‘শুধু কি গতর রে আন্না! ওর মাথাটার মধ্যে ভগবান কী জিনিস যে ভরে দিয়েছেন তা বোঝা দুষ্কর। যা একবার শুনবে ঠিক মনে করে রেখে দেবে। দেখবি?”
সুলতা ডাকলেন কালীকে। সে তখন বোনকে কোলে নিয়ে বাড়ির বাইরের উঠোনে কামিনী গাছ থেকে ফুল পাড়ছে। একটা হলুদ ছোট্ট পাখি ফুড়ুত করে উড়ে এসে বসল নিম গাছে। ফুল থেকে চোখ সরে গেল কৃষ্ণকলির। কালী বলল, ”ওটা বেনেবউ। কী সুন্দর, না?”
”আমাদের বাড়িতে ময়না আছে। সেটাও খুব সুন্দর, মা রোজ ভাত খেতে দেয়।”
”ওই দ্যাখ পাখিটা কেমন উড়ে উড়ে খেলা করছে। তোদের ময়নাটা করে?”
”কী করে করবে, থাকে তো খাঁচার মধ্যে। খাঁচার মধ্যে কি ওড়া যায়?”
কালী চুপ করে রইল। আবছা কষ্ট ছাপ ফেলল তার মুখে। অস্ফুটে বোনকে বলল, ”উড়তে না পারার জন্য ওর দুঃখু হয়।”
”তুমি জানলে কী করে দুঃখু হয়?”
”আমি জানি…হয়।”
তখনই দিদিমার ডাক শুনতে পেয়ে সে বোনকে নিয়ে বাড়ির মধ্যে এল।
”ধানু তোকে কাল যে পড়া আর লেখাগুলো করতে বলে গেছল করেছিস? বলব কী আন্না এই অ্যাত্ত মুখস্ত আর লেখা।” সুলতা দুটো হাত বিস্তার করে দেখালেন। ”কাল রাতে না খেয়ে না দেয়ে পড়েছে আর লিখেছে। দ্যাখা না কালী, মাকে দ্যাখা না।” সুলতা ছেলেমানুষের মতো ছুটে গিয়ে কাগজগুলো নিয়ে এলেন।
আন্নাকালীর বিদ্যাবুদ্ধি তার মায়েরই মতন। অবশ্য অ আ ক খ সে বোঝে, নিজের নামটাও লিখতে পারে। কাগজ ভর্তি আ ই দীর্ঘ ঈ—র চিহ্নগুলো সে চিনতে পারল। একটা কাগজে পরপর লেখা কালী কিংকর ঢালি, লেখা দেখে আন্না বানান করে করে পড়ে ছেলেকে জড়িয়ে গালে চুমু খেয়ে বলল, ”করেছিস কী, একরাতেই নামটাও লিখতে শিখে গেছিস।”
সেই সময় বাড়িতে ঢুকল ধানু। সুলতা মেয়েকে বললেন, ”আন্না, এই হল কালীর মাস্টার ধানু। এখানকার ছেলে, এই বছর মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবে। পড়াশুনোয় খুব ভাল। অঙ্কে একশো পাঁচের মধ্যে একশো পেয়েছে।”
আন্না অবাক চোখে তাকিয়ে থেকে বলল, ”অ্যাতটুকু ছেলে, পারবে কালীকে পড়াতে?”
সুলতা এবার ধানুকে বললেন, ”হ্যাঁ রে ধানু, কালীর মা বলছে পারবি পড়াতে?”
ধানু ঠোঁট কামড়ে বলল, ”কালীকে পড়াতে হয় না দিদিমা, শুধু দেখিয়ে দিতে হয়, আর বলে দিতে হয়। পড়াটা ও নিজেই করে নেয়।”
কালীর লেখা কাগজগুলো হাতে নিয়ে ধানু দেখতে লাগল। তারপর সে কালীকে স্বরবর্ণ অ থেকে ঔ মুখস্থ বলতে বলল। নির্ভুলভাবে কালী বলে গেল। তারপর ব্যঞ্জন বর্ণ। ক থেকে চন্দ্রবিন্দু পর্যন্ত বলতে গিয়ে মাত্র দু’বার তার আটকাল।
আন্না মায়ের কানে ফিসফিস করে বলল, ”মাস্টার তো খুব ভাল। মাইনে কত?”
