কালী অশ্বত্থ গাছের দিকে হাত ছুড়ে ছুড়ে ”যাহ যাহ” বলল। উড়োন শোনামাত্র গাছের দিকে উড়ে গেল কিন্তু কোনও ডালে বসল না, না বসে গাছটা পেরিয়ে উড়ে গেল দক্ষিণে।
কালী আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, ”খাবারের খোঁজে গেল।”
ছেলেরা খেলা শেষ করে মাঠের ধারে এসে দাঁড়াল। নুরুস্যার ওদের বললেন, ”কালীকে যদি গোলকিপার করা যায় তা হলে কেমন হবে বল তো ভোলা?”
ভোলা বলল, ”দারুণ হবে স্যার, ওপর দিয়ে কেউ গোল দিতে পারবে না।”
”তা হলে ওকেই আমাদের গোলকিপার করা যাক। কিন্তু মুশকিল কী জানিস, কালী কোনওদিন ফুটবল খেলেনি, শুধু কবাডিই খেলেছে।” নুরুস্যার চিন্তিত মুখে বললেন। ”ওকে গোলকিপিংটা শেখাতে হবে। ঠিক আছে, শিখিয়ে দেওয়া যাবে। কালী গোলে গিয়ে দাঁড়াও।” নুরুস্যার আঙুল তুলে একদিকের গোল দেখালেন।
প্রথমে পনেরো মিটার দূর থেকে অমিয় শট নিল। মাঝারি গতির শট কালীর মুখের কাছে। মাছি ধরার মতো খপ করে সে বলটা দু’হাতে ধরে নিল। পরের শটটা নিল শামিম, বেশ জোরে কালীর ডান দিকে। লম্বা হাত দিয়ে মশা তাড়াবার মতো সে বলটা সরিয়ে দিল। নুরুস্যার উত্তেজিত হয়ে দু’হাত মুঠো করে ঝাঁকালেন।
”এই তো পেয়ে গেছি, দেখলি পাঁচকড়ি কীভাবে দুটো শিওর গোল বাঁচাল কালী। এবার নীচে দিয়ে শট নিয়ে দ্যাখ তো, পারে কি না।”
পাঁচকড়ি পঁচিশ হাত দূর থেকে জমি ঘেঁষে কড়া শট নিল। কালী ডান পা বাড়িয়ে বলটা গোললাইনের বাইরে ঠেলে দিল। নুরুস্যার চেঁচিয়ে উঠলেন, ”ওয়ার্ল্ড ক্লাস শেভ। পাঁচকড়ি, জার্মান গোলকিপারকে দেখেছিলি ঠিক ওইভাবে পা দিয়ে ১০ গজ থেকে ফিগোর মারা বলটা শেভ করেছিল। নে আরও গোটা দশেক মার।”
দশ নয় পরপর কুড়িটা শট মারল সাতজন। এগারোটা গোলে এল এবং প্রত্যেকটাই কালী হাত নয়তো পা দিয়ে আটকে দিল। একটা ব্যাপার সবারই নজরে পড়ল, কালী বিশেষ নড়াচড়া করে না হয়তো করার দরকার হয়নি বলে। নুরুস্যার একটা সারকথা বুঝে গেছেন, কালী যেভাবে খেলছে খেলুক, কিছু শেখাতে গেলেই স্বাভাবিক খেলাটা ও হারিয়ে ফেলবে। দরকার নেই শিখিয়ে।
এক সপ্তাহ পর দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলা স্কুল চ্যাম্পিয়নশিপের ‘ডি’ গ্রুপের প্রথম ম্যাচ চড়কহাটিতে। ধানকুড়ির সঙ্গে গ্রুপে আছে আরও তিনটি স্কুল। কালী স্কুল টিমের গোলকিপার। একটা ম্যাটাডোর ভাড়া করা হয়েছে। জনাপনেরো ছেলে দুটো বল আর বগলে ব্যাগ নিয়ে উঠে পড়ল, নুরুস্যার ড্রাইভারের পাশে। ম্যাটাডোর ভাঙাচোরা গর্তভরা রাস্তা দিয়ে প্রায় অর্ধেক পথ গেছে তখন পিছনের একটা চাকার টিউবে রাইফেল থেকে গুলি ছোঁড়ার শব্দ হল এবং বাহনটি একদিকে হেলে পড়ল।
