হবিবুল মোল্লা ঝানু দারোগা। সুলতার মুখ দেখেই বুঝলেন, ভয় পেয়েছে। এটাই স্বাভাবিক, বাড়িতে পুলিশ আসা আর অমঙ্গল আসা সমান কথা। তবে হাবুদারোগা মোটেই অত্যাচারী নন সেকেলে দারোগাদের মতো। এক পয়সাও ঘুষ খান না এবং এইজন্যই তাঁকে নিয়ে মুশকিলে পড়ে বদমায়েশ লোকেরা, কিছুতেই কবজা করতে পারে না মোটা বেঁটে এই মোল্লাকে। হাবুদারোগা আতঙ্কের কারণ, তিনি আইনের দাস হিসাবে প্রভু—সরকারকে মেনে চলেন। পান থেকে চুন হয়তো বা খসতে পারে কিন্তু আইন থেকে এক সেন্টিমিটারও তিনি নড়েন না। একদিনে তিনি আটটি ভ্যানরিকশা বাজেয়াপ্ত করেছিলেন লাইসেন্স না থাকার অপরাধে। পরদিন স্ট্যান্ডে একটিও রিকশা ছিল না। দূরের গ্রামের যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়ে। হাবুদারোগা তাতে ভ্রূক্ষেপও করেননি। তিনটি রাজনৈতিক দল, ম্যাজিস্ট্রেট, পুর চেয়ারম্যান এবং এস পি—কে দরখাস্ত দিল, হুমকি দিল তাঁকে বদলি করিয়ে দেবে। তাতেও হাবুদারোগা নির্বিকার, অটল। শেষ পর্যন্ত তিনিই উদ্যোগী হয়ে দু’দিনের মধ্যে লাইসেন্স করিয়ে তবেই স্বস্তি পান। তাঁর শুধু একটাই কথা—সরকারি আইন মেনে কাজ করেছি।
এ হেন হাবুদারোগাকে বাড়িতে হাজির হতে দেখে সুলতার বুক কেঁপে ওঠা স্বাভাবিক। সৎ মানুষকে কে না ভয় পায়। কিন্তু তিনি এটাও জানেন, একমাত্র শিবু যদি কিচ্ছু গণ্ডগোল করে না থাকে তা হলে হাবুদারোগাকে তিনি থোড়াই কেয়ার করেন। চরিত্রের পরিচ্ছন্নতায় তিনি এই দারোগার সঙ্গে সমানে টক্কর দিতে পারেন।
”কী ভাগ্যি আমার, দারোগাবাবু আমার বাড়িতে! বসুন বসুন। ওরে লক্ষ্মী একটা টুল দিয়ে যা।”
”না, না বসতে আসিনি, যাচ্ছিলুম এদিক দিয়ে জল তেষ্টা পেল তাই এলুম একগ্লাস জল খেতে।”
বাড়ির বাইরের খোলা জায়গায় তাঁরা কথা বলছেন। কাজের বউ লক্ষ্মী একটা টুল রেখে গেল।
”পরশু ডাব পাড়িয়েছি, টিউবকলের জল থাকেন কেন ডাব খান।”
”কীরে পেল্লাদ ডাব খাবি নাকি?” হাবুদারোগা জিজ্ঞাসা করলেন টুলে বসে। পেল্লাদ তখন চারপাশের গাছপালায় তীক্ষ্ন নজরে কী যেন খোঁজাখুজি চালাচ্ছিল।
”হ্যাঁ স্যার খাব। শুনেছি মাসিমার ডাবের জল খুব মিষ্টি।”
”দিন মিসেস মণ্ডল, খেয়েই যাই।”
অতিথিসেবার সুযোগ পেয়ে সুলতা যত খুশি তার থেকেও বেশি আনন্দ পেলেন দারোগার মুখে ‘মিসেস’ শব্দটি শুনে। তিনি জানেন যাকে—তাকে এভাবে সম্বোধন করা হয় না। তিনি বাড়ির ভিতরে চলে যেতেই হাবুদারোগা চাপা স্বরে বললেন, ”দেখতে পেলি? মনে হচ্ছে এখন থাকে না।”
প্রহ্লাদ বলল, ”আমারও তাই মনে হচ্ছে স্যার। সন্ধে—সন্ধেয় এলে দেখতে পাওয়া যাবে। কিন্তু ধরবেন কী করে স্যার? এ তো পায়রা কি ঘুঘু নয় যে উঠোনে কি বাড়ির ছাদে দু’মুঠো ধান ছড়িয়ে জাল দিয়ে ধরবেন।”
হাবুদারোগা গম্ভীর হয়ে গেলেন, চিন্তিত স্বরে বললেন, ”জালটাল দিয়ে যে ধরা যাবে না সেটা আমি জানি। পাখিটা তো পোষ মানা। কালীকেই বলব ওটাকে ধরে আমার হাতে দাও।”
প্রহ্লাদ বলল, ”দাও বললেই অমনি আপনার হাতে তুলে দেবে?”
