”দিলুম।”
সুলতা এবার গলা আরও নামিয়ে বললেন, ”ডাকাত।”
দেবিকাও ফিসফিস করে বললেন, ”কে ডাকাত?”
”আমার জামাই। মাধ্যমিক পাশ, লেখাপড়া জানা।”
খবরটা শুনে বড়দিদিমণি যতটা শিহরিত হলেন ততটা আতঙ্কিতও। কিন্তু তিনি শক্ত ধাতের মানুষ, ঘাবড়ালেন না।
”আপনি ডাকাতকে জামাই করলেন?”
সুলতা এবার বিরক্ত হয়েই বললেন, ”আমি কেন জামাই করতে যাব? ও তো নিজে থেকেই জামাই হল, শিবু এখানে এসেছিল একটা খোঁজখবর করতে, নস্করবাড়িতে ডাকাতি করবে বলে। তখনই ওর চোখে পড়ে যায় আন্না, আমার মেয়ে এই কালীর মা, দারুণ কবাডি খেলত। নস্করবাড়ির সেজো মেয়ের বন্ধু, ডাকাতির সময় সন্ধেবেলা ওদের বাড়িতে আন্না তখন লুডো খেলছিল। মেয়েদের গা থেকে গয়না খুলতে খুলতে শিবু আন্নার সামনে এসে বলল, ”খোল নাকছাবি, নয়তো নাক কেটে নোব।”
”তারপর?” উদগ্রীব দেবিকা।
”তারপর আর কী, ”নির্বিকার মুখে সুলতা বললেন, ”আন্না টেনে এমন একটা চড় কষাল, শিবু ছিটকে পড়ল।”
”তারপর?” দেবিকা উত্তেজিত। ”ডাকাত চড় খেয়ে ছিটকে পড়ল? ওরে বাব্বা।”
”পড়বে না? আন্নার থাবাটা তো আপনি দেখেননি, এই অ্যাত্তো বড়।” সুলতা দু’হাতের পাঞ্জা পাশাপাশি রেখে দেখালেন।
”তারপর?”
”তিনদিন পর রাতে আমার বাড়িতে ডাকাত পড়ল, কালো কাপড় দিয়ে সবগুলোর মুখ ঢাকা। আমাকে শোবার ঘরে ঢুকিয়ে দরজায় শেকল তুলে দিল। জানালা দিয়ে চিৎকার করে লোকজন ডাকতে লাগলুম। আমার বাড়ি তো গ্রামের একটেরেয় একেবারে কিনারে, মাঠ বনজঙ্গল পেরিয়ে লোক আসতে আসতে ততক্ষণে ডাকাতরা চলে গেছে।”
”জিনিসপত্র গয়নাগাটি টাকাকড়ি সব সাফ করে নিয়ে গেল তো?”
”একটা জিনিসও নেয়নি, যেখানে যা ছিল সব ঠিকঠাক রয়েছে, শুধু আন্না নেই।”
”সে কী।” দেবিকা আঁতকে উঠলেন। ”মেয়েকে তুলে নিয়ে গেল? কেন, চড় মারার বদলা নিতে? মানে খুন করার জন্য?”
”চড় খেয়ে শিবুর টনক নড়ে, তখনই বুঝে যায় এই মেয়েই ডাকাতের বউ হবার উপযুক্ত। তা ছাড়া খুন করে দিলে কি কালী জন্মাত?” সুলতাকে একটু বিরক্ত দেখাল।
”খুন করতে চাইলে তুলে নিয়ে যাবে কেন, বাড়িতেই তো দায়ের এক কোপে আন্নার মুণ্ডুটা নামিয়ে দিতে পারত।”
অপ্রতিভ দেবিকা বললেন, ”তা বটে। আচ্ছা আপনার জামাই ক’টা মুণ্ডু আজ পর্যন্ত নামিয়েছে?”
