এইসব শুনে ধানু তখনি বেরিয়ে পড়ল স্কুটারে, সে গেল থানায়। হাবুদারোগা এই সময় থানায় থাকেন। ধান্যকুড়িয়া থানাটি বেশ বড়। মেজোবাবু, সেজোবাবুসহ আঠারোজন কর্মী। ধানু যখন পৌঁছল হাবুদারোগা তখন মেজোবাবুকে বকছিলেন।
”দুটোকে ধরে এনে আবার ঝামেলা বাড়ালে কেন, আচ্ছাসে পিটিয়ে ছেড়ে দিতে পারতে তো। এখন তো ওদের নেতারা এসে হম্বিতম্বি করে মাথা খারাপ করে দেবে।”
”স্যার, যা পেটাবার পিটিয়েছি। মানবাধিকার এক ইঞ্চিও লঙ্ঘন করিনি। একটা ভোজালি আর পাইপগান ছাড়া আর কিছু পাইনি। এই দেখুন স্যার।”
ধানু দেখল টেবলে রাখা অস্ত্র দু’টি। যে দু’টি ছেলে দাঁড়িয়ে বড়বাবুর টেবলের পাশে গোঁজমুখ করে তারা ধানুকে চেনে, পাড়ারই ছেলে এবং ভ্যানরিকশা চালায় সকাল—সন্ধ্যায়, একজনের নাম অসিত, অন্যজনের নাম ছোট গ্যাঁড়া। স্ট্যান্ডে আগে—পরে রিকশা রাখা নিয়ে অনেকদিনের ঝগড়া, এজন্য মারপিট প্রায়ই হয়, আজও হয়েছিল। হাবুদারোগা কড়া চোখে প্রথমে দু’জনকে দেখে নিয়ে তারপর ধানুকে দেখলেন।
”তুই কী কত্তে এখন এসেছিস? কেমিস্ট্রি খুব কঠিন সাবজেক্ট, দিন—রাত বই মুখে নিয়ে পড়ে থাকতে হয়। বসিরকে তো দেখি এখন থেকেই মোটা মোটা বই কিনেছে। ডাক্তারি পড়ানোর খরচ যে কত এইবার মালুম হচ্ছে। বল কী বলবি?”
জয়েন্ট এন্ট্র্যান্স পাশ করে বসির বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয়েছে, সেখানেই থাকে। ধানু বলল, ”চাচা, পাখিটা বিরল প্রজাতির ঠিকই, এর নাম সিন্ধু—গরুড়, আপনি দেখেননি, আমি তিন বছর ধরে দেখেছি।”
হঠাৎ ছোট গ্যাঁড়া বলে উঠল, ”বড়বাবু আমিও দেখেছি। বিউটিফুল দেখতে, গোদা চিলের থেকেও বড়, হাত—পা—বুক ধবধবে সাদা—”
”চুপ কর।” হাবুদারোগার মুখ থেকে বজ্র বেরিয়ে এল। ”তোকে কে দালালি করে কথা বলতে বলেছে?” রক্তচক্ষু এবার সরিয়ে তিনি ধানুর উপর নিক্ষেপ করলেন, ”তিন বছর ধরে দেখছিস তো কী হয়েছে?”
”উড়োন তো বিপন্ন নয় তা হলে ওকে ধরতে চাইছেন কেন, ওকে তো কাকে ঠুকরে মেরে ফেলছিল, কালীই উদ্ধার করে ওকে বাঁচায়। উড়োন একটা আশ্রয় পেয়েছে, ভালবাসা পেয়েছে, ধানকুড়ি জায়গাটা ওর পছন্দ হয়েছে, এখান থেকে অন্য কোথাও ওকে পাঠিয়ে দিলেই বরং উড়োন বিপন্ন হবে।”
”ঠিক বলেছে ধানু। পোষ মেনে যাওয়া পাখি লড়তে পারে না। আমার একটা পোষা চন্দনা ছিল স্যার—!”
”আবার।” হাবুদারোগা বজ্রপাত ঘটিয়ে টেবলের উপর থেকে পাইপগানটা তুলে নিয়ে বললেন, ”আর একটা যদি কথা বলেছিস তা হলে গুলি করে খুলি উড়িয়ে দোব।”
অপারাধীর মতো কুণ্ঠিত স্বরে ছোট গ্যাঁড়া বলল, ”স্যার গুলিটা ফায়ার করে দিয়েছি, ওতে এখন ফাঁকা খোলটাই শুধু রয়েছে।”
হাবুদারোগা সপ্রতিভ গলায় বললেন, ”তাতে কী হয়েছে। এর বাঁটটা দিয়ে তোর খুলি ভেঙে দিতে পারি, তা জানিস?”
