তপতী আঁচল দিয়ে মিনুর মুখ মুছিয়ে দিতে দিতে বললেন,”কষ্ট হচ্ছে?”
মিনু মাথা নাড়ল। মায়ের মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,”মা,আমি জিতেছি।” তার মুখে পাতলা একটা হাসি ভেসে উঠল। ”মা, তুমি খুশি?”
তপতী বুকে টেনে নিলেন ছেলের মুখ। চুম্বন করলেন ছেলের মাথা আর আশীর্বাদ জানালেন চোখের জল দিয়ে।
বিজয়ীর ট্রফি মিনু নিল ভাস্কর মুখার্জির হাত থেকে। ট্রফি দেওয়ার পর তিনি মৃদুস্বরে বললেন,”সামনের মাসে জুনিয়ার ন্যাশনাল বাঙ্গালোরে, জিতে আসতে পারবে তো?”
”চেষ্টা করব।”
খবরের কাগজের ফোটোগ্রাফারদের ফ্ল্যাশ বালব মুহুর্মুহু ঝলসাল। বহু অপরিচিত লোক মিনুর পিঠ চাপড়ে বলে গেলেন:”দারুণ খেলেছ।”
দাদার ট্রফিটা বুকে জড়িয়ে ধরে চিনু তার মাকে বলল,”এবার কি স্কুলে নিয়ে গিয়ে দেখাতে পারি?”
”না, কারও দেখার ইচ্ছে হলে আমাদের বাড়িতে এসে দেখে যাবে।”
তন্ময় একবার বললেন,”রাজেন এই সময়ই দেশের বাইরে। থাকলে খুব খুশি হত।” চার মাসের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ নিতে রাজেনকে স্কটল্যান্ডের ডান্ডিতে পাঠিয়েছে এম জে টি এম। শুভ্রা, ব্রজেনবাবু ও তাঁর স্ত্রী এখন রয়েছেন বাংলোয়। ”কাল বাংলা, ইংরেজি সবক’টা কাগজ কিনতে হবে, রাজেন এলে দেখাব।” আড়চোখে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে নিয়ে যোগ করলেন ”দুটো করে কিনতে হবে।”
”সরি সৈদুল।” সহদেব হাত ধরে বললেন।
”কনগ্রাচুলেশনস দেবুদা। আমি কিন্তু খুশি হয়েছি মৃন্ময় জেতায়। ছেলেটা অনেক উঠবে।”
”খেটেছে তাই উঠেছে, আরও খাটলে নিশ্চয় উঠবে।”
”আমিও কোচিং করি দেবুদা,ওর খাটনির পেছনে আর একজনকেও যে খাটতে হয়েছে সেটা বুঝতে পারি। তুমি ভাগ্যবান তাই এমন ছেলে পেয়েছ, আমি কুড়ি বছরেও পেলাম না।”
পরদিন বহু লোক এলেন অভিনন্দন জানাতে। কাপটা রাখা হয়েছে বাসর ঘরের টেবলে। সকালেই এসেছিলেন সুভাষ আর বরুণা সেন। তাঁরা ছোট্ট একট পোর্সেলিন টব হাতে করে আনলেন, তাতে একটা পাতাবাহার গাছ। গাছটায় কচুপাতার মতো পাতা, তাতে অজস্র সিঁদুরে টিপ। মিনুর হাতে দিয়ে সুভাষ বললেন,”তোমার জন্য আমাদের ভালবাসা এই গাছটার সঙ্গে বাড়বে।” মিনু প্রণাম করল।
এলেন রাজেনের বাবা ব্রজেনবাবু। বগলে দাবার বোর্ড আর ঘুঁটির বাক্স। তপতীকে বললেন,”বউমা, তুমি আমার পার্টনারকে কেড়ে নিয়ে গেছলে, তারপর থেকে আমি আর দাবা খেলি না, এগুলো মিনুকে দিয়ে যাচ্ছি। কবে সরে যাই তার ঠিক নেই। টেনিস থেকে রিটায়ার করার পর এই বোর্ড পেতে মিনু খেলবে আর আমাকে মনে করবে।” মিনুকে বুকে জড়িয়ে বিশালদেহী বৃদ্ধ মানুষটি বললেন,”সেই ছোট্ট মিনু আজ কত বড়টি হয়ে গেছে!”
