দারোগার সঙ্গে ধানুও হেডসারের ঘরে ঢুকে গেল। প্রণব মাইতিকে সেলাম করে দারোগাবাবু বললেন, ”স্কুল থেকে থানায় টেলিফোন গেছল আপনি বিপন্ন, প্রাণ সংশয়ও রয়েছে। স্যার যদি বলেন লাঠি চালিয়ে স্কুল থেকে এদের বার করে দিতে পারি।”
”তারপর এই স্কুল থেকে চিরকালের জন্য আমাকেও বেরিয়ে যেতে হবে।” শুকনো মুখে হেডস্যার জানিয়ে দিলেন। ”লাঠিফাটি একদম নয়। সব ক’টাকে পাশ করিয়ে দিচ্ছি। ভবিষ্যৎ তো ঝরঝরে হয়ে গেছে, বাপ মা যদি আরও ঝরঝরে করতে চায় তো হোক। তিনবার খাতা দেখে টেনেটুনে বাড়িয়েও যদি পাশমার্ক না পায় তা হলে ফেল না করিয়ে উপায় কী?”
হাবু দারোগা ঘর থেকে বেরিয়ে উৎকণ্ঠিত ভিড়কে জানিয়ে দিলেন, ”হেডমাস্টারমশাই বলেছেন সবাই পাশ, খুশি তো? এবার আপনারা বাড়ি যান।”
একজন বলে উঠল, ”হেডমাস্টার প্রণব মাইতি জিন্দাবাদ।”
”জিন্দাবাদ, জিন্দাবাদ।” সমস্বরে জয়ধ্বনি দিতে দিতে ভিড় উধাও হল।
ঘর ফাঁকা হতে প্রণব মাইতি বললেন, ”সুধন্য, কালী ছেলেটি পড়াশুনোয় ভাল, খুবই ভাল, বিনয়ী নম্র শিক্ষকদের শ্রদ্ধা করে কিন্তু মুশকিল কী জানো, ওর চেহারাটা বড্ড বড়, হাইট প্রায় ছ’ফুট, যখন প্রথম আসে ছিল সাড়ে পাঁচ ফুট, আমার সমান। স্কুলের রেকর্ডে বয়স এখন বারো। অবশ্য ছোটবাড়ির হেডমিস্ট্রেস দেবিকা ঘোষাল বলেছেন বয়সটা বছর চারেক বাড়ানো হয়েছে। সারা স্কুল এখন আড়ালে ওকে কিংকং বলতে শুরু করেছে। নামটা যে কী করে তৈরি হল কে জানে।”
ধানু বলল, ”আমি জানি স্যার। ছোট দিদিমণি আমার প্রতিবেশী তিনি আমাকে বলেছেন, কালী যখন ভর্তি হয়ে যায় তখন নাম জিজ্ঞাসা করেন বড়দিদিমণি। উনি কানে একটু কম শোনেন আর কালীর তখন সর্দি হয়ে গলা ঘড়ঘড়ে। কিঙ্করকে তিনি শোনেন কিংকং। কালীকে উনি খুব স্নেহ করতেন, খুশি হলে কিংকং বলে ডাকতেন।”
”কিন্তু নামটা যে ফিল্মের পরদা থেকে ধানকুড়িতে নেমে আসছে। একটা বিরাট চেহারা ক্লাস সিক্সে বসে, ছেলেদের তো বটেই মাস্টারমশাইদেরও পড়াতে অস্বস্তি হয়। মদনবাবু, ননীগোপালবাবু, সেলিমসাব আমাকে বলেছেন ছোট ছোট ছেলেদের মধ্যে ওকে দেখলে একদম বেমানান লাগে, পড়াতে অস্বস্তি হয়। আমার ধারণা কালীরও হয়। বছর যতই গড়াবে আমার মনে হচ্ছে কালীর শরীরও ততই বাড়বে। তখন তো ধান্যকুড়িয়া আদর্শ মাধ্যমিক শিক্ষা নিকেতন একটা দ্রষ্টব্য স্থান হয়ে উঠবে চিড়িয়াখানার মতো।”
”চিড়িয়াখানা’ শব্দটা গরম করে দিল ধানুর মাথা। কালীকে পশু বা পাখি ভাবতে তার কষ্ট হচ্ছে। আবার হেডস্যারের কথাগুলোও ফেলে দেওয়ার মতো নয়, তারও মনে হচ্ছে কালীর শরীরের বৃদ্ধি ঘটবে, সমস্যায় পড়বে।
”তা হলে কী করতে বলেন?”
