এর পর নুরুস্যার প্রবল গতিতে ছুটে বোলারের উইকেটের কাছে পৌঁছেই তড়াক করে একটা লাফ দিয়ে হাত ঘুরিয়ে বল ছাড়লেন। ব্যাট হাতে ক্লাস টেন—এর শম্ভু, স্কুলটিমের সেরা ব্যাট। বলটা তার মাথার সমান উঁচুতে আসছে দেখে সে ভয়ে বসে পড়ল। গ্লাভস হাতে একটি ছেলে উইকেটের পিছনে ছিল সে বলটা ধরার কোনও চেষ্টাই করল না। বলটা কুড়িয়ে আনতে দৌড়ল আর একজন।
”ঠিক যেভাবে ডেলিভারি দিলুম সেইভাবে বল করে দেখাও!” নুরুস্যার কালীর পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললেন। একটা দারুণ এক্সপেরিমেন্ট সফল হবে কি হবে না, সেই উত্তেজনায় তাঁর বুকের মধ্যে কাঁপন দিচ্ছে।
যেভাবে নুরুস্যার দৌড়ে এসেছিলেন ঠিক সেইভাবে কালী বল হাতে দৌড়ে এল একুশ কদম। লাফাল এবং হাত ঘুরিয়ে বল করল। নুরুস্যারের থেকে দশ গুণ গতিতে বলটা শম্ভুর মাথা লক্ষ্য করে ধেয়ে গেল। সে সরে যাওয়ার কি মাথা নামাবার সময়টুকুও পেল না তবে আত্মরক্ষার স্বাভাবিক প্রবৃত্তিবশে ব্যাটটা মুখের কাছে তুলে ধরে। ‘খটাস’ একটা শব্দ হল। শম্ভু ব্যাট ছুড়ে ফেলে দিয়ে গ্লাভস খুলে ডান হাতের তর্জনী চোখের সামনে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।
কান্না দেখে নুরুস্যার ঘাবড়ে গেলেন। কালীকে ধমকে বললেন, ”এটা কী বল হল?”
কাঁচুমাচু হয়ে কালী বলল, ”আমি তো স্যার ঠিক যেভাবে আপনি বল করবেন সেই ভাবেই করেছি, ভুল হয়েছে কী?”
নুরুস্যার বিরক্ত হয়ে বললেন, ”বল কোথায় পিচ করতে হয় জানো না। গবেট কোথাকার।” তারপর শম্ভুকে বললেন, ”অ্যাই শম্ভু বাচ্চচাছেলের মতো কাঁদিস না। ক্রিকেট পুরুষমানুষের খেলা। ওরকম একটু—আধটু সবারই লাগে। যা ব্যাট কর।”
”না স্যার।” গোঁয়ারের মতো গলায় শম্ভু মাথা নেড়ে প্যাড খুলতে খুলতে বলল, ”ওই কিংকংটা বল করলে আমি ব্যাট ধরব না।”
ঘটনাটা এবং নুরুস্যারকে দেওয়া শম্ভুর উত্তরটা পরদিনই স্কুলে মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ল। কালীকে এখন সবাই কিংকং বলে। প্রথমে সে অবাক হয়ে যেত। বড়দিদিমণিকে একবার সে জিজ্ঞাসা করেছিল নামটার মানে কী? তিনি বলেছিলেন, ”আফ্রিকার কঙ্গো রাজ্যের জঙ্গলে একটা গেরিলা ছিল, পাহাড়ের মতো তার চেহারা। কয়েকটা দুষ্টুলোক ওর চেহারা ভাঙিয়ে ব্যবসা করবে বলে ওকে অজ্ঞান করে লোহার খাঁচায় পুরে জঙ্গল থেকে ধরে নিয়ে আসে আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরে। তারা ওর নাম দেয় কিংকং অর্থাৎ রাজা কং। শ’য়ে শ’য়ে লোক টিকিট কেটে কং—কে দেখতে আসে। তখন সে খেপে উঠে লোহার শিকল ছিঁড়ে খাঁচার লোহার গরাদ দুমড়েমুচড়ে বেরিয়ে এসে লণ্ডভণ্ড শুরু করে দেয়। দু’হাতে বেয়ে বেয়ে কং প্রায় আটশো হাত উঁচু এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিংয়ে ওঠে। শেষকালে অবশ্য তাকে পুলিশ এরোপ্লেন থেকে গুলি করে মেরে ফেলে। আমার বাবা ছোটবেলায় কিংকং সিনেমাটা দেখেছিলেন। গল্পটা আমার ছোটবেলায় বাবা বলেছিলেন। কং—এর মনটা খুব ভাল ছিল, মায়ামমতায় ভরা ছিল।”