চিনু ফিসফিস করে মাকে বলল,”আজ কি আমরা স্কুলে যাব?”
”যাওয়ার সময় তো পার হয়ে গেছে, ক’টা বাজে দেখেছিস?”
”সার বলেছেন দু’দিন ওয়ার্ক আউট বন্ধ থাকবে, উনি বুধবার থেকে আসবেন। আমরাও কি তা হলে বুধবার থেকে স্কুলে যাব?”
”না। কালই যাবে। এই ক’দিন কেউ বই নিয়ে বসোনি।” তপতী মনে রেখেছেন হেডমাস্টারকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি।
কান্তি এল শালপাতার ঠোঙা ভর্তি গুজিয়া নিয়ে। সেটা মিনুর হাতে দিয়ে বলল,”খেও। একদিন দুটো মিষ্টি খেলে মা কিছু বলবে না।” কান্তি তপতীর দিকে তাকিয়ে সম্মতি দিতে মিনতি করল চাহনি দিয়ে।
তপতী হেসে বললেন,”খাও।”
”অত! ওইটুকু ছেলে খাবে?” তন্ময় ঠোঙাটা মিনুর হাত থেকে ছোঁ মেরে তুলে নিলেন।
”তুমি অফিস যাবে না? চান করে খেতে বোসো, ক’টা বাজে দেখছ?” তপতীর স্বরে কিছু একটা ছিল যেজন্য তন্ময় ঠোঙাটা মিনুর হাতে ফিরিয়ে দিয়ে বললেন,”তাই তো, এখন তো ভাত খেতে হবে।”
বারোটা নাগাদ হইহই করে জনা দশেক ছেষল হাজির হল। মিনুর ক্লাসের বন্ধু। কী ব্যাপার?
”মৃন্ময়, আজ স্কুলে যাসনি কেন?”
”আজ থার্ড পিরিয়ডের পর স্কুল ছুটি হয়ে গেছে, তোর জন্য।”
আনন্দ আর লজ্জায় আপ্লুত মিনু শুধু বলল,”য্যাহহ!”
”নোটিসে কী লিখেছে জানিস?…গর্বের সঙ্গে আমরা জানাচ্ছি আমাদের স্কুলের ছাত্র—”
”থাক, থাক, আর বলতে হবে না।” মিনু থামিয়ে দিল।
”কেন বলতে হবে না?” চিনু প্রতিবাদ করল। ”কী সব কথা শুনতে হয়েছে ভুলে গেছিস?”
বন্ধুদের প্রত্যেকে ট্রফিটা হাতে নিল। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল। ট্রফির গায়ে লেখা কথাগুলো পড়ল। সারা বাড়ি ভরে গেল খুশির কলকল উচ্ছ্বাসে। কান্তির গুজিয়াগুলোর সদ্ব্যবহার করলেন তপতী প্রত্যেকের হাতে একটা করে তুলে দিয়ে।
রাত্রে শোবার আগে ছেলেরা দুধ খায়। তপতী দুটো গ্লাস হাতে নিয়ে ছেলেদের ঘরে ঢুকতে গিয়ে ভেতর থেকে আসা চাপা স্বরের কথা শুনতে পেয়ে থমকে দাঁড়ালেন।
”না না, অনেক টাকা… এখন বলতে হবে না।”
”মোটরে স্কুলে যেতে ভাল লাগে? লজ্জা করে না? দুটো সাইকেলের কত আর দাম হবে?”
”যতই হোক…বাবার কষ্ট হবে, মারও।”
গলাখাঁকারি দিয়ে তপতী ঘরে ঢুকলেন। ”অনেকেই তো উপহার দিল, আমি কিছু দেব না।”
ওরা অবাক হল। মুখ চাওয়াচাওয়ি করল।
”আমি তো ভাবছি, মিনু তো বড় হয়েছে, এবার দেখেশুনে সাইকেল চালাতে পারবে।”
”মা, আমিও বড় হয়েছি।” চিনু তড়াক করে দাঁড়িয়ে উঠল।”
”হয়েছিস নাকি!” তপতী গম্ভীর হলেন। ”মিনু, ওর পাশে দাঁড়া তো।”
মিনু দাঁড়াল চিনুর পাশে। পলকের জন্য তপতী চোখ নীচে নামালেন। ”চিনু গোড়ালি নামা।”
