সুলতার কথা শুনে ধানুর মন কালীর জন্য সহানুভূতিতে ভরে গেল। সে বলল, ”দিদিমা, আপনি ওর জন্য ভাববেন না, আমি যতটা পারি ওকে দেখব। এখন ও কোথায় দেখতে পাচ্ছি না তো!”
”বোধহয় খালধারের মাঠে গেছে বল খেলা দেখতে, গিয়ে দ্যাখ তো।”
ধানু চলে যাচ্ছে সুলতা ডাকলেন। ”আসল কথাটাই তো হল না, মাইনে নিবি কত?”
ইতস্তত করছে ধানু। কখনও টিউশনির কাজ সে করেনি, কত টাকা চাইবে বুঝে উঠতে পারছে না। সুলতা বুঝতে পারলেন ধানুর জলে পড়ে যাওয়া হাঁসফাসে অবস্থাটা। ছেলেটিকে তার ভাল লেগেছে।
”বাড়িতে আছে কে কে?”
”মা আর দুটো ছোট বোন।”
”বাবা?”
”গত বছর যক্ষ্মায় মারা গেছে।”
”সংসার চলে কী করে?”
ধানু পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে মাটি খুঁড়তে লাগল মুখ নামিয়ে। সুলতা বুঝলেন বলতে চায় না।
”কাল সকাল থেকে পড়াতে আয়।”
”না দিদিমা সকালে পড়াতে পারব না, কাজ থাকে।”
সুলতা গলাটা একটু চড়িয়ে বিরক্ত স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, ”পড়াশুনো তো ভোর ভোর সকালে করলে ভাল করে মাথায় ঢোকে। এই তো আমি বাড়িতে বসেই শুনতে পাই সক্কালবেলা চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে এবাড়ি ওবাড়ির ছেলেমেয়েরা পড়া মুখস্ত করছে। কালীকেও তো চার বছরের বই এক বছরই শেষ করে ফেলতে হবে নইলে নীচের ক্লাসে নামিয়ে দেবে। তুই তো সকালে এসে ওকে মুখস্ত করাবি।”
”তাকিয়ে রইলেন সুলতা তাঁর কথাগুলো ভুল না ঠিক ধানুর চোখ থেকে তা যাচাই করে নেওয়ার জন্য। ধাতুর চোখে বিব্রত ভাব।
”না দিদিমা, আমি পারব না।” ধানুর গলা যথেষ্ট কঠিন ও জেদি।
সুলতা আশা করেননি এইটুকু একটা ছেলে যে অভাবের সংসার থেকে এসেছে,স্পষ্ট ভাষায় বলবে ‘পারব না।’ তার মানে কাজটা সে নেবে না। কিন্তু কেন?
”ভোরবেলায় সূর্য ওঠার আগেই আমি বাবার ভ্যানরিকশাটা নিয়ে বেরোই। ওই পূব দিকে বাগডাঙা কুসুমতলা লাউগেছে যেতে হয়। চাষিরা আমার রিকশায় তাদের খেতের আনাজপাতি বেগুন, নটে, লাউ, কলমি শাক, কচু, ডাব, কাঁচকলা এইসব তুলে দেয়। সেগুলো সন্তাোষপুরের বাজারে পৌঁছে দিতে হয়। তারপর বাড়ি ফিরে স্কুলের পড়া নিয়ে বসি, তিন ঘণ্টা পড়ি তারপর স্কুলে যাই। না দিদিমা, আমার কাজ আর পড়া ফেলে সকালে আসতে পারব না।” যে কথাটা উহ্য রয়ে গেল— তাতে যদি পড়ানোর চাকরিটা হাতছাড়া হয় তো হবে।
সুলতা বাস্তব বোঝেন, বুদ্ধিমতী এবং নমনীয় চরিত্রের। ধানু তাঁর স্নেহ ও সমীহ ইতিমধ্যেই অর্জন করে ফেলেছে। বুঝে গেছেন মেয়েলি গলার এই কিশোর শান্ত ধাতের, একবগগা, সৎ। কালীর জন্য এমন একজনকেই তিনি চাইছেন।
”দিনে কত টাকা রোজগার করিস?”
