কথা খালি মনে পড়ছে আর চোখ দিয়ে জল ঝরছে।”
”জল ঝরছে আর বলছে আরও দুটো খাব, কেমন? ঠিক বলেছি?” সুলতা হাসি চেপে চোখ পিট পিট করে বললেন।
”আপনি জানলেন কী করে মাসিমা, বউ আরও দুটো খেতে চাইছে?”
”জানি, জানতে হয়। দুটো কেন চারটে ডাব দোব, এবার বলো তো, তোমার বড়বাবু কী মতলব ভেঁজেছে? উড়োন আর কালীকে কাল কখন ধরতে আসবে?”
প্রহ্লাদ ডান হাতের পাঞ্জা দেখিয়ে বলল, ”চারটে নয় পাঁচটা ডাব।”
”ঠিক আছে, পাঁচটা।”
এধার ওধার তাকিয়ে গলা নামিয়ে প্রহ্লাদ বলল, ”ঝড়খালিতে পাখি ধরার লোক আছে তাকে আনতে কনস্টেবল পাঠিয়েছে বড়বাবু। কাল চারটের সময় খেলা, বড়বাবু তিনটের সময় বারো জনকে নিয়ে আসবে, তাদের তিন জনের সঙ্গে আর্মস থাকবে, মাছ ধরার খ্যাপলা জাল আজ থানায় আনা হয়েছে। সবাইকে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে পাখির গায়ে আঁচড়টি যেন না পড়ে। বিরল প্রজাতির বিপন্ন পাখি বলে কথা।”
শুনতে শুনতে সুলতার বুক শুকিয়ে এল। এ তো বাড়িতে ডাকাত পড়ার থেকেও ভয়ংকর ব্যাপার।
”মাসিমা এবার আমি যাব, পাখিটা আছে কি না দেখতে পাঠিয়েছিল, গিয়ে বলব এখনও ফেরেনি সন্ধের সময় ফিরবে।”
