পরের দিন কালীকে সঙ্গে নিয়ে সুলতা শিশুশিক্ষা নিকেতনে হাজির হলেন। দেবিকা তখন ক্লাস নিচ্ছিলেন। ওদের অপেক্ষা করতে হল। দাওয়ায় মাদুরে বসে ক্লাস ওয়ানের প্রায় ত্রিশটি বাচ্চচা শ্লেটে দাগা বুলোচ্ছে স্বরবর্ণের অক্ষরে। রোগা লম্বা ব্যাজার মুখের এক শিক্ষিকা চেয়ারে বসে । টেবল নেই। তার হাতে বাঁশের একটা ছ’ফুট লম্বা কঞ্চি। দাওয়ার পাশে দাঁড়িয়ে কালী ও সুলতা। দেবিকা ক্লাস ফোরের ঘরে নারকেল দড়িতে দেওয়ালে ঝোলানো কালো বোর্ডে সিঁড়ি ভাঙা অঙ্ক পনেরোটি ছাত্রকে কষে বোঝাচ্ছিলেন। এ ঘরে অবশ্য ছাত্রদের জন্য বেঞ্চ আছে।
ক্লাস ওয়ানের শিক্ষিকা কঞ্চি দিয়ে তৃতীয় সারিতে বসা এক বাচ্চচার মাথায় ঠক করে মেরে ধমকে উঠলেন, ”অ্যাই, তখন থেকে আ—টাকে ঘষে ঘষে মোটা করছিস, যেমন করে দাগ বুলোতে বলেছি সেইভাবে বুলিয়ে বুলিয়ে মোটা কর। ” এরপর তিনি অপেক্ষমাণ দু’জনের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কোঁচকালেন। ভারিক্কি স্বরে বলে উঠলেন, ‘এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? কাউকে দরকার?”
সুলতা ঢোঁক গিলে বললেন, ”হ্যাঁ, ভর্তি করাব বলে এসেছি।”
”তাকে নিয়ে আসুন।”
”কাকে?”
”কাকে আবার, যাকে ভর্তি করাবেন তাকে।”
”এই তো সঙ্গে রয়েছে।” সুলতা মাথা হেলিয়ে দেখিয়ে দিলেন। ওয়ানের শিক্ষিকার চোখ—মুখের অবস্থা ঠিক সেইরকমই হল যা গতকাল বড়দিদিমণির হয়েছিল। কয়েক সেকেন্ড কালীর দিকে তাকিয়ে থেকে ক্ষীণস্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, ”কোন ক্লাসে ভর্তি হবে, ফোরে?”
”আমি তো তাই—ই চেয়েছি, কিন্তু বড়দিমণি বললেন, আগে ওয়ানে তো ভর্তি হোক।”
শিক্ষিকার হাতের কঞ্চিটা ধীরে ধীরে নেমে এসে দাওয়ায় ঠেকল। ফ্যালফ্যাল চোখে কালীর দিকে তাকিয়ে রইলেন।
সিঁড়ি ভাঙা অঙ্ক বোঝানো হয়ে গেছে। দেবিকা দরজা দিয়ে উঁকি দিয়ে সুলতাকে দেখতে পেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। ”এসে গেছেন। রাধা, দ্যাখো তো এই ছেলেটিকে তোমার ক্লাসে ভর্তি করা যায় কিনা?”
রাধা অর্থাৎ ক্লাস ওয়ানের শিক্ষিকার মুখ ইতিমধ্যেই শুকিয়ে গেছে। ক্ষীণস্বরে বললেন, ”দেবীদি, ক্লাস ওয়ানে এ পড়বে?”
”তুমি একটু পরীক্ষা করে দেখো না, হয়তো ক্লাস ফোরেও অ্যাডমিট করা যেতে পারে।”
একটু ভেবে রাধারানি গায়েন জিজ্ঞাসা করলেন কালীকে, ”পদ্য পড়েছ?”
