”না না দিদিমা, বেত কঞ্চি কিছুরই আমার দরকার হবে না। কালী তো শুনেছি একবার শুনলেই সব মনে রাখতে পারে।”
”পারেই তো। তুই আজ পড়া দিয়ে যা, কালকে এসে পড়া ধরলে দেখবি সব বলে দেবে। রমু তো আধঘণ্টা মোটে পড়িয়েছিল তাইতেই কালী দিদিমণিদের তাক লাগিয়ে দেয়। কিন্তু মুশকিল কী হয়েছে জানিস বাবা, ওর এই গতরটা।”
ধানু বলল, ”মুশকিল এখন ততটা হবে না কিন্তু পরে হবে, যদি সাড়ে সাত বছরে কালী ক্লাস ফাইভে ভর্তি হয়।” কথাটা বলে সে আড়চোখে কালীর দিকে তাকাল। মাথা নামিয়ে কালী তখনও অ আ, ক খ লেখা কাগজের দিকে তাকিয়ে, ঠোঁট নড়ছে।
”কালী, তুমি এখন খেয়ে নাও, পরে পড়বে।” ধানু বলল।
”খাচ্ছি।” কালী মুখ তুলে হাত বাড়াল রুটির দিকে। ”ধানুদা, তুমি আর একবার অক্ষরগুলো চিনিয়ে দেবে? আচ্ছা, এটা তো হস্বই আর এটা ওঔ, তাই না?”
ধানু শুধু অবাক চোখে তাকিয়ে ঢোক গিলে বলল, ”হ্যাঁ।”
”আরে এটা গ, এটা ইঁও, এটা থ, এটা….?” কালী জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল ধানুর দিকে।
”দন্তান্ন। তারপর প ফ…।”
কালী হাত তুলে তাকে থামিয়ে বলল, ”জানি।”
সুলতা ঝকঝকে চোখে তাকিয়ে বললেন, ”কী বলেছিলুম।” তারপর কালীকে বললেন, ”লক্ষ্মী বাবা, রুটিগুলো খেয়ে নে, জুড়িয়ে যাচ্ছে।”
”না দিদিমা আগে পড়া শেষ করি তারপর খাব।” কাগজগুলো নিয়ে কালী ঘর থেকে বেরিয়ে বাইরে দালানে গিয়ে বসল।
এখন ধানুর মনে হচ্ছে একবছর পর কালী ক্লাস ফাইভে পড়তে বড় বাড়িতে যাবে। সে বলল ”দিদিমা সামনের বছর কালী যদি ফাইভে পড়ে তবে পাঁচ বছর পরে মাধ্যমিক পরীক্ষায় কত বছর বয়সে বসবে?”
”এখন সাড়ে ছয়, সামনের বছর সাড়ে সাত, তার সঙ্গে পাঁচ যোগ কর, কত হয়?”
”সাড়ে বারো। অত কম বয়সে তো পরীক্ষা দেওয়া যায় না। আপনি অন্তত আর চার বছর বয়স বাড়ান।”
সুলতার মাথায় এবার বাজ ভেঙে পড়ল। ”লোকে তো ছেলেমেয়ে ইস্কুলে ভর্তি করার সময় বয়স কমায়! কালীর বয়স বাড়াতে বলছিস? এ কী সব্বোনেশে কথা। এখন কী করে বাড়াব? মিনিসিপালের বাথ সাট্টিফিকেট কি ফেলে দোব?”
”না, না, দিদিমা ফেলবেন না।” ধানু আঁতকে উঠল। ”ব্যবস্থা করে জন্মসালটা চার বছর শুধু পিছিয়ে দিতে হবে। শ’দুয়েক টাকা খরচ করলেই কালীর বয়স বাড়ানো যাবে। বড় বাড়ির যতীন মাস্টারমশাই এইসব ব্যবস্থা করেন। কত ছেলের বয়স কমিয়ে সার্টিফিকেট বার করে এনেছেন আর এ তো বাড়ানো।”
”তা হলে তাই করে দিস বাবা। লেখাপড়া করতে গেলে যে অ্যাতো হ্যাপায় পড়তে হবে কে জানত। আর কী কী করতে হবে বলে দিস।”
”কালীর হাফপ্যান্ট পরাটা বন্ধ করতে হবে। বড্ড বেখাপ্পা দেখায়। লোকজন বারবার তাকাবে তাতে ও অস্বস্তিতে পড়বে। গড়িয়ায় রেডিমেড ফুলপ্যান্টের অনেক দোকান আছে একজোড়া কিনে দিন।”
”এই তো বাপু আবার খরচের ধাক্কায় ফেললি। ধুতি পরলে হয় না? ওর দাদামশায়ের তিন—চারটে ধুতি তোলা আছে, ছেঁড়াখোড়া নয়, আস্ত।”
ধানু মাথা নেড়ে বলল, ”প্যান্টে অনেক সুবিধে দিদিমা, দেখেন না এখন বেশির ভাগ লোক প্যান্ট পরে। কালীর তো বয়স কম। ও লাফাবে ছুটবে ঝাঁপাবে তখন তো ধুতি খুলে যেতে পারে।”
সুলতার মনে হল ছেলেটা বিচক্ষণও বটে। ”বেশ কালকেই কালীকে বিকেলে নিয়ে গিয়ে তুই কিনে নিস। কত পড়বে একজোড়ার দাম?”
