ছাগলছানাটাকে কোলে নিয়ে কালী স্কুলে না গিয়ে বাড়িতে ফিরে এসে সুলতাকে ডেকে বলল, ”দ্যাখো দিদিমা, কাকে এনেছি। গাছচাপা পড়েছিল শিবতলার কাছে। মা’টা মরে গেছে। আমার মনে হচ্ছে এর পা ভেঙেছে, একটু দ্যাখো তো।”
”আহা রে!” বলে সুলতা কালীর হাত থেকে ছানাটাকে নিয়ে নিলেন।
কালী আশ্বস্ত হয়ে আবার স্কুলের দিকে রওনা হল। সেখানে পৌঁছে দেখল, স্কুলের ঘরের টালির চালা ভেঙে ক্লাস ঘরের বেঞ্চের উপর পড়ে রয়েছে। কিছু টালি উড়ে ছড়িয়ে পড়েছে বড় বাড়ির উঠোনে। বড়দিদিমণি দেবিকা আর অধীরবাবু হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে। ছোটদিদিমণি রাধারানি টালি সরিয়ে একপাশে জড়ো করে রাখছেন। প্রায় তিরিশটি ছেলেমেয়ে একটু দূরে জটলা করে ভয় ভয় চোখে স্কুলের দশার দিকে তাকিয়ে।
দেবিকা বললেন, দেখতেই তো পাচ্ছ কী অবস্থা? আজ বাড়ি যাও তোমরা, বড় বাড়ির মাঠে ক্লাস করা যায় কি না তাই নিয়ে হেডমাস্টার মশায়ের সঙ্গে আজ কথা বলব। তোমরা কাল এসো।”
কালী বাড়ি ফিরে আসছে এবার অন্য একটা সরু পায়ে চলা পথ দিয়ে। একই রাস্তা দিয়ে বারবার হাঁটতে তার ভাল লাগে না। দু’ধারে ঝোপ আর তার মধ্যে বড় বড় গাছ। এই পথটা হেকিমপুকুর নামে আগাছাভরা বড় জলাশয়ের ধার দিয়ে একটা বড় বাঁশবনের পাশ কাটিয়ে ফণীমনসা ঝোপের ধার ঘেঁষে তার বাড়ির দিকে গেছে। যেতে যেতে কালী দেখল একটা বিশাল রাধাচুড়া গাছের তলায় গোটা পঁচিশ কাক ওড়াওড়ি করছে আর ‘কা কা’ শব্দে ডেকে চলেছে। কিছু একটা জিনিসকে ওরা ঠোকরাবার চেষ্টা করে যাচ্ছে। বড় বড় ঘাসের জন্য কালী জিনিসটা দূর থেকে দেখতে পেল না।
কালী পায়ে পায়ে সতর্ক ভঙ্গিতে এগিয়ে গেল। ব্যাপারটা কী তাকে দেখতে হবে। তাকে দেখে কাকগুলো অল্প হটে গেল। আর একটু এগিয়ে সে পাখির মাথা দেখতে পেল, মাথাটা কাক শালিখ ছাতারে এমনকী চিলের মাথার থেকেও বড়। মাথাটা সাদা। কালী কৌতূহলী হয়ে আরও এগোল। পাখিটা তাকে দেখতে পেয়েছে কিন্তু উড়ে যাওয়ার কোনও চেষ্টা করল না। উবু হয়ে যেমন বসেছিল তেমনই বসে রইল।
পাখিটার ভাবভঙ্গি দেখে কালীর মনে হল, ওর ওড়ার ক্ষমতা নেই। বোধহয় ঝড়ের দাপটে আকাশ থেকে ছিটকে এসে পড়েছে। ঠোঁট দুটি তীক্ষ্ন এবং বাঁকানো। হিংস্র ও শিকারি পাখি কিন্তু এখন অসহায়। কালী তার সাড়ে ছয় বছরের বুদ্ধিতেই বুঝে গেছে একবার যদি ঠোকরায় তা হলে মাংস খুবলে নেবে। সে কাকগুলোকে তাড়াবার জন্য একটা মরা সরু ডাল কুড়িয়ে নিয়ে ”হেই হুশশ” করে ঘোরাতে শুরু করল। কাকেরা পিছিয়ে গেল, অনেকে গাছে চড়ে বসল কিন্তু পালাল না বরং দ্বিগুণ রবে ‘কা—কা—কা’ শুরু করে দিল।
