কুড়োন এখন ভালই হাঁটে, তবে খুঁড়িয়ে। সুলতার যত্নে এখন সে হৃষ্টপুষ্ট, উজ্জ্বল হয়েছে কালো চামড়া। বড়ির মতো দুটো শিংও দেখা যাচ্ছে। সুলতা বাড়ির পিছনের পাঁচ কাঠা জমিতে আনাজের ছোট বাগান করেছেন। সেখানে বেগুন, কুমড়ো, ঢ্যাঁড়স, লঙ্কা, মানকচু ওল আর মাচা করে ঝিঙে, চিচিঙ্গে, করলা, উচ্ছে লাগিয়েছেন। প্রতিদিন পরিচর্যা করেন গাছপালার, সঙ্গে থাকে কালী। বালতি বালতি জল এনে ঢালা, খুরপি দিয়ে মাটি খুঁড়ে গোবরসার, খইলসার দেওয়ার কাজ কালীই করে। খিড়কির দরজা দিয়ে যেতে হয় আনাজের বাগানে। কুড়োন হাঁটাচলা শুরু করার পর থেকেই খিড়কি দরজা বন্ধ করে রাখেন সুলতা।
একদিন সকালে বাগানে কাজ করে এসে কালী বলল, ”দিদিমা কুমড়ো ফুলগুলো বেশ বড় বড় হয়েছে ভাজা খাওয়াও না, অনেকদিন খাইনি।”
নাতির আবদার শুনে সুলতা চাল গুঁড়োলেন। বাগান থেকে কমলা রঙের গোটা কয়েক কুমড়ো ফুল তুলে আনলেন। লঙ্কা দিয়ে চালগুড়োয় মাখিয়ে ভেজে কালীকে খাওয়ালেন। রাত্রে বাড়ির দরজাগুলো তিনি নিজের হাতে বন্ধ করেন। এটা তার বহু বছরের অভ্যাস। প্রথমেই দেখে নেন খিড়কির দরজা বন্ধ আছে কি না। দেখতে গিয়ে আঁতকে ”সব্বোনাশ করেছে,” বলে উঠলেন। দরজা হাট করে খোলা!
রাতটা প্রায় জেগেই কাটিয়ে পরদিন সকাল হতেই বাগানে গিয়ে সুলতা দেখলেন, পালং চারা আর কুমড়ো ডগা সাফ। রান্নাঘর থেকে কঞ্চিটা নিয়ে অপরাধীর সন্ধানে বেরিয়েই চোখে পড়ল কালী দু’হাতে উড়োনকে ধরে কুড়োনের পিঠের উপর বসাবার চেষ্টা করছে। ব্যাপারটা কুড়োনের মনঃপূত নয় কেন না উড়োনের তীক্ষ্ন নখগুলো তার পিঠের চামড়া আঁকড়ে ধরায় সে যন্ত্রণায় গা ঝাড়া দিয়ে ছুট লাগাল।
সুলতা কঞ্চি হাতে কুড়োনের পিছু নিলেন। ছুটে পারলেন না। কঞ্চিটা মাটিতে আছড়ে বললেন, ”হতভাগা পাঁঠা। আজ তোর একদিন কি আমার একদিন।” তারপর কালীর বিস্মিত মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ”একটা পালং গাছ আস্ত রাখেনি সব মুড়িয়ে খেয়েছে, কুমড়োর ডগা বলে আর কিছু নেই। বিদেয় কর, আজই, এখুনি।”
সুলতা যাকে বিদায় করতে বললেন তার ল্যাজের ডগাটি ত্রিসীমানায় সারা সকাল আর দেখা গেল না। আন্না তার কথামতো স্কুটার পাঠিয়ে দিয়েছে। একটি ছেলে কলকাতা থেকে চালিয়ে এনে ধানুকে বুঝিয়ে দেখিয়ে এবং তাকে সিটে বসিয়ে প্রাথমিক শিক্ষাটি দিয়ে যায়। ছেলেটি যখন বুঝিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছিল কালী তখন সেখানে দাঁড়িয়েছিল। ধানু প্রায় পঞ্চাশ গজ ছেলেটির সামনে কয়েকবার টলমল করে চালায়। সাইকেল চালাতে সে ভালই জানে সুতরাং ব্যালান্স নিয়ে তাকে ঝঞ্ঝাটে পড়তে হয়নি। শুধু অ্যাক্সিলেটর, গিয়ার, ব্রেক ইত্যাদির প্রয়োগ বুঝতে সময় ব্যয় করতে হয়েছে।