হাবুদারোগা বললেন, ”যাতে দেয় সেইভাবে বলতে হবে। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের কথা বলতে হবে, শিডিউল টু—এ কী বলা আছে বলতে হবে। ভয় পাওয়াতে একটু বাড়িয়ে, একটু বানিয়ে বলতে হবে। আমি তো আর পাখিটা পুষব না বিক্রিও করব না। সরকারের ঘরে জমা করে দেব। দুষ্প্রাপ্য প্রাণীদের বুঝলি রক্ষা করা দরকার। নুরমহম্মদ পাখিটাকে দেখেছে, বউকে বলেছে রেয়ার বার্ড। সমুদ্রে ধারে পাওয়া যায়।”
প্রহ্লাদ মন দিয়ে শুনছিল, ”স্যার, সমুদ্দুর তো এখান থেকে অনেক দূরে। ডায়মন্ড হারবার এখান থেকে প্রায় চল্লিশ মাইল তারপর কাকদ্বীপ নামখানা তারপর সমুদ্দুর। সেখান থেকে এখানে উড়ে এল।”
দু’হাতে কাচের আর স্টিলের দুটো গ্লাসে ডাবের জল নিয়ে এলেন সুলতা। দু’জনের পান করার পর ঢেকুর তোলার শব্দে তিনি তৃপ্ত হয়ে বললেন, ”আর এক গ্লাস দোব?”
হাবুদারোগা বললেন, ”না না এই যথেষ্ট।”
প্রহ্লাদ ডাকল, ”আমি তো বলেইছিলুম মাসিমার ডাব খুব মিষ্টি। বউকে গিয়ে গল্প করব।”
সুলতা চেঁচিয়ে বললেন, ”ওরে লক্ষ্মী দুটো ডাব নিয়ে আয় তো।”
হাবুদারোগা সন্ত্রস্ত হয়ে বললেন, ”দুটো নয়, একটা।”
প্রহ্লাদ তাড়াতাড়ি বলল, ”স্যার, এভাবে কিছু নেনটেন না। দুটো ডাব আমিই নিয়ে যাব, বউকে বলব তোর জন্য মাসিমা দিয়েছে।”
”মিসেস মণ্ডল আপনার এখানে তো দেখছি বেশ গাছপালা। কিন্তু পাখিটাখি তো তেমন দেখছি না।” হাবু দারোগা চারপাশে তাকিয়ে অবাক স্বরে বললেন।
”পাখি তো অনেক আছে। ঘুঘু, শালিক, বুলবুলি অনেক টিয়াও আসে।”
”বড় পাখি আসে না।” প্রহ্লাদ অধৈর্য গলায় জানতে চাইল।
”নাহ, বড় পাখি এখানে কী কত্তে আসবে। বছর দশেক আগে চিল একবার বাসা করেছিল ওই বটগাছটায়। তারপর আর বড় পাখি কোথায় একমাত্র উড়োন ছাড়া।”
হাবুদারোগা চকিত হলেন। ”উড়োন? সে আবার কে?”
”একটা সুন্দর দেখতে পাখি। ওই বড়সড়ো একটা মোরগের মতো। বুক আর পা দুটো সাদা। কালী কুড়িয়ে পায় হেকিমপুকুরের ধার থেকে। ডানা ছাঁটা ছিল তাই উড়তে পারছিল না। কালী ওকে তিন বছর ধরে পালছে। কী যে ভাব দু’জনের মধ্যে কী বলব। রাত্তিরে ও তো কালীর সঙ্গে এক ঘরেই ঘুমোয়। কালী ওকে যা বলবে উড়োন তাই করবে।”
