”দিদিমা পাখিটাকে আমি পুষব।”
”বেশ তো। এমন চেহারার পাখি তো আমি জন্মে দেখিনি। পোষ মানবে কি না জানি না।”
বিকেলে ধানু আসতেই কালী প্রবল উৎসাহে পাখিটাকে দেখাল। ধানু তো দেখে চমৎকৃত।
”কী পাখি আমি বলতে পারব না তবে মধুবাবু হয়তো বলতে পারবেন। ওঁর বাড়িতে এইসব বিষয়ে অনেক বই আছে।”
দু’দিন পর ধানু জানাল, ”মধুবাবু আমার কাছ থেকে সব শুনে বইটই খুলে বললেন, ভারত থেকে উত্তর—পূর্ব অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত চিলের মিলভিনে প্রজাতির একটা শাখা হয়তো হতে পারে। খুব বিরল। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার সমুদ্রের ধারে আর বাদা অঞ্চলে দু’চারটে দেখা যায়। ওরা মাছ খায়, গেঁড়ি গুগলিও খায়। বাংলায় এই পাখিকে সিন্ধু—গরুড়ও বলে।”
মন দিয়ে শুনে কালী বলল, ”ধানুদা, এর একটা নাম ঠিক করে দাও।”
”নাম তো সিন্ধু—গরুড় রয়েছেই, তুই একে গরুড় বলবি।”
ঠিক সেই সময় ঘরের বাইরের দাওয়া থেকে ”ব্যা—আ—আ’ শব্দ ভেসে এল। ছাগল ছানাটাকে সুলতা একটা চটের থলির উপর শুইয়ে রেখেছেন।
”ধানুদা, ওই শোনো আর একজনও নাম চাইল। তবে দিদিমা বলছিল কুড়িয়ে পাওয়া তাই কুড়োন নাম রাখতে। তুমি কি বলো।”
”খুব ভাল নাম, একজন কুড়োন আর অন্যজন…।” ধানু ভাবতে লাগল।
”উড়োন।’ কালী লাফিয়ে উঠে বলল। ”ও তো একদিন না একদিন উড়বেই, ডানার পালক কি চিরকাল ছোটই থাকবে।”
কালীর কথাই ঠিক। উড়োনের পাখার পালক যেমন ধীরে ধীরে বাড়ল তেমনি কালীও একটু একটু করে আরও লম্বা হল, কুড়োন তিন পায়ে ভর দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলে বেড়াতে শুরু করল। ধানুও মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসল।
কালী ক্লাস ফাইভে ভর্তি হল বড়বাড়িতে। হেডমাস্টার প্রণব মাইতি শুনেছিলেন, ছোটবাড়ির একটি ছেলে অস্বাভাবিক লম্বা, প্রবল স্মৃতিধর এবং অবিশ্বাস্য পরিশ্রমী। মাত্র এক বছরেই সে অ আ ক খ এবং এক দুই তিন চার শিখে ক্লাস ফোর—এর পড়া শেষ করেছে। দেবিকা ঘোষাল তাঁকে একথাও বলে গেছেন যে, ”দেখবেন ও ছ’বছরের পড়া তিন বছরে শেষ করে স্টার নিয়ে মাধ্যমিক পাস করবে।”
প্রণব মাইতি অবশ্য ছোটবাড়ির বড়দিদিমণির কথা বিশ্বাস করেননি। তার মনে হয়েছে ছেলেটা আর সবার মতোই বাড়িতে পাঁচ ছয় বছর বয়স থেকে পড়া শুরু করে ক্লাস ফোরে ভর্তি হয়েছিল। বার্থ সার্টিফিকেটে তিনি দেখেছেন কালীকিঙ্কর ঢালির এখন বয়স বারো। অস্বাভাবিক কিছু নয়, শুধু ওর উচ্চচতাটাই স্বাভাবিক নয়। হেডমাস্টার শুনেছেন কালীকিঙ্কর যখন ক্লাস ফোর—এ ভর্তি হয় তখন ছিল পাঁচ ফুট দু’ইঞ্চি। এক বছর পর এখন তার মনে হচ্ছে উচ্চচতাটা ভুল রয়েছে, ছেলেটা আরও লম্বা।
তার মনে হওয়ার কারণ একদিন তিনি লাইব্রেরিতে ভারতের নদীর ম্যাপ নিতে যান ক্লাসে যাওয়ার আগে। কালী তখন দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল একটা বই নেওয়ার জন্য। প্রণব মাইতি কালীর গা ঘেঁষে এসে আড়চোখে দেখেন তাঁর কাঁধ ও কালীর কাঁধ সমান্তরাল রেখায় এবং তিনি পাঁচ ফুট ছ’ইঞ্চি। ব্যাপারটা হৃদয়ঙ্গম হতেই তিনি অস্বস্তিতে পড়ে যান—ক্লাস ফাইভেই কলেজের উচ্চচতর ছাত্র! ক্লাস টেন—এ তা হলে কী দাঁড়াবে!
