”সর্বনাশ! কিংকং! ওর থাবায় কে হাত দেবে? ধরবে আর গুঁড়িয়ে দেবে। আমি বাবা পাঞ্জা লড়ায় নেই, তুলে নিচ্ছি আমার নাম।” কথাটা বলল হৃষ্টপুষ্ট দেহের দশম ক্লাসের ছাত্র বিজন ঘোষ।
সবাই মুখ চাওয়াচাওয়ি শুরু করল।
”ভেবে দেখার মতো কথা।” আর একজন বলল, ”কালীকে ছেঁটে ফেলে দিতে হবে নইলে ও একাই কাপ জিতে নিয়ে যাবে।”
সংগঠক ছেলেরা দেখা করল নুরুস্যারের সঙ্গে। তিনি বললেন ”এ আর এমন কী শক্ত ব্যাপার। তোমরা শরীরের ওজনের ভিত্তিতে গ্রুপ করো। কালীর এখন ওজন কত?”
ছেলেরা মাথা চুলকোতে লাগল। একজন বলল, ”আশি—পঁচাশি কেজি হবে।” আর একজন বলল, ”একশোর কাছাকাছি হতে পারে।”
নুরুস্যার বললেন, ”কুস্তি, ওয়েটলিফটিং, বক্সিংয়ে যেমন ওয়েটের ক্যাটাগরি থাকে তোমরা সেইভাবে তিনটে ভাগ করো। পঁয়ত্রিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ কেজি একটা, আর একটা পঁয়তাল্লিশ থেকে পঞ্চান্ন আর তৃতীয়টা পঞ্চান্ন থেকে—তিনি ভ্রূ কুঁচকে চোখ সরু করলেন। ”কত পর্যন্ত রাখতে চাও?”
একটি ছেলে তাড়াতাড়ি বলল, ”বিজনের ওয়েট যতটা আমাদের মধ্যে ওরই ওজন সব থেকে বেশি।”
”কত ওয়েট বিজনের?”
”তা তো জানি না, ডাক্তারবাবুর চেম্বারে গিয়ে ওজন করিয়ে আনতে হবে।”
নুরুস্যার বললেন, ”এখনও জানো না? তা হলে আজই করিয়ে নাও আর বিজনের ওজনটাই হবে তৃতীয় ক্যাটাগরির লিমিট।”
সেদিন সন্ধ্যাতেই ডাক্তারমল্লিকের চেম্বারে গিয়ে বিজন ওজন নিল—সাড়ে তেষট্টি কেজি। এরপর ঠিক হল তৃতীয় ক্যাটাগরি হবে পঞ্চান্ন থেকে পঁয়ষট্টি কেজি। ওরা নিশ্চিত, কালী এই ওজনের থেকে বেশিই হবে।
পরদিনই প্রতিযোগিতার নতুন নিয়ম ক্লাসে ক্লাসে জানিয়ে দেওয়া হল। ওজন না করিয়েই এর ফলে বাদ পড়ে গেল কালী। এই ক’দিন ক্লাস সেভেন হৈ হৈ করে বলে বেড়াচ্ছিল, তারা চ্যাম্পিয়ন হচ্ছেই কেন না তাদের টিমে আছে ‘কিংকং’ কালী। সে নিজেও ধরে নিয়েছিল তার ক্লাসকে জেতাচ্ছে, সবাই তার কাছে এসে হাতটা ধরছে। ক্লাসের সব থেকে লম্বা ছেলেটি তার থেকে এক ফুট ছোট, বাকিরা সব একহাত নীচে। দূরে দূরে থাকে ওরা। পাঞ্জা লড়ায় ক্লাসকে স্কুলের সেরা করলে আনন্দে ওরা তার কাছে এগিয়ে আসবে। এই ভেবে কালী মনে মনে খুশিতে ফুরফুরে হয়েছিল। হঠাৎ নতুন নিয়মের বজ্রাঘাতে তার মনের খুশি জ্বলে খাক হয়ে গেল।
তার মনমরা মুখ দেখে নুরুস্যার বুঝলেন আঘাত পেয়েছে, অপরাধ বোধে পীড়িত হলেন। আসলে তাঁর দেওয়া বুদ্ধিতেই তো কালীকে বাদ দেওয়া গেছে। তিনি স্থির করলেন, ছেলেটিকে অন্য কোনও খেলার মধ্যে নিয়ে সকলের সঙ্গে খেলার সুযোগ করে দেবেন। স্কুলে ক্রিকেট ছাড়া খেলা বলতে আর আছে ফুটবল। ফুটবল দলেই কালী তা হলে আসুক।
তিনি স্কুলের গেটের কাছে কালীকে ধরলেন।
”কালী ফুটবল খেলেছ কখনও?”