”আমার মনে হয় না চিকিৎসা করে ওর বাড়বৃদ্ধি বন্ধ করা যাবে বা তাগা মাদুলি পুজো দিয়েও কিছু করা যাবে। তুমি তো ওকে বাড়িতে পড়াও, তাই করো। স্কুলে আসার কোনও দরকার নেই। এই স্কুল থেকেই কালী সোজা মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসবে সে ব্যবস্থা আমি করব।”
”স্যার, এখন ওর যা হাইট সেটা এমন কিছু চোখে পড়ার মতো নয়। ছয় কি সাড়ে ছয় ফুট লম্বা লোক তো প্রচুর দেখা যায়।” ধানু যথাসাধ্য সওয়াল করার চেষ্টা চালাল কালীর স্কুলে পড়ার পক্ষে। ”আরও দু’—তিনটে বছর দেখুন না, তেমন মনে হলে আমিই ওকে স্কুলে আসতে দেব না।”
হেডমাস্টারমশাই রাজি হলেন ধানুর কথায়।
ধানু সুলতাকে জানিয়ে দিল কালী যেমন স্কুলে যাচ্ছে তেমনই যাবে।
স্বস্তি পেলেন সুলতা, তাকে পথ অবরোধে বা ধর্নায় আর বসতে হবে না।
খেলার ও ভূগোলের যুগ্মশিক্ষক নুরমহম্মদস্যারের হঠাৎই মনে হল তার স্কুলেই লুকিয়ে রয়েছে ব্রেট লী। কালীকে শিখিয়ে পড়িয়ে নিলে ঘণ্টায় একশো মাইল বেগে ওকে দিয়ে বল করানোটা কোনও ব্যাপারই হবে না। কালীকে তিনি ডেকে পাঠালেন।
”কালী তুমি কখনও কোনও খেলা খেলেছ?”
”কবাডি খেলি স্যার।”
”ফুটবল ক্রিকেট হকি?”
”না স্যার।”
”ফাস্টবোলার চাই আমাদের স্কুল টিমের, তুমি হবে?”
”হব স্যার।”
”কখনও বল করেছ?”
”না স্যার।”
”খালপাড়ের মাঠে আজ বিকেলে এসো।”
এইভাবে কথাবার্তা হল টিচার্স রুমে দু’জনের মধ্যে। বিকেলে কালী হাজির হল খালপাড়ে। দুটি পুরনো ক্রিকেট বল, দু’জোড়া ব্যাটিং গ্লাভস, দু’ সেট স্টাম্প, দু’জোড়া প্যাড, দুটি ক্রিকেট ব্যাট এবং উইকেটে কিপিং গ্লাভস এই হল স্কুলের ক্রিকেট—সম্পদ। মাঠের একবারে ঘাস চেঁছে মাটিতে জল ঢেলে দুরমুশ করে যথাসাথ্য সমান করার চেষ্টায় পিচ ঢেউ খেলানো। জনাআষ্টেক ছেলে নেট প্র্যাকটিসে হাজির এবং নুরমহম্মদস্যারও।
কালীকে দেখেই নুরুসার (ছাত্ররা ওই নামেই তাঁকে ডাকে), বললেন, ”কালী, বল করার আগে মাঠটা দু’পাক দৌড়ে নাও।”
কালী দুটো পাক দিয়ে আসতেই নুরুস্যার বললেন, ”কোন হাতে বল করবে, ডান হাতে তো?”
”হ্যাঁ।”
”আমি বল করছি তুমি দেখো, মন দিয়ে লক্ষ করো।” নুরুস্যার ছিপছিপে, বয়স বছর চল্লিশ। কলকাতার ময়দানে দ্বিতীয় ডিভিশন ক্লাব কসবা ফ্রেন্ডস ইউনিয়নে অফস্পিন বোলার ছিলেন। খেলেছেন এক বছর, চারটি ম্যাচে। ট্রাউজার্স হাঁটু পর্যন্ত গুটিয়ে বল হাতে একুশ পা হেঁটে একটা ইট দিয়ে মাটিতে দাগ কাটলেন। বলটা ট্রাউজার্সে ঘষতে ঘষতে কালীকে চেঁচিয়ে বললেন, ”ওয়াচ মি কালী। এইভাবে ধরলে ইনসুইং করবে বল।”
