মিনিট পাঁচেক পর দেখা গেল কুড়োন ছুটতে ছুটতে আসছে আর উড়োন ওর পিঠে বসার চেষ্টায় দুটো ডানা ছড়িয়ে ব্যালান্স করার জন্য বাঁকানো লোহার হুকের মতো নখগুলো দিয়ে পিঠটা আঁকড়ে থাকার চেষ্টা করছে। ছুটন্ত কুড়োনের পিঠে দু’তিন সেকেন্ড বসেই উড়োন আবার শূন্যে উঠল আবার বসল। যন্ত্রণা থেকে রেহাই পেতে কুড়োন এবার সুলতার কোলে একছুটে পৌঁছে গেল। এরপর কুড়োনের পিঠে কয়েকটা চড় পড়ল এবং দুপুরে না খাওয়া সুলতার ভাত তাকে খেতে হল।
কালী ফাইভ থেকে সিক্সে উঠল প্রথম হয়ে এবং তার দেহের উচ্চচতাও নজর কাড়ার মতো ইতিমধ্যে বেড়ে গেছে। হেডমাস্টারমশাই শিক্ষাবর্ষ শুরুর প্রথম দিনই কালীকে ক্লাস থেকে ডাকিয়ে তার ঘরে নিয়ে এলেন।
”তোমার হাইট এখন কত?”
হেডস্যারের গম্ভীর স্বরে কালী মনে মনে কুঁকড়ে গেল। যখন বেয়ারা ক্লাসে গিয়ে বলল কালীকিঙ্কর ঢালিকে হেডস্যার ডাকছেন, তখন সে ভেবেছিল পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার জন্য পিঠ চাপড়ে বলবেন, ‘খুব ভাল। এবার আরও ভাল ফল করতে হবে। ইংরিজিটা নতুন বিষয়, তবে শক্ত নয়। তুমি ঠিক ধরে ফেলতে পারবে।’ ধানুদা এই ভাবেই তাকে বলেছে, হেডস্যারও নিশ্চয় এইরকমই কিছু বলবেন, কিন্তু একী অদ্ভুত প্রশ্ন করলেন?
”আমি জানি না স্যার, মেপে দেখিনি।”
প্রণব মাইতি বিশাল একটা ‘হমমম’ শব্দে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। টেবল থেকে কাগজ কাটার ছুরিটা তুলে নিয়ে দেওয়ালের কাছে গিয়ে বললেন, ”এদিকে এসো, দেওয়াল ঘেঁষে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়াও!”
কালী তাই করল। হেডস্যার ছুরিটা কালীর ব্রহ্মতালুর উপর চেপে দেওয়ালে ঠেকিয়ে বললেন, ”এবার সরে দাও।”
কালী সরে গেল। ছুরি যেখানে ছিল সেইখানে দেওয়ালে দাগ কাটলেন। তারপর পেনসিল দিয়ে কালো আঁচড় টেনে বললেন, ”মনে হচ্ছে এক বছরে ইঞ্চি চারেক বেড়েছ। ছ’ ফিটের কাছাকাছি হবে। এখন যাও, টিফিনে দেখা কোরো।”
টিফিনের সময় কালী হেডমাস্টারের ঘরে গেল। দেখল একটা দৈর্ঘ্য মাপার ফিতে টেবলের উপর আর হেডস্যারের কপালের উপর দুটো রেখা।
”যা আন্দাজ করেছিলুম, পাঁচ ফুট সাড়ে দশ ইঞ্চি। কালীকিঙ্কর তুমি যদি এইভাবে বাড়তে থাকো তা হলে ক্লাস টেনে কী হবে? একটা উৎকট বীভৎস লম্বা দৈত্য হবে।”
কালী চুপ করে রইল। শুধু দৈত্য শব্দটা কানে একঘেয়ে স্কুটার হর্নের মতো বেজে যেতে লাগল।
”কমাও, হাইট কমাও। মানুষের মতো, আমাদের মতো হাইট করো, নয়তো এই স্কুলে তোমায় রাখা যাবে না।”
ঢোঁক গিলে কালী বলল, ”কী করে হাইট কমাব স্যার?”
