ধীরে ধীরে চিনুর উচ্চচতা হ্রাস পেল।
পরদিন সকালে তন্ময় গাড়ি বার করলেন, তপতীও উঠলেন।
বাবাকে স্টিয়ারিংয়ে বসতে দেখে ওরা অবাক! গম্ভীর মুখে তন্ময় বললেন,”একটা জরুরি দরকার, আমাদের কলকাতায় যেতে হবে।” দুই ছেলেকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে ওঁরা চলে গেলেন কলকাতায়। স্কুল ছুটির পর ছেলেদের গাড়ি করে আনলেন তপতী। তিনি গাড়ি গ্যারাজ করতে করতে শুনলেন দুই ভাইয়ের উল্লসিত চিৎকার। বাড়িতে ঢুকছেন যখন, ছুটে বেরিয়ে এল দুই ভাই। মিনু দু’হাতে মায়ের হাঁটু জড়িয়ে মেঝে থেকে দু’ ফুট ওপরে তাঁকে তুলে বনবন পাক দিতে লাগল। ঘুরে ঘুরে দু’ হাত তুলে নাচছে চিনু।
”ওরে ছাড় ছাড়, আমার পায়ে ব্যথা।…মাথা ঘুরছে।”
”আমাদের ট্রফি,…মা আমাদের ট্রফি…।” চিনু সুর করে গেয়ে চলেছে। ”হিপ হিপ হুররে…মা আমাদের ট্রফি, আমরা বড় হয়েছি…মাকে ট্রফি পেয়েছি…।”
”মা কখনও ট্রফি হয় নাকি!” তপতী দুহাতে মাথা টিপে ধরে বড় বড় চোখে বললেন।
”হয়, আমাদের মা হয়।” মিনু বলল।
”আমাদের কাছে তুমি আমাদের ট্রফি।” চিনু যোগ করল। ”এর থেকে সেরা ট্রফি আর কিছু নেই।”
”তোরা ট্রফি পেলি, আর আমার ট্রফি তা হলে কোথায়?”
দুই ভাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। তপতী হাসতে হাসতে বললেন,”একটা নয়, আমার দুটো ট্রফি।”
দু’হাতে তিনি দুই ছেলেকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে বললেন,”মিনু এরপর ভারতের জুনিয়র চ্যাম্পিয়ন হবে তারপর হবে সিনিয়র চ্যাম্পিয়ন…..তারপর উইম্বলডন, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া…..লোকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে আমাকে বলবে ওই যে মৃন্ময়ের মা।”
”চিন্ময়ের মা বলবে না?” চিনু ভারী গলায় অভিমানী স্বরে বলল।
”বলবে, দাদার পরেপরেই চ্যাম্পিয়ন হয়ে উঠে আসবে ভাই। আমরা তো এত বছর সেই স্বপ্নই দেখেছি রে।” তপতীর চোখ দিয়ে টপটপ করে জল ঝরে পড়ল।
ভেতর থেকে তখন বেলার গজগজানি শোনা গেল। ”খাবার ঘরে এ দুটো রাখা চলবে না,তা হলে কিন্তু চারটে চাকাই ফুটো করে দোব।”
ধানকুড়ির কিংকং
ধান্যকুড়িয়া প্রাথমিক আদর্শ শিশুশিক্ষা নিকেতনের প্রধানা শিক্ষয়িত্রী দেবিকা ঘোষাল মাথা নামিয়ে নিবিষ্ট মনে ক্লাস ফোরের অঙ্কের ফাইনাল পরীক্ষার খাতায় দেওয়া নম্বরগুলো স্ক্রুটিনি করছিলেন। চল্লিশটার মধ্যে তেরোটা দেখা হয়েছে এবং নম্বর যোগ দেওয়ায় তিনটি ভুল আবিষ্কার করেছেন। ঠিক এমন সময়ই তিনি শুনলেন, ”বড়দিদিমণি আসব?”