”কুড়ি টাকা। মা সকালে ন’টার মধ্যে দুটো বাড়িতে রান্নার কাজ করে, আটশো টাকা পায়। এই দিয়ে আমাদের সংসার চলে।”
”তা হলে কালই বিকেল—সন্ধে নাগাদ আয়। দু’দিন তো পড়া তারপর মাইনেপত্তর ঠিক হবে।”
সুলতার বাড়ি থেকে মিনিটতিনেক হেঁটে ধানু এল খালধারের ফুটবল মাঠে। খাল বলতে একটা বারো মিটার চওড়া নালা। জল খুবই কম, হেঁটে পার হওয়া যায়। পঞ্চাশ বছর আগে এটা ছিল জলভরা খাল এবং তাই দিয়ে নৌকা চলত। খালের ধারে মিউনিসিপ্যালিটির বড় মাঠ। পরিচর্যা করা হয় না, এখানে ওখানে সামান্য ঘাস ছাড়া বাকিটা ন্যাড়া এবড়ো—খেবড়ো উঁচু নিচু মাটিতে ঢাকা। দু’দিকে কাঠের গোলপোস্ট ও ক্রসবার। মাঠ ঘিরে বট, তাল, নিম অশ্বত্থগাছ আর ঝোপঝাড়। ধান্যকুড়িয়া স্পোর্টস অ্যাসোসিয়েশন ও ধান্যকুড়িয়া আদর্শ উচ্চচ মাধ্যমিক শিক্ষা নিকেতনকে মাঠে খেলা করার অনুমতি দিয়েছে মিউনিসিপ্যালিটি।
মাঠে তখন লিগ খেলা চলছে। স্থানীয় বালক সঙ্ঘের সঙ্গে উদয়পুরের অরুণোদয় ক্লাবের। মাঠ ঘিরে পাঁচ—ছ’শো লোক। বেশিরভাগই পাশের গ্রাম উদয়পুরের। এই ম্যাচটা লিগ জেতার জন্য উদয়পুরের কাছে খুবই দরকারি। আজ তারা একটা পয়েন্ট খোয়ালে ধান্যকুড়ির পূর্বাচল ক্লাবের চ্যাম্পিয়ান হওয়ার রাস্তাটা খুলে যাবে। মাঠ ঘিরে টানটান পরিস্থিতি। পূর্বাচলের সাপোর্টাররা চিৎকার করে বালক সঙ্ঘকে চাগিয়ে যাচ্ছে।
ধানু যখন মাঠে এল তখন ম্যাচ শেষ হতে বাকি তিন মিনিট এবং ফল ০—০। বালক সঙ্ঘের গোলের পিছনে তিনটে তালগাছের ধারে সে এসে দাঁড়াল। সেখানে রয়েছে উদয়পুরের সাপোর্টাররা। হঠাৎ গোল খেয়ে গেল বালক সঙ্ঘ। লব করে দেওয়া বলটা ব্যাকের মাথার উপর দিয়ে বালক সঙ্ঘের পেনাল্টি স্পটের উপর পড়ছিল অরুণোদয়ের স্ট্রাইকার ছিটকে ঢুকে গিয়ে বলটা গোলে ঠেলে দেয়। রেফারি গোলের বাঁশি বাজাতেই উদয়পুরবাসীরা উল্লাসে মাঠে নেমে ডিগবাজি খেতে শুরু করে, গোলদাতাকে জড়িয়ে সাত—আটজন মাঠে গড়াগড়ি দিতে থাকে। লাইন্সম্যান যে অফসাইডের জন্য ফ্ল্যাগ তুলে রয়েছে সেটা আর তারা লক্ষ করেনি। রেফারি বলটা জমিতে বসিয়ে বালক সঙ্ঘকে যখন ফ্রি কিক দিল তখনই শুরু হয়ে গেল মাঠের মধ্যে দাঙ্গা। গাছের ভাঙা ডাল, বাঁশের খেটো নিয়ে মাঠে ঢুকে পড়ল কিছু লোক। তাদের মুখে একটাই কথা, ”জোচ্চচুরি, জোচ্চচুরি। আমাদের চ্যাম্পিয়ান হতে না দেবার জন্য চক্রান্ত। ল্যাইন্সম্যানকে ম্যানেজ করা হয়েছে।”
বালক সঙ্ঘ আর পূর্বাচলের লোকেরা ধানকুড়ির। সংখ্যায় তারা তো বেশি হবেই। বাইরের লোকেরা তাদের পিটোবে এটা তারা সইবে কেন। সুতরাং ধানকুড়ির লোকেরাও হাতের কাছে যা পেল তাই নিয়ে নেমে পড়ল। ফটাফট ফটাফট আওয়াজ মাঠ জুড়ে। মাঝে মধ্যে মানুষের গলায় ”বাবা রে, মরে গেলুম।” ”মার মার, মাথা ভেঙে দে।” সুখের বিষয় ছোরা, বোমা বা পাইপগান যা এইরকম মারপিটে ব্যবহার করা হয়, কোনও পক্ষের কাছে এইসব অস্ত্র ছিল না। কিন্তু কাঠ, বাঁশ, মাটির ঢেলা, ইট তাই—বা কম কী।
