রাধারানি মাথা নেড়ে সুলতাকে সমর্থন জানিয়ে বললেন, ”অসম্ভব নয়। যে অ আ ক খ, এক দুই তিন চার কী জিনিস গতকালও জানত না, সে গড়গড়িয়ে পদ্য মুখস্থ বলল, যোগ বিয়োগ গুণ পর্যন্ত শেলেট পেন্সিল ছাড়াই করে দিল মাত্র আধঘণ্টার কোচিং নিয়ে। দেবীদি, এ ছেলে চার কেন, পাঁচ বছরের পড়া এক বছরে হজম করে দেবে। এতদিন পড়াচ্ছি অন্তত দুশো ছেলেমেয়ে তো দেখলুম, অভিজ্ঞতাও কম হয়নি কিন্তু এরকম ব্রেন জীবনে দেখিনি।”
দেবিকা চুপ করে কীসব ভাবলেন। মাথা চুলকে বললেন, ”ঠিক আছে ক্লাস ফোরেই পড়ুক, তবে টেম্পোরারি ছাত্র হবে একমাসের জন্য। যদি দেখি প্রোগ্রেস করেছে তবে পার্মানেন্ট স্টুডেন্ট করব। না পারলে ক্লাস ওয়ানে নামিয়ে দোব, রাজি?”
”রাজি।” সুলতা চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলেন।
কালী পাঁচ মিনিটের মধ্যে ভর্তি হয়ে গেল। বড়দিদিমণি বললেন ”সামনের সোমবার থেকে ক্লাস করুক।” সুলতা যখন ধান্যকুড়িয়া প্রাথমিক আদর্শ শিশুশিক্ষা নিকেতন থেকে বেরিয়ে আসছেন বড়দিদিমণি তখন পিছু ডাকলেন।
”মাসিমা, কালীকে মেপেছেন?”
”ওই দ্যাখো বলতে ভুলেই গেছি। তক্তপোশে শুইয়ে কালকেই মেপেছি, সাড়ে তিনহাত থেকে এই দু’ আঙুল কম। তা হলে কতটা হল?”
”আপনার হাতের মাপ তো পুরুষদের মতো আঠারো ইঞ্চি নয়, একটু কমই হবে। তা হলেও…”বড়দিদিমণি মনে মনে একটা অঙ্ক কষে নিয়ে বললেন, ”পাঁচফুট দু’ইঞ্চির মতো।” তারপরই শিউরে উঠে প্রায় আর্তনাদের মতো বললেন ”সাড়ে /ছ’বছর/বয়সেই এই, তা হলে বারো বছর বয়সে কী দাঁড়াবে!”
কথাগুলো সুলতা বা কালী শুনতে পেল না, তারা ততক্ষণে হাঁটা দিয়েছে বাড়ির দিকে। রাধারানি তখন হঠাৎ ধড়মড়িয়ে প্রায় ছুটে গেলেন সুলতাকে ধরার জন্য।
”মাসিমা, মাসিমা, দাঁড়ান, একটা কথা ছিল।”
অবাক সুলতা দাঁড়িয়ে পড়লেন।
”আপনি তখন বললেন কালীর জন্য মাস্টার রাখবেন।”
”রাখবই তো। আপনার হাতে মাস্টার আছে?”
”আছে। খুব ভাল ছেলে বড়বাড়িতে ক্লাস টেনে পড়ে। খুব গরিব। থাকে আমার পাশের পাড়ায়। কয়েকটা টাকা পেলে ওর খুব উপকার হবে। আমি বলছি খুব যত্ন করে কালীকে পড়াবে।”
”বলছেন ভাল করে পড়াবে? বেশ পাঠিয়ে দেবেন আজ বিকেলে। চেনে আমার বাড়ি?”
”চিনে নেবে, এখানকারই ছেলে তো।”
রাধারানি স্কুলে ফিরে আসামাত্র দেবিকা তাকে ডাকলেন। স্কুলে মোট তিনজন পড়ান। তৃতীয়জন অধীরবাবু ম্যালেরিয়ায় শয্যাশায়ী থাকায় অনুপস্থিত।
”রাধা, ক্লাস ওয়ানকে ছুটি নিয়ে দিচ্ছি। ক্লাস টুকে মাছ আঁকতে বসিয়ে দাও। অঙ্ক দিচ্ছি ক্লাস থ্রিকে, ফোরকে পদ্য মুখস্থ করাও। আর শোনো, যা ভাল করে জানো না সেই বিষয়ে আগ বাড়িয়ে কিছু বলতে যেয়ো না। পাখি সব করে রব বিদ্যাসাগর মশায়ের লেখা তোমায় কে বলল? ওটা তো মাইকেলের লেখা, পড়েছ কিছু ওঁর লেখা?”