ম্যাটাডোরে বাড়তি একটি টায়ার ছিল এবং ড্রাইভারও খুব চটপটে। চাকা খুলে আবার পরাতে গেলে গাড়িটাকে উঁচু করে তুলে রাখতে হয় সেজন্য দরকার জ্যাক—এর। সেই জ্যাকটিই গাড়িতে আনা হয়নি। চটপটে ড্রাইভার পাঁচ মিনিটেই চাকা বদলে ফেলল এবং সেই পাঁচ মিনিট গাড়িটি জমি থেকে চার ইঞ্চি উপরে তুলে ধরে রেখেছিল কালী। অবশ্য একা নয় আরও দুটি ছেলে তিন মিনিট তাকে সাহায্য করে।
চড়কহাটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সঙ্গে খেলাটি ০—০ থাকে, প্রায় এক হাজার মানুষ খেলা দেখেছিল।
খেলার পর তারা একবাক্যে বলে, ধানকুড়ি এক ডজন গোলে হারত এই ঢ্যাঙা গোলকিপারটা না থাকলে। পরের ম্যাচ শাঁখাপোতা দেবেন্দ্রনাথ উচ্চচ বিদ্যালয়ের সঙ্গে। পাঁচ মাইল বাসে যেতে হয়। কালীর ব্রহ্মতালু সাড়ে ছয় ফুট উঁচুতে, সেটা বাসের ছাদে প্রায় ঠেকে যাওয়ার মতো অবস্থা হল। শাঁখাপোতার রেফারি তিনটে পেনাল্টি দেয় ধানকুড়ির বিরুদ্ধে, এর দুটিকে নিশ্চিতভাবে অন্যায্য বলা যায়। নুরুস্যার তক্ষুনি মাঠেই লিখিত প্রতিবাদ দেওয়ার জন্য স্কুলের প্যাড বার করেও ‘প্রোটেস্ট লেটার’ লেখেননি। একটিই কারণে, ধানকুড়ির গোলকিপার তিনটি পেনাল্টি শটই গোলের মুখ থেকে সরিয়ে দিয়ে কর্নার করে দিয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত ম্যাচটা তারা জিতেছিল ১—০। জেতা যখন হয়েই গেছে তখন আর প্রোটেস্ট করার দরকার কী।
গ্রুপের তৃতীয় ও শেষ ম্যাচ খেলা হবে ধান্যকুড়িয়া স্কুলের মাঠে অর্থাৎ খালপাড়ের মাঠে। দুটো ম্যাচ খেলে তাদের তিন পয়েন্ট। হাতাখালি পল্লী সেবক বিদ্যালয়ের এখন চার পয়েন্ট। ধান্যকুড়িয়ার এই ম্যাচে হারলে তো চলবেই না, ড্র করলেও চ্যাম্পিয়নশিপ থেকে ছিটকে যাবে। নক আউট পর্যায়ে উঠতে হলে জেতা ছাড়া আর কোনও পথ নেই এবং সবাই জানে জয়ের প্রধান ও একমাত্র ভরসা ক্লাস সেভেনের কালীকঙ্কর ঢালি।
পাঞ্জা লড়াই প্রতিযোগিতায় ‘নায়ক’ হয়ে ওঠার সুযোগ থেকে কালী বঞ্চিত হলেও আরও জনপ্রিয় ফুটবল ‘নায়ক’ হওয়া থেকে তাকে ঠেকানো যায়নি। প্রথম দুটো ম্যাচে তার আজব গোলরক্ষার গল্প মুখে মুখে শুধু স্কুলেই নয়, সারা ধান্যকুড়িয়ার ছড়িয়ে গেছে। এখন সুলতা মণ্ডলের নাতিকে সবাই চেনে।
এই চেনার জন্যই হাবু দারোগা হাতাখালির সঙ্গে ম্যাচের দু’দিন আগে হাজির হলেন সুলতার বাড়িতে। সঙ্গে কনস্টেবল প্রহ্লাদ পোদ্দার।
.
পুলিশ দেখেই ছ্যাঁত করে উঠল সুলতার বুকের মধ্যে। প্রথমেই মনে হল জামাই শিবু কিছু করেছেটরেছে নাকি? এখন তো সে ভদ্দরলোক হয়ে গেছে, তা হলে?