.
স্কুলে হইহই পড়ে গেল। সুধন্য হালদার, গরিব ভ্যানরিকশাচালকের ছেলে স্টার পেয়ে মাধ্যমিক পাস করেছে। তার নম্বর চারটি লেটার সহ ছ’শো তিপ্পান্ন। এক বাক্স সন্দেশ হাতে নিয়ে ধানু সুলতাকে প্রণাম করতেই তিনি কাঁটা হয়ে গেলেন, ”বামুনের ছেলে পায়ে হাত দিলি, আমার নরক বাস যে সাত জম্মো ধরে হবে রে, এ কী করলি ধানু!” সুলতা হায় হায় করে উঠলেন।
ধানু হেসে বলল, ”হয় যদি হবে। দু’বেলা আপনার অন্ন ধ্বংস করেছি আপনার পুণ্যিও নয় খানিকটা ধ্বংস করলুম।”
”অঙ্কে পুরো নম্বর পেয়েছিস তো?”
”না দিদিমা, আট নম্বর কেটে রেখে দিয়েছে।”
হতাশ সুলতা বললে, ”একশো পাঁচ তোর কপালে আর নেই।”
টেলিফোনে কালীর কাছ থেকে খবর পেয়ে শিবুর মোটরবাইকের পিছনে বসে একঘণ্টার মধ্যে আন্নাকালী পৌঁছে গেল। ধানকুড়ির সীমানার বাইরে ই এম বাইপাসে আন্নাকে নামিয়ে দিয়ে শিবু সোনারপুর চলে গেছে, একঘণ্টা পর এখান থেকেই সে বউকে আবার তুলে নেবে। শীতলাতলায় বামুনপাড়াটা আন্না চেনে। সোজা সেখানে চলে গেল পলিথিনের ব্যাগটা হাতে নিয়ে। ধানু এখন বিখ্যাত ছেলে তার বাড়ি খুঁজে নিতে তিরিশ সেকেন্ডও খরচ হল না। তখন বাড়িতে মা আর বোনেরা ছিল।
টিনভর্তি রসগোল্লা, ফুলপ্যান্ট ও বুশশার্ট মায়ের হাতে দিয়ে আন্না জানতে চাইল ধানু এবার কোথায় পড়বে?
মা বললেন, ”টালিগঞ্জে, নয়তো কাছেই গড়িয়ায় উচ্চচ মাধ্যমিক পড়তে চায়, কলকাতায় ভাল ইস্কুলে তো এই নম্বরে ভর্তি নেবে না।”
”যাতায়াতে তো অনেক সময় যাবে।”
”তা তো যাবেই।”
”তা হলে কালীকে পড়াবে কখন? কালীর বাবার একটা স্কুটার পড়ে পড়ে পচছে। ধানু ওটা নিয়ে স্কুলে যাতায়াত করুক, সময় বাঁচবে। পেট্রল খরচ আমার। স্কুটার চালানোটা ওকে শিখে নিতে হবে।”
কালীর পড়াশুনোয় এতটুকু ব্যাঘাত আন্না হতে দেবে না।
ধানুদের বাড়ি থেকে আন্না এল বাপের বাড়ি। কালী তখন স্কুলে। সুলতা বাইরের উঠোনে ধানঝাড়াই তদারক করছিলেন। একটা প্রায় তিনতলা সমান বাঁশ কালী উঠোনে পুঁতে দিয়েছে, উড়োন সেই বাঁশের ডগায় বসে ধানঝাড়া দেখছে। এখনও সে দূরে উড়ে যেতে পারে না। তার ডানার পালক পুরোপুরি গজায়নি। একদিন আকাশে কিছুটা উঠেছিল। তখন একটা চিল কোথা থেকে উড়ে এসে তাকে তাড়া করে। ডানার পূর্ণতা না থাকায় সে আকাশে মহড়া দিতে পারেনি। ঠোকরানি খেয়ে উঠোনে নেমে পড়ে। কালী ওর মাথায় মলম লাগিয়ে দিয়েছিল।