হেডমাস্টার নিশ্চিত স্বরে বললে, ”এটা একটা অসুখ, ডাক্তার দেখাও, নয়তো যাগযজ্ঞ করো। সব থেকে ভাল হয় বাড়িতে বসে থাকো আর পড়ো। পরীক্ষার ক’টা দিন এসে পরীক্ষা দিয়ে যেও। সুধন্য তোমার প্রাইভেট টিউটর তো, ওকে বলো আমার সঙ্গে দেখা করুক।”
আকাশ কারুর মাথায় ভেঙে পড়ে না, কিন্তু কালীর মাথায় পড়ল। সে বাড়িতে এসেই দিদিমাকে বলল হেডস্যারের কথাগুলো।
সুলতা অবাক হয়ে বললেন, ”বলছিস কী, লম্বা হওয়াটা অপরাধ? মানুষ তো লম্বা—চওড়াই হতে চায়, এটা তো ভগবানের আশীব্বাদ!” তারপরই ক্ষিপ্তস্বরে বললেন, ”দেখি তোর হেডস্যারের কেমন মুরোদ ইস্কুলে যাওয়া বন্ধ করে। আমি রাস্তা আটকাব, বাইপাস বন্ধ করব, ধন্না দিয়ে ইস্কুলে বসে থাকব।” এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে সুলতা হাঁফাতে লাগলেন।
সন্ধ্যায় সব শুনে ধানু বলল, ”কালকেই আমি হেডস্যারের সঙ্গে দেখা করব।”
স্কুল কামাই করে ধানু দেখা করতে গেল প্রণব মাইতির সঙ্গে। হেডমাস্টারের দরজা বন্ধ, কামরার বাইরে তখন বয়স্ক নারীপুরুষের ভিড় আর চেঁচামেচি চলেছে। ওরা এসেছে কয়েক নম্বরের জন্য ফেল করা ছেলেমেয়েদের পাশ করিয়ে দেওয়ার আর্জি নিয়ে। হেডমাস্টার মশাই ‘অসম্ভব’ বলে দরজা বন্ধ করে দিয়েছেন। আরজিটা এর পরই বদলে গিয়ে হয়েছে দাবি এবং দাবির যা পরিণতি হয় এখন সেটাই চলছে, বিক্ষোভ এবং স্লোগান।
এক মহিলা কাঁদো কাঁদো মুখে বললেন, ”দেখুন তো কী জুলুম, মোটে সতেরো নম্বর কম পেয়েছে ভূতের বিজ্ঞানে আর কিনা ফেল করিয়ে দিল?”
তাই শুনে এক মাঝবয়সী পুরুষ হাত তুলে চেঁচিয়ে উঠলেন, ”হেডমাস্টারের অন্যায় জুলুম মানছি না মানব না।”
ধানু একধারে দাঁড়িয়ে দেখছিল। পাশে দাঁড়ানো একজনকে নিচুস্বরে জিজ্ঞাসা করল, ”আপনি এখানে কেন, কেসটা কী?”
”ইতিহাস, বাংলা আর অঙ্ক। ইতিহাসে চব্বিশ, বাংলায় তেরো, অঙ্কে নয় পেয়েছে। ভাল ছেলে তবু কেন যে এমন নম্বর পেল! খাতাই ঠিকমতো দেখা হয়নি। দেখবে কখন, টিউশনি করে সময় পেলে তো দেখবে।” ব্যাজার মুখে কথাগুলো বলে ভদ্রলোক মুষ্টিবদ্ধ হাত তুলে চেঁচিয়ে উঠলেন, ”চলবে না, চলবে না।”
ধানু আবার জিজ্ঞাসা করল, ”আপনি রোজ পড়াতে বসাতেন?”
বিরক্ত মুখে ভদ্রলোক বললেন, ”অতো সময় কোথায় আমার।”
থানায় খবর চলে গেছে। দুজন লাঠিধারী কনস্টেবল সঙ্গে নিয়ে খাঁকি উর্দিপরা দারোগা হবিবুল মোল্লা (ধানকুড়িতে তিনি হাবু দারোগা নামে প্রসিদ্ধ) জিপ থেকে নামলেন। ধানুর সঙ্গে পরিচয় আছে হাবু দারোগার। ওর ছেলে বসির মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছিল ধানুর সঙ্গে, ভাল বন্ধুত্বও রয়েছে।
”তুই কেন এখানে? পড়তে যাসনি?” ধানুকে দেখেই ভ্রূ কুঁচকে ধমকে বলেন হাবু দারোগা। ভিড় ঠেলে হেডমাস্টারের ঘরের দিকে যেতে যেতে বললেন, ”যে স্কুটারটা চালাস ওটা এক ডাকাতের, তবে বেনামে, আর তোর ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই।”