কয়েক সেকেন্ড ভেবে নিয়ে ধানু বলল, ”চারশো টাকায় দুটো প্যান্ট হয়ে যাবে। যদি আরও ভাল চান তো বারো—তেরোশো টাকা।”
”ওরে বাবা বলিস কী।” অত টাকা কিন্তু আমার নেই। রোববার আন্না আসবে ছেলেকে দেখতে, বলব দুটো প্যান্ট কিনে দিয়ে যা নয়তো শিবুর পুরনো দুটো পাঠিয়ে দে।”
রবিবার ধানুর স্কুলে যাওয়া নেই, ভোরে বাজারে সবজি আনাজ পৌঁছে দিয়ে, ঘণ্টাতিনেক নিজের পড়া করে আর বোনেদের পড়িয়ে কালীর অ আ ক খ কতদূর এগোল জানার জন্য রওনা দিল সুলতার বাড়ি। আন্নাকালী তার ছোট্ট মেয়ে কৃষ্ণকলিকে সঙ্গে নিয়ে সন্দেশের বাক্স হাতে তখনই হাজির হয়েছে। বোনকে দেখেই কালী ছুটে গিয়ে দু’হাতে তাকে তুলে বনবন করে ঘোরাতে শুরু করল। সাত আট পাক ঘুরিয়ে নামিয়ে দিয়ে তারপর জড়িয়ে ধরল মাকে। প্রায় একমাস পর সে মাকে কাছে পেয়েছে।
”জানো মা, আমি ইস্কুলে ভর্তি হয়েছি।” গর্বে আর আনন্দে কালী উচ্ছ্বসিত।
সুলতা বললেন, ”দিলুম শিক্ষা নিকেতনে ভর্তি করে। কাল থেকে পড়তে যাবে। বড়দিমণিকে অনেক করে বলে ফোর কেলাসে নিইয়েছি তবে বলে দিয়েছেন, ওয়ান কেলাসে নামিয়ে দেবেন যদি পড়া না পারে। একটা ছেলেকে রেখেছি পড়াবার জন্য, কাল পড়া দিয়ে গেছে। আন্না তোর কাছে হাজারখানেক টাকা হবে?”
অবাক হয়ে আন্না বলল, ”অত টাকা! কেন কী দরকার?”
”কালীর দুটো ফুলপ্যান্ট কিনতে হবে আর সাট্টিফিকেটে ওর বয়স বাড়াতে দুশো টাকা খরচা লাগবে। চটিটারও তো এখন তখন অবস্থা। জামাইয়ের তো অনেক প্যান্ট আছে দুটো প্যান্ট আর জামা গেঞ্জি পাঠিয়ে দিস না, কালীর গায়ে লেগে যাবে।”
আন্না ভ্রুকুটি করে বলল, ”আমার ছেলে পুরনো জামাকাপড় পরবে কেন, ও ভিখিরি, না হাঘরে।” হাতের ব্যাগ খুলে সে পঞ্চাশ ও একশো টাকার নোট মুঠোয় বার করে মা’র হাতে দিয়ে বলল, ”তোমার কাছে রেখেছি ডাকাত না হয়ে যাতে মানুষ হয় আর সেজন্য যত টাকা লাগে আমি দোব। ভগবান আশীব্বাদ করে ওকে আশ্চর্য রকমের একটা শরীর দিয়েছেন পিথিবীতে আর কোনও ছেলের এমন বডি আছে? আগের জন্মে কত যে পুণ্যি করেছিলুম তাই এ জম্মে আমি ওর মা হয়েছি।” বলতে বলতে আন্নার দু’চোখ ছলছল করে উঠল।
