সুলতার এহেন প্রস্তাবে ধানু তাজ্জব হয়ে গেল। শুধু বলল, ”মাকে জিজ্ঞেস না করে কিছু বলতে পারব না।”
ধানু চলে যাওয়ার পর সুলতা আন্নাকে বললেন, ”কেন খেতে বললুম বল তো? রাতে খেতে দিতে দেরি করলে ওই সময়টা বেশি পড়িয়ে নেওয়া যাবে।”
মায়ের বুদ্ধির বহরে আন্না তো চমৎকৃত।
.
কালী প্রথম দিন স্কুলে যাওয়ামাত্র বড়দিদিমণি দেবিকা তাকে স্বাগত জানালেন, ”আরে কিং কং, এসো, এসো। ফুলপ্যান্ট পরে ভালই করেছ। যাও, ক্লাসে বোসো।” ক্লাস ফোরের ঘরটা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে তিনি কথা বলে যেতে লাগলেন এক ছাত্রীর মায়ের সঙ্গে।
একটু পরে দেবিকা ক্লাস ঘরে ঢুকে দেখলেন কালী জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে।
একটি ছেলে বলে উঠল, ”দেখুন না বড়দি, এই লোকটা এসে বেঞ্চিতে বসেছিল। আমরা সামনে কিছু দেখতে পাচ্ছিলুম না।”
”আরে ও লোক নয়, লোক নয়, তোমাদের থেকেও বয়সে দু’ তিন বছরের ছোট। ওর নাম কালী কিং কং ঢালি। চেহারাটাই যা বড়, এখন থেকে ও তোমাদের সঙ্গে পড়বে। কালী তুমি পিছনের বেঞ্চে গিয়ে বোসো।”
সারা ক্লাস অবাক চোখে কৌতূহল ভরে মুখ ফিরিয়ে ফিরিয়ে কালীকে দেখতে থাকে, তাইতে অস্বস্তিতে সে থেমে উঠল। দেবিকা পড়ালেন ভূগোল। ভারতের সীমানা আর জলবায়ু ছিল পাঠের বিষয়। কালী চুপচাপ বসে শুনে গেল। সকলেই বই এনেছে শুধু তারই বই নেই। সঙ্গে শুধু খাতা আর কলম। ছুটির পর দেবিকা তাকে বললেন, ”স্কুল থেকে কবে বই পাবে তার ঠিক নেই, দোকান থেকে বই কিনে নিয়ো, আজই।”
সেই দিন বিকেলেই সুলতা ধানকুড়ির একমাত্র বইয়ের দোকান পপুলার বুক স্টোর থেকে ক্লাস ফ্লোরের যাবতীয় বই কিনে আনেন। সন্ধ্যায় ধানু পড়াতে এসে দেখে কালী ভূগোল বই খুলে বানান করে করে পড়ার চেষ্টা করছে। তাই দেখে ধানু সুলতাকে বলল, ”দিদিমা আমি দু’বেলা কালীকে পড়াব। সকালে আমার বই নিয়ে এখানে চলে আসব নিজে পড়ব আর কালীকে পড়াব, এখান থেকেই চান করে ভাত খেয়ে স্কুলে চলে যাব।”
পুলক চেপে সুলতা বললেন, ”তোমার বোনেদের সকালে পড়াও, তার কী হবে?”
