ধানু দাঙ্গা থামাতে মঠে ঢুকে গেছল। (পরে অবশ্য স্বীকার করে বোকামি করে ফেলেছিল।) এবং একটা বাঁশ মাথায় পড়তেই দু’হাতে মাথা চেপে বসে পড়ে। আর এক ঘা পিঠে পড়বে ধরে নিয়ে সে অপেক্ষা করতে থাকে কিন্তু বাঁশ আর পড়ল না। ভয়ে ভয়ে মুখ তুলে দেখে হাফপ্যান্ট পরা একটা লোক বাঁশ মুঠোয় ধরে টানাটানি করে চলেছে। অবশেষে হ্যাঁচকা টানে বাঁশটা ছাড়িয়ে দিল।
”পালান এখান থেকে।”
লোকটির কথামতো ধানু দৌড়ে মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে গেল। মাথা থেকে অল্প রক্ত পড়েছিল। জখমটা গুরুতর হয়নি। ডাক্তারবাবু মলম লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে একটা ইঞ্জেকশন দিয়ে দেন। পরদিন ভোরে সে প্রতিদিনের মতো সবজি বইতে ভ্যানরিকশা নিয়ে বেরোয়, স্কুলেও যায়।
বিকেলে সে সুলতার বাড়িতে হাজির হল। সদর দরজার পাশে টানা রোয়াক। তাইতে পা ঝুলিয়ে বসে সেই লোকটা, গতকাল যে বাঁশ ধরে ফেলে তাকে বাঁচিয়ে দিল। হাতে চালভাজার বাটি, পা দোলাতে দোলাতে চালভাজা খাচ্ছে। ধানুকে দেখে রোয়াক থেকে লাফিয়ে নামল।
”আপনি কি ধানুদা?”
”হ্যাঁ, আপনি?”
”আমি কালী।” বলেই একগাল হাসি। ”দিদা বলেছে এখন থেকে আমি তোমার ছাত্তর।”
ধাতু বলল, ”ছাত্তর নয় বলবে ছাত্র।”
কালীকে শিক্ষাদানের প্রাথমিক কাজ এইভাবেই ধানু শুরু করল।
.
প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদের এই বিনামূল্যে পড়ুয়াদের দেওয়া হয়। কিন্তু ধানকুড়ির এই প্রাথমিক স্কুলে সেইসব বই এখনও এসে পৌঁছয়নি। তা হলে কালী কী বই পড়বে?
ওর সঙ্গে প্রথম কথা বলার পরের দিন ধানু তার পড়শি নীলামাসির মেয়ের অঙ্ক আর বাংলা বই কয়েক ঘণ্টার জন্য ধার করে নিয়ে এল। ক্লাস টু—এ পড়ে মেয়েটি। বিনামূল্যে স্কুল থেকে পাওয়া ওইসব বই পুরনো। বছর শেষ হলে বই ফিরিয়ে দিতে হয় স্কুলে, কেন না নিচু ক্লাস থেকে যারা উঠেছে তারা এবার পড়বে এই বই।
ধানুর কথামতো সুলতা লাইনটানা ফুলস্ক্যাপ কাগজ, শ্লেট ইত্যাদি কিনে রেখেছিলেন। কালী পাঁচ আর পাঁচে দশ হয় জানে, পাঁচ থেকে পাঁচ বাদ দিলে শূন্য হয় জানে, পাঁচকে পাঁচ দিয়ে গুণ করলে পঁচিশ হয় এটাও জানে, শুধু ভাগটাই জানে না।
নব গণিত মুকুল বইটির প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত দেখে ধানু বুঝে গেল এই বই কালীর আর পড়ার দরকার নেই। এখন যেটা ওর দরকার অক্ষর আর রাশি চিনে পড়তে শেখা এবং লিখতে পারা। কিশলয় বইটি সে কালীর সামনে খুলে ধরে বলল, ”তোমাকে এইসব অক্ষর চিনে পড়তে হবে আর লিখতে হবে। পারবে তো?”