”টাকা তো তুই দিবি, এখনই কথা বলে নে।”
গম্ভীর হয়ে গেল আন্না। হিসেবি গলায় বলল, ”একদিনের পড়া থেকে অবশ্য কিছু বোঝা যায় না তুমি কেমন মাস্টার, তবে আন্দাজ একটা পাওয়া যায়।” হাতের সোনার বালাটা ঘোরাতে ঘোরাতে সে বলল, ”উঁচু ক্লাসের ছাত্তর নয় কালী, তোমাকে বেশি খাটতে হবে না। বলো কত মাইনে নেবে?”
ধানু যেন তৈরিই ছিল প্রশ্নটার জন্য। বলল, ”আপনার মেয়ে কী স্কুলে পড়ে?”
”ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে কে জি—টুতে।”
”ওর প্রাইভেট টিউটর আছে?”
এবার সুলতা আগ বাড়িয়ে জবাব দিলেন। ”মাস্টার থাকবে না? ইংরিজি তা হলে পড়াবে কে? হ্যা রে, আন্না, কত যেন মাইনে নেয় আন্টি?”
”এম এ পাশ। কমই নেন, পাঁচশো টাকা।”
সুলতার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, ”শুনলি তো ধানু, এম এ পাশ। তুই তা হলে একশো নে।”
ধানুর মুখ কঠিন দেখাল। ”আমি এখনও মাধ্যমিক পাশও করিনি। ঠিক কথা। কিন্তু চার বছরের পড়া এক বছরের মধ্যে করিয়ে দেওয়াটা সহজ ব্যাপার নয়। কালীর মতো পড়ুয়া ছেলে এমন অসাধারণ ওর মেমারি দেখেই রাজি হয়েছি। ফাঁকি আমি দোব না, দিতে পারবও না। আন্টিকে যে টাকা দেন আমাকেও তা দিতে হবে।” শেষের বাক্যটি বলার সময় ধানুর স্বর শক্ত হয়ে উঠল।
আন্না ভ্রু কুঁচকে চোখ সরু করে তীক্ষ্ন নজরে তাকিয়ে ধানুকে দেখছিল। মনে মনে জরিপ করে নিচ্ছিল এই কিশোরের মানসিক ক্ষমতাটা। কীসের জোরে এতটুকু ছেলে বলল, আন্টিকে যে টাকা দেন আমাকেও তা দিতে হবে। অনেক ধরনের মানুষ ওই ডাকাতের বউকে দেখতে হয়েছে, অনেক রকমের বিপদ—আপদ থেকে বুদ্ধি করে তাকে বেরিয়ে আসতে হয়েছে। সুলতাকে একপাশে ডেকে নিয়ে গিয়ে সে গলা নামিয়ে বলল, ”মনে হচ্ছে ছেলেটা সলিড। মা রাজি হয়ে যাও। টাকাটা বড় কথা নয়। কালীকে শিক্ষিত করে তুলতে হলে এই ছেলেটাকে দরকার।”
মেয়ের জ্ঞানগম্যির উপর সুলতার অগাধ আস্থা। গত সাত আট বছর ডাকাত স্বামীকে চরাচ্ছে, ডাকাতি আর তোলাবাজি ছাড়িয়ে বাড়ির প্রমোটারি ব্যবসায় নামিয়ে শিবুকে ভদ্রসমাজে মেলামেশার উপযুক্ত করে তোলার চেষ্টায় আন্না অনেকটা সফল, মেয়েকে ইংরিজি মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করিয়েছে। এসবই সুলতার গর্বের কারণ।
”দ্যাখ ধানু,” সুলতা গভীর চিন্তার মধ্যে ডুবে গেছেন এমন একটা ভাব নিয়ে বলতে শুরু করলেন। ”টাকাটা তো কোনও ব্যাপার নয়, এম এ পাশ করাটাও নয়। আসল কথা হল যত্ন নিয়ে ফাঁকি না দিয়ে পড়ানো। কিন্তু পড়াবে কী করে তোর তো ছোট্টখাট্ট দুবলা টিঙটিঙে শরীর। তোকে মোটা হতে হবে। আর সেজন্য দু’বেলা আমার এখানে ভাত খেতে হবে। সকালে ইস্কুলে যাওয়ার আগে আর রাতে কালীকে পড়িয়েটড়িয়ে বাড়ি ফেরার আগে। রাজি কি না বল?”