”স্যার, মানবাধিকার!” মেজোবাবু ঝুঁকে বড়বাবুর কানে ফিসফিস করে বললেন। হাবুদারোগা পাইপগানটা টেবলে রেখে দিলেন ধীরে ধীরে।
”চাচা পরশুদিন জেলা স্কুল চ্যাম্পিয়নশিপের ম্যাচ, ধান্যকুড়িয়া স্কুলের কাছে এটা মরণ—বাঁচনের খেলা, জেতা—হারা অনেকটা নির্ভর করছে গোলকিপারের উপর আর সেখানেই খেলবে কালী। ও বলছে উড়োনকে যদি পুলিশে ধরে তা হলে খেলবে না। স্কুলের ছেলেরা তো বটেই তাদের গার্জেনরা পর্যন্ত এই ম্যাচটার জেতা দেখতে চাইছে। জিতলে ধানকুড়ির স্কুল চ্যাম্পিযনশিপের গ্রুপ থেকে মূলপর্বে উঠবে। সেটা হবে বিরাট কৃতিত্ব।”
অসিত এতক্ষণ কথা বলেনি। এইবার বলল, ”হ্যাঁ বড়বাবু, আমার প্যাসেঞ্জাররা দু’দিন ধরে বলাবলি করে যাচ্ছে, তারা কালীর খেলা দেখতে শনিবার মাঠে আসবে।”
ছোট গ্যাঁড়া বলল, ”আমিও যাব দেখতে।”
হাবুদারোগা তাকালেন মেজোবাবুর দিকে। মেজোবাবু পাইপগানটা চট করে তুলে নিলেন টেবল থেকে।
”এই ‘বিরাট কৃতিত্ব’ পাওয়ার জন্য আইনকানুন শিকেয় তুলে বিরল পাখিটাকে বাড়িতে রেখে দিতে হবে?” হাবুদারোগা একটুও নরম না হয়ে বললেন। ”মামদোবাজি পেয়েছ? পরশুই আমি পাখিসমেত কালীকে অ্যারেস্ট করব তাতে স্কুলের বিরাট কৃতিত্ব পাওয়া হোক আর নাই হোক।” তারপর তিনি মেজোবাবুর দিকে চোখ তুলে বললেন, ”এই দুটো বাঁদরকে কী করা যায়? পাইপগান নিয়ে শান্তিভঙ্গ করা তো এদের কাছে খেলা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কী করা যায় বলো তো?”
মেজোবাবু কাঁচুমাচু মুখে বললেন, ”স্যার, এরা বাঁদর ঠিকই কিন্তু বিরল প্রজাতির নয়। এদের মতো বাঁদর চারদিকে গিস গিস করছে। বলি কী, দুটোকে ছেড়েই দিন, কেউ তো ইনজিওর্ড হয়নি।”
”বিনা শাস্তিতে। তাই হয় নাকি! হাতে না হলে ভাতে মারা দরকার, রিকশা দুটো কোথায়?”
”স্যার, থানার দরজায়।”
হাবুদারোগা টেবল থেকে ভোজালিটা তুলে গটগট করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। ধানুও ঘর থেকে বেরোল হাবুদারোগা ভোজালি দিয়ে কী করেন দেখার জন্য। যা দেখল তাতে অবাক হয়ে গেল এবং দুঃখবোধ করল।
ভোজালি দিয়ে দুটো রিকশার সামনের চাকার টায়ার হাবুদারোগা চিরে দিলেন। টায়ারের রবার প্রায় পাঁচ ইঞ্চি ফাঁক হয়ে গেল। যাওয়ার মতোই গটগটিয়ে তিনি ফিরে এলেন।
”যা এবার রিকশা নিয়ে স্ট্যান্ডে দাঁড়াগে যা।”
অসিত আর ছোট গ্যাঁড়া বেরিয়ে এসে রিকশার চাকার দিকে মিনিটখানেক তাকিয়ে রইল। তারপর অসিত মাথায় হাত দিয়ে ধীরে ধীরে বসে পড়ল। ছোট গ্যাঁড়া রিকশার হ্যান্ডেল ধরে সামনে কিছুটা টেনে নিয়ে গিয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, ”বড়বাবু শেষে কিনা এ ভাবে ভাতে মারল।”