প্রতিদিন ধানু বিকেলে এসে স্কুটারটি দাওয়া থেকে বার করে ধানকুড়ির ভিতরের রাস্তা দিয়ে কিছুক্ষণ চালায়। ভিড় রাস্তা দিয়ে স্কুল ‘পর্যন্ত চালিয়ে যাওয়ার মতো হাত এখনও যথেষ্ট পাকেনি। তবে যন্ত্রের নিয়মগুলোয় সড়গড় হয়ে গেছে। কালীর ইচ্ছা করে স্কুটার চালাতে। রোজ সকালে ধানু তাকে পড়িয়ে ভাত খেয়ে গড়িয়ায় তার স্কুলে রওনা হওয়ার পর কালী নিঃসাড়ে স্কুটারটি বার করে কিছুদূর হাঁটিয়ে নিয়ে গিয়ে স্টার্ট দেয়। শব্দ শুনেই বাঁশের ডগা থেকে উড়োন উড়তে শুরু করে। ধীর গতিতে চালিয়ে সে খালপাড়ের ফুটবল মাঠে আসে। তার মাথার উপর পাক দেয় উড়োন আর স্কুটারের গতি তীব্র থেকে তীব্রতর করে মাঠটা সে চক্কর দিতে থাকে। দিতে দিতে কালী খুশিতে আনন্দে চেঁচিয়ে ওঠে—
”হেই উড়োন আমিও আকাশে উড়ব।…..সাঁ সাঁ করে সাঁ সাঁ করে আকাশে স্কুটার চালাব। আমাকে তুই ধরতে পারবি না….কেউ ধরতে পারবে না আমাকে।” বলতে বলতে সে অদ্ভুত সুরে শিস দিয়ে ওঠে। ”লম্বা, আমি আরও লম্বা হব, পুঁচকে বেঁটেরা হাঁ করে আমার দিকে অবাক হয়ে তাকাবে….হা হা হা, তাকাবে তাকাবে! শুধু তুই তুই সিন্ধু—গরুড় আকাশ থেকে ঘাড় বেঁকিয়ে আমাকে দেখবি।”
ফাঁকা মাঠে কালি স্কুটার চালায় আর চেঁচিয়ে যায়। মিনিট দশেক পর সে বাড়ি ফিরে আসে। উড়োন তখন হেকিমপুকুরের পাড়ে উড়ে যায় শামুক আর মাছের খোঁজে। ফেরে দুপুরে। একতলা বাড়ির ছাদের দক্ষিণ দিকের কার্নিসে বসে থাকে যতক্ষণ না কালী স্কুল থেকে ফেরে। কালীকে দেখামাত্র ‘খক খক’ করে ডেকে দুটো ডানা ছড়িয়ে আড়মোড়া ভাঙে।
সেদিন কুড়োনকে দুপুরেও দেখতে না পেয়ে সুলতার মুখ শুকিয়ে গেল। তার শুধু মনে হতে লাগল, ওকে কেউ চুরি করল না তো? এখানে বাচ্চচা বেওয়ারিশ পাঁঠা প্রায়ই চুরি হয়। চুরি যাওয়া পাঁঠা চালান হয়ে যায় কসবা কিংবা যাদবপুরের মাংসের দোকানে। সুলতা মুখে ভাত তুলতে পারলেন না। সারা দুপুর সদর দরজার পাশের রোয়াকে বসে কাটালেন।
কালী স্কুল থেকে ফিরতেই সুলতা বললেন, ”দ্যাখ তো কালী কুড়োন রাগ করে সকাল থেকে কোথায় যে চলে গেল এখনও ফেরেনি।”
কালী মুখের দু’পাশে হাতের তালু রেখে ছাগলের ডাকের নকল করে কয়েকবার ‘ব্যা ব্যা’ আওয়াজ করল। দু’মিনিট অপেক্ষা করে আবার করল। কুড়োনের সাড়াশব্দ এবারও মিলল না। কালী হুমম শব্দ করে উড়োনকে কার্নিস থেকে উড়িয়ে দিল। উড়োন হেকিমপুকুরের দিকে উড়ে গেল।