”হুঁ।” কালী মাথা হেলিয়ে দিল।
”জানেন বড়দিমণি, কাল এখান থেকে বাড়ি ফেরার পথে মর্জিনার বাড়িতে গেছলুম, ওর সেজছেলে রহিম বড় স্কুলে ক্লাস ফাইভে পড়ে। মর্জিকে বললুম রমুকে আমার বাড়িতে একবার পাঠিয়ে দিস তো স্কুল থেকে ফিরলেই যেন কালীকে একটু পড়া করিয়ে দিয়ে যায়। বিকেলে রমু এসে বাদাম আর বাতাসা দিয়ে চালভাজা খেতে খেতে কালীকে আধঘণ্টা পড়িয়েছে। তারপর মাঝরাত্তির পর্যন্ত কালী শুধু বিড়বিড় করে মুখস্থ করে গেছে রমু যা যা ওর কানে ঢুকিয়ে দিয়ে গিয়েছিল। বল না কালী সেই পদ্যটা যেটা আমাকে রাত্তিরে শোনালি।”
সুলতা থামামাত্র কালী ঝড়ের বেগে শুরু করল, ”পাখি সব করে রব রাতি পোহাইল, কাননে কুসুম কলি সকলি ফুটিল, রাখাল গরুর পাল লয়ে যায় মাঠে, শিশুগণ দেয় মন নিজ নিজ পাঠে, ফুটিল মালতী ফুল সৌরভ ছুটিল, পরিমল লোভে অলি আসিয়া জুটিল।” এক নিশ্বাসে বলে কালী থমকে গেল। পরের লাইনটা মনে পড়ছে না। মনে করার জন্য চেষ্টা করতে করতে কালো মুখ বেগুনি হয়ে উঠল, কপালে বিনবিনে ঘাম ফুটল, ঠোঁট চাটল, আড়চোখে তাকিয়ে দিদিমার উৎকণ্ঠিত মুখ দেখে আরও ঘাবড়ে গেল।
উৎকণ্ঠিত চোখ রাধারানি গায়েনেরও। ছেলেটা যদি ফেল করে তা হলে দেবীদি তো বলবেন, থ্রি ফোর নয়, ক্লাস ওয়ানেই ভর্তি হোক। আর এতবড় একটা ছেলেকে ম্যানেজ করা কি সোজা ব্যাপার হবে। ”বলো বলো ভয় কী, মনে করো পরের লাইনটা।” রাধারানি অভয় দিলেন স্নেহ বাৎসল্য গলায় ঢেলে।
এবার মনে পড়েছে কালীর। দুটো লাইন বাদ দিয়ে সে তড়বড়িয়ে শেষ দুটো লাইন বলল, ”ওঠো শিশু মুখ ধোও পর নিজ বেশ, আপন পাঠেতে মনে করহ নিবেশ।” বলেই সে যুদ্ধ জয়ের হাসি হাসল।
উদ্ভাসিত মুখে রাধারানি বললেন, ”শুনলেন দেবীদি, শুনলেন, হুবহু সবটা মুখস্থ বলে গেল। সেই কবে বিদ্যাসাগর মশায়ের ”ভোরের কাজ” পদ্যটা ক্লাস ফোরে পড়েছিলুম আমার আজও মনে আছে।”
দেবিকা চোখে হাসি নিয়ে বললেন, ”অঙ্ক জানো? যোগ বিয়োগ গুণ ভাগ?”
কালী চুপ! সুলতা বললেন ”আধঘণ্টায় আর কতটা পড়া হয়, তবু যতটা পেরেছে অঙ্ক শিখেছে।”
”দেখা যাক। বলো তো পাঁচ আর পাঁচে কত হয়।”
কালী আকাশের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে যোগ দিয়ে বলল, ”দশ।”
রাধারানি প্রায় হাততালি দিয়ে বলল, ”দারুণ মাথা। এ তো ক্লাস ফোরের অঙ্ক।”
”এবার বিয়োগ, পাঁচ থেকে পাঁচ বাদ দিলে কত থাকে হাতে?”
কালী একমুহূর্তও না ভেবে বলল, ”শূন্য।”
দেবিকার মুখের হাসি মুছে গেল। সিরিয়াস হয়ে গেল চাহনি। ”পাঁচকে পাঁচ দিয়ে গুণ করলে কত হয়।”
”পঁচিশ।”
দেবিকার এবার যেন জেদ চেপে গেল। বললেন, ”এবার ভাগ। পাঁচকে পাঁচ দিয়ে ভাগ করলে কত হবে ভাগফল।”
এইবার কালী চুপ। দিদিমার দিকে ফ্যাকাসে মুখে তাকিয়ে রইল। বড়দিদিমণি মুচকি হাসলেন, রাধারানি প্রমাদ গুনছেন।
”ভাগফলের অঙ্ক পর্যন্ত পৌছবার আগেই তো রমুর বাটির চালভাজা শেষ। তড়াক করে লাফিয়ে ফুটবল মাঠের দিকে দৌড় দিল, কালী তা হলে শিখবে কী করে? বড়দিমণি আপনি ওকে ফোরেই ভর্তি করান আমি বাড়িতে মাস্টার রেখে ওকে পড়াব। দেখবেন চার বছরের পড়া ও এক বছরে শেষ করে দেবে।”