বড়দিদিমণির কাছে যতটুকু শুনেছিল তাতে কিংকং—কে ভালই লেগেছিল কালীর। সে তো খারাপ কাজ কিছু করেনি। তাকে জঙ্গল থেকে ধরে আনল যে লোকগুলো তারাই তো বদমায়েশি করেছিল। কং—এর উপর অত্যাচার হয়েছিল বলেই সে খেপে উঠেছিল, নয়তো সে ভালমানুষই ছিল। কালী মনে মনে কং—এর পক্ষ নিয়ে যুক্তি সাজিয়ে ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতিয়ে ফেলে। ছেলেরা কিংকং বলে ডাকলে তার ভালই লাগে। রাতে খোলা জানলা দিয়ে বাইরে আকাশের দিকে তাকিয়ে নিজের শরীরটাকে কল্পনায় কং—এর মতো বিরাট করে সে শিকল ছিঁড়ে গরাদ ভেঙে বেরিয়ে আসে, তারপর উড়োন হয়ে উড়ে যায়। আকাশের পর আকাশ পার হয়, মেঘ নিয়ে লোফালুফি করে, দু’হাতে তারাদের কুড়িয়ে কুড়িয়ে জড়ো করে, একটা একটা করে সেগুলো নীচে ফেলে দিয়ে দেখে, দিদিমা উঠোনে ঝাঁট দিয়ে তারা কুড়োচ্ছে। তারাগুলো আঁচলে তুলে দিদিমা রান্নাঘরে চলে গেল বোধহয় চালভাজার মতো করে ভাজবে । কালী তারপর শোঁ শোঁ করে নেমে আসে। তারাভাজা খেতে কেমন লাগে সেটা পরখ করবে বলে। রান্নাঘরের দরজায় বসে থাকতে থাকতে সে ঘুমিয়ে পড়ে।
কিন্তু উড়ে বেড়াবার বদলে সে প্রথম ধাক্কা গেল ক্লাস সেভেনে উঠে।
.
হেডমাস্টারমশাই বলেছিলেন, ‘বছর যতই গড়াবে আমার মনে হচ্ছে কালীর শরীরও ততই বাড়বে।’ দেখা গেল তাঁর অনুমানটাই ঠিক। ক্লাস সেভেনে কালী উঠল সাড়ে ছয় ফুট লম্বা হয়ে।
উঁচু ক্লাসেরই কোনও ছাত্রের মাথা থেকে বেরিয়েছিল পাঞ্জা লড়াইয়ের ব্যাপারটা। প্রত্যেক সেকশন থেকে তিন জনের একটা করে টিম হবে। তিনটি ছেলে অন্য সেকশানের তিনটি ছেলের সঙ্গে লড়বে। জিতলে পাবে এক পয়েন্ট। ফাইভ থেকে টেন মোট পনেরোটি সেকশনের মধ্যে, ‘ধান্যকুড়িয়া মাধ্যমিক আদর্শ শিক্ষা নিকেতন আর্ম রেসলিং চ্যাম্পিয়নশিপে’ নাম দিল আটটি সেকশন। সাতটি সেকশন নাম দিল না একটি কারণে, যথেষ্ট বলশালী ছেলে সংগ্রহ করে উঠতে না পারায়।
পাঞ্জা লড়াইকে ঘিরে স্কুলে উৎসাহের জোয়ার বইল। চ্যাম্পিয়নদের জন্য কাপ, রানার্সদের জন্য মেডেল দেওয়া হবে। সে কথা পোস্টারে লিখে দেওয়ালে সাঁটা হয়ে গেল। উদ্যোক্তা ছাত্ররা পুরস্কার কেনার জন্য চাঁদা তুলল। প্রতিযোগিতার সূচি তৈরি করতে বসে সংগঠকরা ক্লাস সেভেন ‘বি’ সেকশনের টিমে কালীকিঙ্কর ঢালি নামটা দেখে আঁতকে উঠল।