”বাহ পড়ব না? উচ্চচ মাধ্যমিকে তো পলাশীর যুদ্ধ আমাদের পড়তে হয়েছে।”
.
বিকেলে একটি ছেলে হাজির হল সুলতার বাড়ি। পরনে হাফপ্যান্ট হাফশার্ট। কালী যতটা কালো, ছেলেটি ততটাই ফরসা, কালীর থেকে অন্তত ইঞ্চি চারেকের খাটো, ওজনেও প্রায় দশ কেজি কম।
সুলতা আপাদমস্তক দেখে বললেন, ”আগে তো কখনও দেখিনি, থাকিস কোথায়?”
”শেতলাতলায়।” ছেলেটির কণ্ঠস্বর কোমল ও মিষ্টি, প্রায় মেয়েলি।
”ওটা তো বামুনপাড়া, নাম কী?”
”সুধন্য হালদার। ডাক নাম ধানু।”
”টেন ক্লাসে পড়িস? অঙ্কে কত নম্বর পেয়েছিলিস ক্লাসে ওঠার পরীক্ষায়?”
”একশো।”
”কতোর মধ্যে একশো?” সুলতা হঠাৎ গম্ভীর করে ফেললেন স্বর।
ধাতু ভ্যাবাচ্যাকা। এমন প্রশ্নের মুখে কখনও আগে পড়েনি। উত্তর হাতড়াতে শুরু করল। একটা কথা সে বুঝে গেছে, তার সামনে এখন যে মহিলা লেখাপড়া সম্পর্কে তার কোনও ধারণা নেই কিন্তু কাজটা তার চাই এবং ইনি যাতে বিরূপ না হন এমনভাবে উত্তরটা দিতে হবে।
”একশো পাঁচের মধ্যে একশো।”
”হুমম পাঁচ নম্বর কম।” সুলতার ভুরু কুঁচকে উঠল। ”পুরো নম্বর পাসনি কেন?”
”ওটা নিয়ম। অঙ্ক থেকে পাঁচ নম্বর তুলে রাখা হয়। অন্য কোনও বিষয়ে নম্বর কম পড়লে তখন ওই তোলা নম্বরটা থেকে দেওয়া হয়। আমার নম্বর কম পড়েছিল জীবন বিজ্ঞানে, পাঁচ নম্বর ওখান থেকে দিয়েছিল।”
উত্তর পেয়ে কী বুঝলেন সুলতা, সেটা বুঝতে পারল না ধানু। তবে নম্বরের পথে প্রৌঢ়া আর এগোলেন না। ”তোকে কী করতে হবে ছোটদিদিমণি বলে দিয়েছেন?”
”দিয়েছেন। চার বছরের পড়া এক বছরে করিয়ে দিতে হবে।”
”পারবি?”
”চেষ্টা করব।”
”কী করে চেষ্টা করবি। মারধোর করতে পারবি না কিন্তু। কালী বাচ্চচা ছেলে, সাড়ে ছ’বছর মাত্র বয়স।”
”বাচ্চচাদের আমার খুব ভাল লাগে।”
”কালীকে দেখেছিস?”
”না। তবে রাধামাসির কাছে শুনেছি চেহারাটা একটু বড়সড়।”
”ওকে আগে দ্যাখ, কথা বল, তারপর ঠিক কর ওকে পড়াতে পারবি কি না। ওর মাথাটা খুব ভাল আর ঠাণ্ডা ছেলে, কম কথা বলে। মুশকিল কী জানিস বাবা, এমন একটা গতর ও পেয়েছে, যেজন্য লোকজনের নজর পড়ে ওর ওপর। সবাই তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে। কেউ বিশ্বাস করে না ওর বয়স এত কম। আর সেজন্যই কালী লোকজন এড়িয়ে এড়িয়ে চলে। মনটা বাচ্চচাছেলের, লোকে তো তা জানে না, তারা বড়ছেলে ভেবে সেইরকম ব্যবহার করে ওর সঙ্গে। তাইতে ও অবাক হয়ে যায়। ওর বয়সিরা ওর সঙ্গে মিশতে চায় না, খেলতে চায় না। মনে মনে সেজন্য ও কষ্ট পায়।”