এইবার কালী পাখিটার দিকে মাথা ঝুঁকিয়ে তার চোখের দিকে তাকাল। তার মনে হল পাখিটার চাহনিতে স্বস্তি ফুটে উঠেছে, মোলায়েম হয়েছে চোখের মণি, গলা থেকে বুক পর্যন্ত পালকের রং সাদা। ঘাড়ের কাছে ইটের রং, ডানা আর পিঠ আরশোলা রঙের। পাখিটা মুখ তুলে হাঁ করল, মুখের মধ্যেটা গোলাপি। গোটা শরীর আকারে চিলের থেকে সামান্য বড়।
কালী আলতো করে ওর মাথায় আঙুল ছোঁয়াল, পাখিটা চোখ বন্ধ করে ফেলল। আঙুলটা আস্তে দু’তিনবার বোলাল, মাথাটা নামিয়ে পাখিটা এবার যেন জানিয়ে দিল ‘আমার ভাল লাগছে।’ দু’পায়ে ভর দিয়ে সে উঠে দাঁড়াল। সারা পা সাদা লোমে মোড়া। কালীর মনে হল যেন সাদা ফুল মোজা পরে রয়েছে, দেখে তার মজাই লাগল । সে পাখিটার দু’পাশ ধরে তুলে নিল। চুপটি করে থেকে সে মাথা বাঁকিয়ে শুধু কালীর মুখের দিকে তাকাল। কাকগুলো অর্ধেক পথ কালীর চারপাশে ঘিরে উড়ে অবশেষে ফিরে গেল। বাড়িতে ঢুকেই কালী হাঁক পাড়ল। ”দিদিমা, দেখে যাও। আর একজনকে এনেছি।”
সুলতা তখন ছাগল ছানার সামনের ডান পায়ে কাপড়ের পাড় জড়িয়ে ব্যান্ডেজ করছিলেন।
”আবার কাকে আনলি।” বলে পিছনে মুখ ফিরিয়ে দেখলেন উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে বড় মোরগের আকৃতির একটা পাখি। দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলেন সুলতা। ”ওমমা, এ তো ভারী সুন্দর দেখতে রে, কোথায় পেলি?”
‘হেকিমপুকুরের ধারে গাছের নীচে কাকে ঠোকরাচ্ছিল, উড়তে পারে না।”
”কেন পারে না?”
”সেটা দেখতে হবে। ইস্কুল ছুটি দিয়ে দিল ঘরের চালা ভেঙে পড়েছে। যদি বড়বাড়ির হেডমাস্টার মশাই বলেন তো ওঁদের মাঠে ক্লাস হবে। দিদিমা ছানাটার পায়ে কী হয়েছে?”
”বোধহয় ভেঙেছে, মনে হচ্ছে খিদে পেয়েছে রে কালী। কার ছাগল বাচ্চচা কে জানে, খোঁজ নিয়ে ফেরত দিতে হবে। মায়ের দুধ তো দিতে পারব না, গরুর দুধই খাওয়াই।” দুধের সন্ধানে সুলতা গোয়ালঘরে ঢুকলেন বাটি হাতে।
কেন উড়তে পারছে না জানার জন্য কালী পাখিটাকে তুলে ধরে ছুড়ে দিল আকাশের দিকে। ডানা বিস্তার করে দু—তিনবার ঝাপটাল এবং উঠোনে পড়ে গেল। অবাক হয়ে কালী দেখল পাখিটার ডানার পালক কেটে নেওয়া হয়েছে এমনভাবে, যাতে উড়তে না পারে। কাজটা মানুষেরই করা। কে করেছে কেন করল তাই নিয়ে কালী মাথা ঘামাল না। দুধের বাটি হাতে গোয়ালঘর থেকে বেরিয়ে আসা দিদিমাকে সে বলল, ”এই পাখিটারও কিন্তু খিদে পেয়েছে। দুধ একেও দাও দিদিমা।”
”দুর বোকা এসব পাখি নিরিমিষ্যি খায় না, ইঁদুর টিকটিকি ছোটখাটো সাপ পায়রা শালিক এইসব খায়। পুকুরে গিয়ে দেখি গেঁড়ি কি গুগলি পাই কি না।”