”তা আমি কী করে বলব, চোখে তো দেখিনি। আর এখনকার ডাকাতরা দা কাটারি সড়কি নিয়ে তো ডাকাতি করে না, এখন তো বোমা বন্দুক মোটরবাইক পিস্তলের যুগ।”
”আপনার মেয়ে আপনার কাছে এখন আসে।”
”খুব কম। কলকাতার বউবাজারে ফেলাট কিনেছে শিবু। আন্না সেখানেই থাকে, বাচ্চচা একটা মেয়েকে নিয়ে। শিবু এখন কলকাতাতেই দল করে কারবার চালাচ্ছে। আন্না ছেলেকে আমার কাছে দিয়ে বলে গেছে, ‘মা তুমি ওকে মানুষ করো, আমার কাছে থাকলে কালীকে ডাকাত বানাবে ওর বাপ। একদিন ওর হাতে একটা পাইপগান দিয়েছিল তোমার জামাই, খেলা করার জন্য।’ শুনে কী বলব বড়দিমণি, বুকটা ধড়াস করে উঠল। আন্নাকে বললুম ভাল করেছিস, কালী আমার কাছেই থাকুক। ওকে পাঠশালায় পড়াব তারপর বড় ইস্কুলে তারপর কলেজে। ভদ্দর সমাজে মেশার উপযুক্ত করে তুলব।”
সুলতা দু’পা এগিয়ে ঝুঁকে বড়দিদিমণির দুটো হাঁটু চেপে ধরে বললেন, ”আপনি কালীকে রক্ষে করুন, নইলে শিবু ওকে নিয়ে গিয়ে ডাকাত বানাবে। দয়া করুন বড়দিমণি।”
শান্ত মানুষ দেবিকা সিঁটিয়ে গেছেন। উঠে দাঁড়িয়ে তাড়াতাড়ি বললেন, ”আপনি একদম চিন্তা করবেন না। কাল ওকে নিয়ে আসুন। ক্লাস ওয়ানে ভর্তি করে নেব।”
”না বড়দিমণি ওয়ান বড্ড নিচু কেলাস, কালীকে ফোর নয়তো থিরিতে ভর্তি করে নিন।”
”সে কী! অ আ ক খ, এক দুই তিন, চার যে শেখেনি তাকে একেবারে থ্রি, ফোরে ভর্তি করে নিলে আমার তো চাকরি থাকবে না।”
”থাকবে সে ব্যবস্থা শিবুকে দিয়ে আমি করব। কালী কী পরিশ্রমী আর বাধ্য আপনি জানেন না। একবার যদি মনে করে অ—আ থেকে বিসগ্য চন্দবিন্দু মুখস্ত করব তা হলে না খেয়েদেয়ে দিনরাত পড়ে তিনদিনেই গড়গড়িয়ে মুখস্ত বলে দেবে। তিনদিনে পাঁচঘরের পর্যন্ত নামতা পড়ে দেবে।”
চমৎকৃত দেবিকা বললেন, ”আপনি কাল আসুন তো তারপর দেখা যাবে।” বলেই তিনি আড়চোখে কালীর দিকে তাকিয়ে দেখলেন। হাফ প্যান্ট হাওয়াই শার্ট পরা ছেলেটি তখন থেকে পাথরের মূর্তির মতো একভাবে দাঁড়িয়ে। মিষ্টি হেসে বললেন, ”তোমার নাম কী খোকা?”
সর্দি হওয়ায় কালীর কণ্ঠস্বর ঘড়ঘড়ে হয়ে রয়েছে। সে নাম বলল। বাল্যকালে পুকুরে স্নান করার সময় দেবিকার কানে জল ঢুকে তাঁর শ্রবণ ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। তাই তিনি কালীর কথা ভাল করে বুঝতে পারলেন না। বললেন, ”কী নাম তোমার? কালী, তারপর কী যেন বললে?”
কালী আবার ঘড়ঘড়ে স্বরে বাকিটা বলল।
দেবিকা একটু অবাক হয়ে বললেন, ”কালী কিং কং? অদ্ভুত পদবি তো।” সুলতা দ্রুত ভুল শুধরে দিলেন, ”না গো বড়দিমণি, কিং কং নয়, কিং কং নয় কিঙ্কর, কালীকিঙ্কর ঢালি। বাবার নাম শিবশঙ্কর ঢালি।”
”ওর হাইট কত, মানে লম্বা কতটা?”
”এই তো দেখতেই পাচ্ছেন।”
”তা তো পাচ্ছিস, তবে কত ফুট কত ইঞ্চি?”
”অতশত জানি না।” সুলতা কিঞ্চিৎ বিড়ম্বিত স্বরে বললেন, ”আজ তক্তপোশে শুইয়ে মাপব ক’হাত লম্বা। কাল আপনাকে জানাব।”