”সে হয়ে যাবে। ওরা লিখতে পড়তে জানে, ফাইভ সিক্সের যা পড়া তা নিজেরাই পড়ে নিতে পারে। আটকে গেলে তখন বুঝিয়ে দিয়ে হেলপ করব, সেটা বিকেলেও করা যাবে।”
সুলতা এবার আন্তরিকভাবে বললেন, ”আর তোর নিজের পড়া? অঙ্কে তো তুই কাঁচা, তার কী হবে? একশো পাঁচের মধ্যে একশো পাঁচ কিন্তু বড় পরীক্ষার তোকে পেতেই হবে। ধানু, এবার তুই মাস্টারের কাছে পড়। তোর নিজের মাস্টারি করার টাকাটা এবার খরচ কর।”
ধানু মন দিয়ে এই প্রৌঢ়ার কথাগুলো শুনল, মনে গেঁথে নিল এবং মা—কে রাত্রে জানাল।
”তোকে টিউশনির টাকা সংসারে দিতে হবে না।” মা বলেছিলেন, ”তোকে দাঁড়াতে হবে। পরীক্ষায় ভাল ফল না করলে দাঁড়াবি কী করে। তোর বাবা কী কষ্টটা করেছেন সে তো দেখেছিস, তাঁর কী মনের আশা ছিল তাও জানিস। এতগুলো টাকা পাচ্ছিস তাকে ভালমতো ব্যবহার কর। সংসার যেমন করে চলছে তেমনই চলবে।”
ধানু জানত মা এইরকম কথাই বলবে। স্কুলের বিজ্ঞান শিক্ষক মধুসূদন ভটচাজ বাড়িতে কয়েকজন ছাত্র পড়ান। পরদিনই ধানু মধুবাবুর কোচিং—এ ভর্তি হয়ে যায়। সপ্তাহে দু’দিন চারশো টাকা।
বিকেলে ধানু খালপাড়ের খেলার মাঠে যায়। তার স্বাস্থ্য ফুটবলের মতো ধাক্কাধাক্কির খেলার উপযুক্ত নয়। মাঠের একধারে কবাডি খেলা হয়। সেখানেই সে দেখতে পায় কালীকে। কবাডি মাঠের ধারে সে তুমুলভাবে দুটো দলের কোনও একটিকে সমর্থন করে যাচ্ছে, ধানু তাকে বলেছিল, ”তুমিও খেলো না কেন? গায়ে তোমার এত জোর! খুব সরল খেলা দু’বার দেখেই তো শিখে ফেলা যায়। খেলতে চাও তো শক্তি সঙ্ঘকে বলি ওখানে আমার চেনা আছে।”
”ধানুদা আমার বয়স জানলে ওরা আমাকে খেলতে নেবে না।”
”বয়স জানাব না। বলব তোমার বয়স—কত বলব?” জিজ্ঞাসা করল ধানু কালীকেই।
ফাঁপরে পড়ল সাড়ে ছয় বছরের পাঁচ ফুট দুই ইঞ্চির ছেলেটি। হতভম্ব চোখে সে ধানুর দিকে তাকিয়ে রইল। হেসে ধানু বলল, ”আঠারো।”
শক্তি সঙ্ঘ লুফে নিল কালীকে। ওদের একজন বলিষ্ঠ রেইডার দরকার ছিল যে একটা হানাতেই দু’জনকে অন্তত মোড় করে আসতে পারবে। কালী তাদের আশা পূরণ করল। কালীর উচ্চচতা গড়পড়তা বাঙালি পুরুষের মতো তাই লোকের চোখে পড়ে না, তবে কথা বললেই বোঝা যায় সে বালক কিন্তু সে লোকের সঙ্গে কথা বলে না। তাই পাঁচজনের একজন হয়েই সে ভিড়ে মিশে রইল।
একদিন ভোররাতে প্রবল ঝড়বৃষ্টি ধানকুড়ির উপর নেমে এল। আধঘণ্টা প্রলয় চালিয়ে ঝড় উধাও হল বৃষ্টিকে সঙ্গে নিয়ে। সুলতা বললেন, ”কালী ইস্কুলে যাবি? যা দুর্যোগ গেল, মনে হয় না তোর ইস্কুলবাড়ি আস্ত আছে, যা একবার ঘুরে আয়।”
বই খাতা ভরা থলি কাঁধে ঝুলিয়ে কালী স্কুলে যাবার জন্য বেরোল। তার মাথায় তখন একটাই চিন্তা, ধানুদা কি ভ্যানরিকশা নিয়ে বেরোতে পেরেছে? ছোট গাছগুলো উপড়ে পড়ে আছে। অশ্বত্থ গাছের বড় মোটা একটা ডাল ভেঙে পড়ে আছে রাস্তায়, সেটা এড়িয়ে পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তার মনে হল একটা ‘ব্যা আ আ’ শব্দ যেন সে শুনতে পেল। কৌতূহলী হয়ে সে ভাঙা ডালটার দিকে এগিয়ে গেল।
ডালের পাতাগুলো সরিয়ে সে দেখতে পেল, একটা ছাগল ডাল চাপা পড়ে মরে রয়েছে আর একটা ছোট্ট ছাগলছানা কীভাবে যেন বেঁচে গিয়ে মরা ছাগলটার কোলের কাছে উপুড় হয়ে পড়ে রয়েছে। কালী পাতা সরাতেই মুখ তুলে ‘ব্যা আ আ’ করে ডেকে উঠল। কালী বুঝল মরা ছাগলটা এই ছানার মা। সে সন্তর্পণে দুহাত দিয়ে তুলে দাঁড় করিয়ে দিতেই ছানাটা হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল।
