হাবুদারোগা বললেন, ”এমন পাখি আপনি আগে কখনও দেখেছেন। বা এইরকম পাখি দুনিয়ায় থাকতে পারে বলে কখনও ভাবতে পেরেছিলেন।”
”না দারোগাবাবু, আগে কখনও দেখিনি, ভাবতেও পারিনি। এমন জীব থাকতে পারে। দেখে মনে হয় বিষ্ণুর বাহন গরুড় নিজে যেন ধানকুড়িতে নেমে এসেছেন আকাশ থেকে।”
”তার মানে বিরল দুষ্প্রাপ্য। মিসেস মণ্ডল, আমাদের দেশে একটা আইন আছে” হাবুদারোগার স্বর হালকা থেকে গম্ভীর হয়ে গেল।
”দুষ্প্রাপ্য জীবজন্তু রক্ষা করা ভীষণভাবে দরকার হয় এদের চিড়িয়াখানায় রেখে, নয়তো তাদের নিজস্ব প্রকৃতির মধ্যে বিচরণ ক্ষেত্রে, বনজঙ্গল খালবিল নদীতে বসবাস করতে দেওয়া উচিত, যেখানে তারা বংশবৃদ্ধি করতে পারে। নয়তো এদের প্রজাতি লোপ পেয়ে যাবে, সেটা কি উচিত?”
হাবুদারোগা তাঁর বিবৃতির প্রতিক্রিয়া লক্ষ করার জন্য থামলেন। দেখলেন প্রতিক্রিয়াটা সুবিধাজনক নয়। সুলতা অশিক্ষিত বটে, কিন্তু দারোগার মতোই বা তার থেকেও বাস্তব বুদ্ধিসম্পন্ন বুদ্ধিমতী। যা শুনলেন তার মমার্থ ঠিকই বুঝে ফেলেছেন।
”উচিত কি অনুচিত অতশত জানি না। তবে উড়োন যদি, ওই যেন কী বললেন?”
”দুষ্প্রাপ্য বিরল প্রজাতির।” হাবুদারোগা ধরিয়ে দিলেন।
”হ্যাঁ। উড়োন দুষ্পাপ্য যদি হয় তবে হোক। ওকে বনজঙ্গলে গিয়ে বংশ রক্ষা করতে হবে না, চাইলে আমার এখানেই করতে পারে।”
হাবুদারোগা ঢোক গিললেন।
”আমার যা কর্তব্য আমি করলুম। এবার সল্ট লেকে ওয়াইল্ড লাইফ প্রিজার্ভেশনের অফিসে জানিয়ে দোব। তারা যদি কিছু করে তো করবে। তবে এই উড়োনকে ধরে রাখাটা কিন্তু বেআইনি।”
”ধরে রাখা?” সুলতা চোখ কপালে তুললেন। ”কে কাকে ধরে রাখে সেটা সারাদিন থেকে একদিন রেখে যাবেন।”
”পেল্লাদ চল।” হাবু দারোগা উঠে হাঁটা দিলেন।
সুলতা পিছু ডাকলেন, ”ও হে পেল্লাদ, ডাবদুটো ফেলে যাচ্ছ কেন, বউমা জল খেয়ে কী বলে আমাকে বলে যেয়ো।”
.
স্কুল থেকে ফেরামাত্র কালী দিদিমার কাছে দারোগার আসার ‘সব্বোনেশে’ উদ্দেশ্যেটা শুনল। তার আসার সঙ্গে সঙ্গে উড়োনও এসে বসেছে বটগাছে। এখন কালী যাবে খালপাড়ের মাঠে প্র্যাকটিসে, মাথার উপর দিয়ে উড়ে উড়ে চক্কর দিচ্ছে উড়োন।
মাঠে পুরো স্কুলটিম আর নুরুস্যার হাজির। তা ছাড়াও প্র্যাকটিস দেখতে জমা হয়েছে ষাট—সত্তরজন ছেলে আর বয়স্ক লোক। সবার আসার একটাই উদ্দেশ্য, কালী ‘কিংকং’—কে দেখা। কালীকে অনেকেই আগে দেখেছে, একটা সাড়ে ছ’ফুট লম্বা লোক এইভাবেই তারা জেনেছে কিন্তু তার আসল বয়স সে সাড়ে আট বছর (স্কুলের খাতায় অবশ্য বয়স ১৩) এটা কেউ জানত না। এবার সেটা জানাজানি হতেই বিস্ময় আর কৌতূহল আকাশছোঁয়া উচ্চচতা পেয়েছে।
উড়োন যথারীতি উড়ে গিয়ে বসল অশ্বত্থ গাছে। কালী মুখভার করে নুরুস্যারকে বলল, ”আমি কাল খেলব না স্যার।”
”কেন?” অবাক এবং আতঙ্কিত হয়ে তিনি বললেন, ”হল কী? জ্বর হয়েছে।” কালীর কপালে আঙুল ছুঁইয়ে আশ্বস্ত হলেন। ”নাহ ঠিকই আছে তা হলে খেলবে না কেন?”