”না স্যার, তবে খালপাড়ের মাঠে দেখেছি।”
”গোলকিপার কীভাবে খেলে দেখেছ তো? পারবে গোলকিপার খেলতে?”
কালী মাথা হেলিয়ে দিয়ে বলল, ”দু’—চারদিন প্র্যাকটিস করলেই পারব।”
খুব আনন্দ হল কালীর। অনেকের সঙ্গে মিশে গিয়ে খেলতে তার ইচ্ছে করে। সে অনেক অনেক ছেলের মধ্যে থাকতে চায়।
”তা হলে কাল সকালে সাতটার মধ্যে মাঠে চলে এসো। গোলকিপিং কীভাবে করতে হয় সেটা শিখিয়ে দেব। আমি অবশ্য ফুটবলের নই ক্রিকেটের লোক, তা হলেও ফুটবল নিয়ে অল্পসল্প পড়েছি। ফান্ডামেন্টাল জ্ঞানটা আমার আছে। যাই হোক তোমার এই হাইটটা কাজে লাগাতে চাই। আমাদের দেশে লম্বা গোলকিপার খুব কমই পাওয়া গেছে। দেখি তোমাকে দিয়ে অভাবটা পূরণ করা যায় কি না। কাল এসো কিন্তু।” এই বলে তিনি কালীর পিঠে দুটো চাপড় দিলেন।
পরদিন কালী সকালে খালপাড়ের মাঠে ঠিক সময়ে পৌঁছল। স্কুলের উঁচু ক্লাসের জনা বারো ছেলে দল করে খেলছে। তাকে দেখে নুরুস্যার মাঠটা দুটো চক্কর দিয়ে দৌড়তে বললেন। সে দৌড়ল। দৌড়তে দৌড়তে সে দেখল উড়োন উড়ে এসে অশ্বত্থ গাছটায় বসল। গাছটার পাশ দিয়ে সে দৌড়ে যাওয়ার সময় উড়োন ডানা ঝাপটে উড়ল এবং ছুটন্ত কালীর মাথার উপর তাকে অনুসরণ করে উড়তে থাকল। নুরুস্যার ব্যাপারটা লক্ষ করলেন।
দু’ চক্কর ছুটে এসে কালী দাঁড়াতেই তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ”পাখিটা কি তোমার?”
উড়োন আবার অশ্বত্থ গাছে গিয়ে বসেছে। সেদিকে তাকিয়ে কালী হাসল। ”হ্যাঁ স্যার।”
”পেলে কী করে?”
”এই হেকিমপুকুরের ধারে গাছতলায়। রাতে প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টি হয়েছিল, সকালে ও ঘাসের ওপর পড়ে ছিল, কাকে ঠোকরাচ্ছিল, ডানার পালকগুলো কাটা ছিল, উড়তে পারছিল না। বোধহয় ওর ওড়া বন্ধ করার জন্য কোনও লোক ডানা ছেঁটে দিয়েছিল। ওর নাম রেখেছি উড়োন, নামটা ভাল নয় স্যার?” কালী উদ্দীপনাভরা চোখে তাকাল।
”ওকে একটু ভাল করে দেখতে হবে। তোমাদের বাড়িতে গেলে দেখা যাবে?”
”দেখবেন? এখুনি দেখাচ্ছি।” কালী মুখে আঙুল ঢুকিয়ে তীক্ষ্ন শিস দিল। তারপর সুর করে গলা ছেড়ে ডাকল, ”উ উ উ উ ড় অ অ ন।”
শিস শুনেই উড়োন চকিত হয়ে মাথা ঘুরিয়ে তাকায়। ডাক শুনে উড়ে এল। দুটো ডানা ছড়িয়ে কালীর মাথার উপর গোল হয়ে ঘুরতে লাগল। নুরুস্যার মুখ তুলে চোখ বিস্ফারিত করে উড়োনকে দেখতে লাগলেন।
”রেয়ার বার্ড, বিরল প্রজাতির, আমি এই প্রথম এমন একটা পাখি দেখলুম। কালী ওকে গাছে গিয়ে বসতে বলো তো।”