সুলতা দু’জনের পাশে বসে ধানুর কথা শুনছিলেন, গজগজিয়ে বললেন, ”তো মানে? হবে, পারতে হবে। ওসব তো—টো চলবে না। সামনের বছরই বড় বাড়িতে ভর্তি হতে হবে। মনে থাকে যেন। এরপর কোমল স্বরে বললেন, ”হ্যাঁরে ধানু, গুড় দিয়ে দুটো রুটি খাবি? এখুনি বানিয়ে দিচ্ছি।”
উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করে সুলতা রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন। কালী সহজপাঠ বই খুলে ছবি দেখছে। একটা পাতার উপরের কোণে আঁকাবাঁকা অক্ষরে নাম লেখা। কালীর কৌতূহল হল নামটা জানতে।
”ধানুদা এটা কী লেখা?”
ধানু দেখল লেখা রয়েছে ‘পিংকী শিকারী’। বলল, ‘পিঙ্কি শিকারি। একটা মেয়ের নাম এটা। বইটা তার।”
”নিজের হাতে লিখেছে।” কালীর চোখে সমীহ ফুটে উঠল।
অক্ষরগুলোর চেহারা দেখে ধানু বলল, ”হ্যাঁ, নিজের হাতে লিখেছে।”
আবদেরে স্বরে কালী বলল ”ধানুদা, নিজের হাতে আমিও নাম লিখব, শিখিয়ে দেবে?”
ধানুর ভাল লাগল কালীর এই ইচ্ছাটা নিজে থেকে জেগেছে দেখে, সেই সঙ্গে খেয়াল হল ওর বয়স মাত্র সাড়ে ছয় বছর। মনে পড়ল সুলতার কথাগুলো , ”মনটা বাচ্চচাছেলের লোকে তো তা জানে না, তারা বড় ছেলে ভেবে সেইরকম…’
তারপর সে ক—এর পাশে আ—কার এবং ল—এর পাশে দীর্ঘ ঈ চিহ্ন এঁকে উচ্চচারণ করে বুঝিয়ে দিল চিহ্নগুলো দিয়ে কী রকমভাবে কালী শব্দটি তৈরি করা হল। কিঙ্কর লিখতে গিয়ে তার মনে হল ‘ঙ্ক’—টা বেশ খটমট। পিংকী বানানটার মতো লেখা কালীর পক্ষে সহজ হবে যদি কিংকর লেখে। ধানু তাই লিখল। ঢালি শব্দটায় জটিলতা নেই। পুরো নামটা লিখে সে বলল, ”এভাবে কিন্তু অক্ষর পরিচয় হয় না। তোমাকে অ, আ, ক খ থেকে শিখতে হবে।”
এই বলে কাগজে সে স্বরবর্ণ অ থেকে ঔ এবং ব্যঞ্জনবর্ণ ক থেকে চন্দ্রবিন্দুপর্যন্ত মুক্তোর মতো অক্ষরে লিখে বলল, ”বইগুলো তো আজকেই পিঙ্কিকে ফেরত দিতে হবে নইলে বই দেখেই করতে পারতে। তুমি আমার এই লেখা দেখেই শুরু করো বরং। অ—র নীচে দশটা অ, আ—র নীচে দশটা আ লিখবে ঠিক যেভাবে আমি লিখেছি, একেবারে চন্দ্রবিন্দু পর্যন্ত। পারবে তো আজ রাতের মধ্যে।”
কালী একদৃষ্টে ধানুর লেখা অক্ষরগুলোর দিকে তাকিয়ে। প্রশ্নের জবাবে শুধু মাথা নাড়ল। গরম রুটি আর গুড় দু’জনের জন্য দু’টি স্টিলের থালায় নিয়ে এলেন সুলতা।
”আগে খেয়ে নে তারপর পড়া। পেটে খিদে নিয়ে পড়াশুনো হয় না।”
ধানু হেসে থালা টেনে নিতে গিয়ে দেখল সুলতার হাতে একটা শুকনো বাঁশের কঞ্চি। অবাক হয়ে তাকাতেই সুলতা বললেন, ”রান্নাঘরে পেলুম, তোর কাজে লাগবে। চার বছরের পড়া এক বছরে তুলে দেওয়া কি সোজা ব্যাপার।” বলেই তিনি কঞ্চিটা সপাং করে মেঝেয় কষালেন। ”পাঠশালায় আমাদের সময় গুরুমশায়দের হাতে বেত থাকত। বেতটা হাতে নড়ে উঠলেই ভুলে যাওয়া নামতা মনে পড়ে যেত।”