”দারোগাবাবু দিদিমাকে বলেছেন উড়োনকে তিনি নিয়ে যাবেন, সল্ট লেকে জমা করে দেবেন। উড়োন নাকি বিরল রেয়ার বার্ড, ওকে বাড়িতে রেখে পোষা যাবে না। আইনে নাকি সেটা বারণ।”
‘রেয়ার বার্ড’ কথাটা নুরুস্যারের মুখ দিয়েই কিছুদিন আগে বেরিয়েছিল এই মাঠেই উড়োনকে প্রথম দেখে। সেইদিনই কথায় কথায় কী লায়লাকে বলেন, ”আজ একটা অদ্ভুত সুন্দর পাখি দেখলুম, আমার ছাত্র কালী তাকে পুষছে, এই অ্যাত্তোবড় ডানা, লম্বা লম্বা পা, সাদা পালকে ঢাকা, রংটাও সাদা, রেয়ার বার্ড। এসব পাখি বিরল প্রজাতির।” তারপর লায়লা হয়তো হাবুদারোগার বিবির কাছে বাজারে কি দরগায় দেখা হতে গল্প করেছে। দারোগার কানে সেটা পৌঁছে যেতে তারপর আর বেশি সময় লাগেনি।
নুরুস্যার একবার তো কালীকে পাঞ্জা প্রতিযোগিতা থেকে বাদ দেওয়ার কৌশল বাতলে বিবেকের কামড় খেয়েছিলেন, এখন আবার দংশন অনুভব করলেন। মনে মনে নিজের গালে চড় মেরে বললেন, ‘রেয়ার বার্ড কথাটা কেন যে মরতে বউকে বলতে গেলুম! দারোগা পাখিটাকে ধরে নিয়ে গেলে কালী বিরাট আঘাত পাবে। কুড়িয়ে এনে তিন বছর ধরে সে পালন করছে, দু’জনের মধ্যে যে ভীষণ ভাব সেটা তো তিনি নিজের চোখেই দেখেছেন। আলাদা হয়ে গেলে কষ্ট পাবে দু’জনেই। নুরুস্যার খুবই বিষণ্ণ হয়ে পড়লেন।
”কালী তুমি ভেব না, তোমার উড়োনকে হাবুদারোগা ধরতে পারবে না যদি এই ম্যাচটা জিতিয়ে দিতে পারো। যাও যাও মাঠে নামো।”
”জিতলে উড়োন আমার কাছে থাকবে? ঠিক বলছেন স্যার?”
হ্যাঁ থাকবে। কথা দিচ্ছি।”
কালী ছুটে মাঠে নামল। সে গোলে গিয়ে দাঁড়াতেই ভিড়টা সেদিকে সরে গেল।
সন্ধ্যাবেলায় ধানু পড়াতে এল। এখন সে আশুতোষ কলেজে কেমিস্ট্রি অনার্স নিয়ে বি এসসি প্রথম বর্ষের ছাত্র। এখনও সে ভোরে ভ্যান রিকশা নিয়ে বেরিয়ে তিনটে গ্রাম থেকে আনাজ—তরকারি সংগ্রহ করে। সকালে নিজে পড়ে কালীকে পড়িয়ে ভাত খেয়ে স্কুটারে বেরিয়ে পড়ে। সন্ধ্যায় এসে কালীকে নিয়ে বসে। আজ সে সুলতার মুখে শুনল হাবু দারোগার আগমন বৃত্তান্ত। কালী তাকে জানাল নুরুস্যার আশ্বাস দিয়েছেন উড়োনকে দারোগা ধরতে পারবে না। শর্তটাও সেইসঙ্গে ধানুকে জানিয়ে দিল—যদি ম্যাচটা জিতিয়ে দিতে পারে।