দেবিকা মুখ তুলে তাকিয়ে বললেন, ”আসুন।” আবার খাতা দেখতে শুরু করলেন।
যিনি বললেন ”বড়দিদিমণি আসব” তিনি বছর ষাটের সাদা থান কাপড় পরা বেঁটেখাটো স্থূলকায় ধীর শান্ত নম্র স্বরের সুলতা মণ্ডল। ধানকুড়ির (ধান্যকুড়িয়ার এটাই ডাকনাম) অন্তত সত্তরভাগ মানুষ তাঁকে চেনেন এবং বড়দিদিমণিও তাঁর নাম শুনেছেন এবং এই চেনা ও শোনার কারণটা পরে বলা যাবে।
মুখ নামিয়েই দেবিকা বললেন, ”বলুন মাসিমা।”
ইতস্তত করে সুলতা বললেন, ”আমার নাতিটাকে ভর্তি করাতে এনেছি।”
”কোথায় নাতি?”
”এই তো।” সুলতা মুখ ফিরিয়ে দেখালেন।
দেবিকা মুখ তুলে দেখলেন লম্বা একট কিশোর। ঘোর কালো গায়ের রং। নাকটি ভোঁতা, ঝাঁকড়া রুক্ষ চুল। সারল্য ও বোকামি মুখে মাখানো। অভিজ্ঞতা থেকে তিনি জানেন গ্রামাঞ্চলে ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া একটু বেশি বয়সেই শুরু করে। কিন্তু এত বড় ছেলে তো শিশুশিক্ষা নিকেতনের অর্থাৎ প্রাইমারি স্কুলের পক্ষে অত্যন্ত অনুপযুক্ত।
দেবিকা হেসে বললেন, ”মাসিমা, দশটার পর এসে বড়বাড়ির হেডমাস্টারের সঙ্গে দেখা করুন।”
প্রাথমিক স্কুলের টালির চালের তিনখানি ঘরকে বলা হয় ছোট বাড়ি আর তার পঞ্চাশ গজ দূরের দোতলা মাধ্যমিক স্কুলটিকে বলা হয় বড়বাড়ি।
”না, না, আমি কালীকে বড় স্কুলে নয়, এখানে ভর্তি করাব বলেই এনেছি।” সুলতা ব্যস্ত হয়ে বললেন।
দেবিকা কপাল কুঁচকে জানতে চাইলেন, ”বয়স কত?”
উত্তরে যা শুনলেন তাতে চেয়ার থেকে ওঁর পড়ে যাওয়ার কথা, কিন্তু পড়লেন না কেন না উনি খুব শক্ত ধাতের মহিলা, তবে টেবলের কোনা চেপে ধরে বিস্ফারিত চোখে শুধু বললেন, ”আপনার নাতির বয়স ছয়।”
সুলতাও অবাক স্বরে বললেন, ”হ্যাঁ। ছয়। আমি ওর বাথ সাট্টিফিকেট সঙ্গে করে এনেছি। কালী তো জন্মেছে এখানেই, এই তো আমাদের মিনিসিপ্যাল হাসপাতালে মেয়ের পেট কেটে ওকে বার করতে হয়েছিল। যমে মানুষে সে কী টানাটানি! ডাক্তারবাবুও খুব শক্তপোক্ত ছিল, যম একদম সুবিধে করতে পারেনি। একমাস পর জামাই এসে মা—ছেলেকে সুন্দরবনের মৌসুনীতে নিজের বাড়িতে নিয়ে যায়।” বলতে বলতে সুলতা ধান্যকুড়িয়া মিউনিসিপ্যালিটির দেওয়া বার্থ সার্টিফিকেট কাগজটা খাম থেকে বার করে এগিয়ে দিলেন।
দেবিকা তিনবার জন্মতারিখটা দেখে মনে মনে দ্রুত একটা অঙ্ক কষে ফলটা বার করে নিলেন, কালীর বয়স আজ ছ’বছর দুশো দশ দিন। আড়চোখে ঘরের বাইরে দাওয়ায় মাদুরে—বসা পাঁচ ছয় বছরের ছেলেমেয়েদের একবার দেখে নিলেন তিনি।
বিস্ময়ের ধাক্কাটা সামলে শক্তধাতের বড়দিদিমণি এবার কৌতূহলী হয়ে পড়লেন।
”নাতি কতটা পড়েছে, মানে অ আ ক খ, এক দুই তিন চার কাকে বলে জানে?”
”জানবে কী করে? আমার মেয়ে তো তিন ক্লাস পর্যন্ত পড়েছে, আমার মতো তো পেরাইমারি পাশ করেনি আর জামাই…. ” সুলতা এধার—ওধার সন্তর্পণে তাকিয়ে এগিয়ে এসে টেবলে ঝুঁকে ফিসফিস করে বললেন, ”কাউকে বলবেন না কথা দিন।”
